ইরানের ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ২২০ মার্কিন সেনা হতাহত
সোনালী ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মধ্যে তিন দেশে পাল্টা সামরিক হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় পরিচালিত এসব হামলায় প্রায় ২২০ জন যুক্তরাষ্ট্র-এর সৈন্য ও কমান্ডার নিহত বা আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সম্পদেরও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। খবর প্রেস টিভি-র।
ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স-এর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইব্রাহিম জোলফাঘারি শনিবার জানান, বাহরাইন-এ অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর ফিফথ ফ্লিট-এর ওপর চালানো ইরানি হামলায় ২১ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। তিনি আরও জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাত-এর আল ধাফরা বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে চালানো হামলায় প্রায় ২০০ জন মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত বা আহত হয়েছেন। এছাড়া পারস্য উপসাগর-এর উত্তর অংশে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি তেলবাহী জাহাজকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান।
এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলা চালায় বলে দাবি করে তেহরান। ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, এর কয়েক মাস আগে উসকানিমূলক হামলার মাধ্যমে দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। ইরানের দাবি, ওই হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, শত শত বেসামরিক নাগরিক এবং বেশ কয়েকজন সামরিক কমান্ডার নিহত হন। এর জবাবে ইরান দ্রুত পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইসরায়েল অধিকৃত অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে।
ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, এসব হামলা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনা ও স্বার্থকে লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে। তারা আরও দাবি করেন, যেসব দেশের ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেসব দেশের প্রতি ইরানের কোনো শত্রুতা নেই এবং তাদের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করা হচ্ছে।
ইরানে তেলের ডিপোসহ ৫ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা: ইরানের ৪টি তেলের ডিপো এবং একটি পেট্রোলিয়াম পরিবহন কেন্দ্রে বোমা ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান বাহিনী। এতে অন্তত ৪ জন নিহত হয়েছে এবং এসব স্থাপনার গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ইরানের জাতীয় তেল উত্তোলন ও বিতরণ কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহী কেরামাত বিয়েসকারামি দেশটির সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানিয়েছেন। কেরামাত বিয়েসকারামিতদ বলেন, “শনিবার রাতে তেহরান এবং আলবোর্জে মার্কিন-ইসরায়েল বিমান বাহিনীর বোমায় আমাদের চারটি তেলের ডিপো এবং একটি পেট্রোলিয়াম পরিবহন কেন্দ্রের গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ৪ জন নিহতও হয়েছে। নিহতদের মধ্যে দু’জন তেলের ট্যাংকার ট্রাকের চালক ছিলেন।” ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীও (আইডিএফ) পৃথক এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে এ তথ্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা একাধিক ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিমান বাহিনীর বোমায় তেলের ডিপোগুলোতে বিশাল আকারে আগুন জ্বলছে।
শত্রু এলে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হবে, হুঁশিয়ারি ইরানের: ইরানের মাটিতে কোনও বিদেশি স্থলবাহিনী প্রবেশ করলে তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসির মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের সাহসী সেনারা যেকোনও শত্রুকে মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইরান যথেষ্ট সক্ষম। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমাদের অত্যন্ত সাহসী সেনারা শত্রুর অপেক্ষায় আছে। যারা ইরানের মাটিতে পা রাখবে, তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হবে। হাজার বছরের পুরোনো পারস্য সভ্যতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ইরান সব সময় নিজের ভূমি রক্ষা করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা ও স্থাপনাগুলোতে হামলার জন্য রাশিয়া ইরানকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে বলে মনে করছেন মার্কিন গোয়েন্দারা। এ বিষয়ে সরাসরি কোনও তথ্য না দিলেও আরাঘচি বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের সামরিক সহযোগিতা নতুন কিছু নয়। তিনি বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের খুব ভালো অংশীদারত্ব রয়েছে এবং তারা আমাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করছে। তবে আমার কাছে নির্দিষ্ট কোনও সামরিক তথ্য নেই। আরাঘচি দাবি করেন, ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা চালাচ্ছে না। বরং তাদের লক্ষ্যবস্তু হলো সেসব দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা। তিনি বলেন, আমরা কেবল পাল্টা আঘাত করছি। আমাদের প্রতিবেশীদের মাটিতে দুর্ভাগ্যবশত মার্কিন স্থাপনাগুলো অবস্থিত হওয়ায় তাদের যে অসুবিধা হয়েছে, তার জন্য প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ক্ষমা চেয়েছেন। আমাদের সংস্কৃতিতে ক্ষমা চাওয়া হলো মর্যাদা ও শক্তির লক্ষণ। তিনি আরও বলেছেন, এই ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকাণ্ডের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টেরই উচিত এ অঞ্চলের মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়া।
সাক্ষাৎকারে আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট করেছেন, তেহরান কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং যুদ্ধের স্থায়ী অবসান চায়। তবে কোনও আলোচনায় বসার আগে যারা এই আগ্রাসন শুরু করেছে, তাদের জবাবদিহি করতে হবে। আরাঘচি বলেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। আমরা যা করছি তা আত্মরক্ষার বৈধ অধিকার। আমাদের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
‘সর্বসম্মতিক্রমে’ ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত: ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা বিশেষ পরিষদ বা ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ নতুন নেতার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। পরিষদের সদস্যরা এ তথ্য নিশ্চিত করলেও মনোনীত ব্যক্তির নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ইসনার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন কমিটির সদস্য এবং খুজেস্তান প্রদেশের প্রতিনিধি মোহসেন হায়দারি জানিয়েছেন, অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সর্বসম্মতিক্রমে যোগ্যতম প্রার্থীকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিটির আরেক সদস্য মোহাম্মদ মেহদি মিরবাঘেরি ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।’
সাধারণত ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়। গত সপ্তাহে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর এই পদের উত্তরাধিকারী নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জল্পনা শুরু হয়। পরিষদের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার অর্থ হলো শিগগির তেহরান থেকে নতুন নেতার নাম ঘোষণা করা হতে পারে।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ বা বিশেষজ্ঞ পরিষদই সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন, তদারকি এবং প্রয়োজনে অপসারণের ক্ষমতা রাখে। বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এই নির্বাচনকে ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামরিক কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।










