ঢাকা | মার্চ ২, ২০২৬ - ১২:০১ পূর্বাহ্ন

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনিসহ ৪০ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত

  • আপডেট: Sunday, March 1, 2026 - 10:28 pm

সোনালী ডেস্ক: ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’-এর প্রথম ধাপের হামলায় এক মিনিটের মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ৪০ জন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইসরাইল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। এ ঘটনায় ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও ৭ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

রোববার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইডিএফ জানায়, এ হামলা ইরানের নেতৃত্বের পক্ষ থেকে আসা হুমকির জবাবে ‘পূর্বপ্রস্তুতিমূলক আঘাত’ হিসেবে পরিচালিত হয়েছে। অভিযানের শুরুতেই তেহরানের বিভিন্ন স্থানে সমন্বিত বিমান হামলা চালানো হয়। সে সময় ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা নেতৃত্বের ৭জন সদস্য একই স্থানে অবস্থান করছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। আইডিএফের ভাষ্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হামলাটি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা হয়। সংস্থাটি আরও দাবি করেছে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল আব্দুলরহিম মোসাভি নিহতদের মধ্যে রয়েছেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ আগে থেকেই জানতে পেরেছিল যে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা শনিবার সকালে তেহরানের একটি সরকারি কমপাউন্ডে বৈঠকে বসবেন। পরে সেই তথ্য ইসরায়েলের কাছে সরবরাহ করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন তথ্য পাওয়ার পর ইসরায়েল হামলার সময়সূচি পরিবর্তন করে দিনের আলোতেই আঘাত হানে। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ ডজনখানেক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান খামেনির কমপাউন্ডে ৩০টি বোমা নিক্ষেপ করে, ফলে পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

আইডিএফ জানায়, ইসরায়েল সময় গত শনিবার সকাল ৬টায় অভিযান শুরু হয়। তেহরান সময় সকাল প্রায় ৯টা ৪০ মিনিটে, জঙ্গিবিমান উড্ডয়নের দুই ঘণ্টা পাঁচ মিনিট পর কমপাউন্ডে বোমাবর্ষণ করা হয়।

এদিকে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদকেও হত্যা করেছে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। ইসরাইলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল রোববার ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদ নিহত হয়েছেন।

খবর অনুযায়ী, আহমেদিনেজাদ তার নিজ বাসভবনে হামলার শিকার হন। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলো এই হত্যাকাণ্ডের খবর প্রচার করে একে ইরানের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে পরিচালিত চলমান হামলার একটি অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে। আহমেদিনেজাদ ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কট্টরপন্থী বক্তব্যের জন্য পরিচিত এই নেতা পশ্চিমাদের প্রতি আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপক নজরদারিতে ছিলেন। ২০০৯ সালের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্কিত এবং এর পর ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া গণবিক্ষোভও তার প্রেসিডেন্সি আমলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল।

খামেনির মেয়ে-জামাতা-নাতি নিহত: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মেয়ে, জামাতা এবং নাতি মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন। গতকাল রোববার এক প্রতিবেদনে ফার্স নিউজ এজেন্সি এ তথ্য জানায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মেয়ে, জামাই ও নাতিও মারা গেছেন।

এছাড়া ইরানের বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গে যোগসূত্র থাকা ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, খামেনির একজন পূত্রবধুও ওই হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে দেশটিতে ৪০ দিনের শোক ও ৭ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণার কথা জানায়। ওদিকে, বিবিসির মিডিয়া পার্টনার সিবিএস নিউজ গোয়েন্দা ও সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, প্রায় ৪০ জন ইরানি কর্মকর্তা ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত হয়েছে। তবে, এটা পরিস্কার নয় যে ওই কর্মকর্তারা একাধিক জায়গায় নাকি একটি জায়গাতেই অবস্থান করছিলেন। তারা দাবি করেছে খামেনি ছাড়াও ইরানের বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হামলায় মারা গেছেন।

খামেনি হত্যাকাণ্ড ‘মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’ বললেন ইরানের প্রেসিডেন্ট: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনাকে ‘মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। গতকাল রোববার ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। খবর টাইমস অব ইসরায়েলের।

পেজেশকিয়ান বলেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ এবং বিশ্বজুড়ে শিয়া সম্প্রদায়ের একজন বিশিষ্ট নেতাকে এভাবে হত্যা করা বিশ্বের সব প্রান্তের মুসলিম, বিশেষ করে শিয়াদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা।” তিনি আরও বলেন, খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অধিকার ও কর্তব্য।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ অভিযান চালিয়ে শনিবার ভোরে তেহরান এ খামেনিকে হত্যা করে বলে দাবি করা হয়েছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের তথ্যের ভিত্তিতে উচ্চপর্যায়ের এক গোপন বৈঠক চলাকালে এ হামলা চালানো হয়। ইরানি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, হামলার আগে খামেনি প্রতিরক্ষা পরিষদের সেক্রেটারি আলী শামখানি এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলী লারিজানিএর সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। তবে ইসরায়েলের দাবি, হামলায় ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর–এর কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুরসহ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা নিহত হয়েছেন।

খামেনিকে হত্যার প্রতিবাদে দেশে দেশে বিক্ষোভ: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ইরান। গতকাল রোববার সকালে ইরানের রাষ্ট্র্রীয় সংবাদমাধ্যমে এ খবর প্রচার করা হয়। হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার মানুষ।

সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে শোকের সাগরে ভাসছে গোটা ইরান। প্রিয় নেতার নিহতের খবর প্রকাশের পরপরই রাজধানী তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন শহরের রাজপথে নেমে আসেন লাখ লাখ মানুষ। খামেনির ছবি হাতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের দাবি জানান ইরানিরা।
বাংলাদেশ: ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে বিক্ষোভ হয়েছে বাংলাদেশেও। রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন ইসলামপন্থি দলের শত শত কর্মী খামেনি হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

পাকিস্তান: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি হত্যার প্রতিবাদে পাকিস্তানের করাচিতে বিক্ষোভ হয়েছে। মার্কিন কনস্যুলেটে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ৯ জন নিহত হয়েছেন। করাচি পুলিশের প্রধান সার্জন সুমাইয়া সৈয়দ আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, মার্কিন কনস্যুলেটে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় বিক্ষোভকারীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এতে নয়জন নিহত হন।

ইরাক: বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের খবরও পাওয়া গেছে। স্থানীয় গণমাধ্যম দক্ষিণ ইরাকের অন্যান্য প্রদেশেও বিক্ষোভের খবর দিয়েছে।

ভারত: আলি খামেনি মৃত্যুতে প্রতিবাদ হয়েছে ভারতে। দেশটির জম্মু ও কাশ্মীর ও লক্ষ্ণৌতে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে আয়াতুল্লাহ খামেনি হত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছে।