নওগাঁয় আলুর দামে ধস, নিঃস্ব হওয়ার উপক্রম কৃষকদের
নওগাঁ প্রতিনিধি: নওগাঁয় বদলগাছী উপজেলার খলসি গ্রামের কৃষক বেলাল হোসেন গত বছরের লোকসান পুষিয়ে নিতে এবার এক বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছিলেন। আশা ছিল আলুর বিক্রির টাকায় আসন্ন ঈদুল ফিতরে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু গত বুধবার বাজারে আলু নিয়ে গিয়ে দেখেন পাইকাররা দাম হাঁকছেন মাত্র ৫-৬ টাকা। অশ্রুসজল চোখে এই কৃষক বলেন, ১ বিঘা জমিতে খরচ হয়েছে ২০ হাজার টাকা। বর্তমান দামে বিক্রি করলে উৎপাদন খরচই উঠছে না। ন্যায্য দাম না পেলে এরপর আলু মাঠেই ফেলে রাখব। স্বপ্ন ছিল ‘আলু বিক্রির টাকায় আসন্ন ঈদুল ফিতরে পরিবারের সদস্যদের নতুন জামা কিনে দেবো। উৎপাদন খরচ না ওঠায় এভাবে বেলাল হোসেনের মতো এভাবেই ঈদ নিয়ে দেখা দেয়া রঙিন স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে জেলার কয়েক হাজার চাষির।
আলু চাষিদের অভিযোগ, শহরের খুচরা বাজারে বেশি দামে আলু বিক্রি হলেও বাজার সিন্ডিকেট আমদানি বেড়ে যাওয়ার অযুহাত দেখিয়ে পাইকারি পর্যায়ে উল্লেখযোগ্যহারে আলুর দাম কমিয়েছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বস্তা নিয়ে অপেক্ষা করার পরেও তারা দাম হাঁকছেন না। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে কম দামে আলু বিক্রি করে ফিরতে হচ্ছে চাষিদের। বাজার তদারকিতে প্রশাসনের নজরদারি নেই। এই সুযোগই লুফে নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, রক্ত পানি করে ফলানো আলু ৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হয়েছে। পাইকাররা শুরুতে ৫ টাকা দাম হাঁকলেও শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৬ টাকা কেজি দরে আলু কিনেছে। কীটনাশক ব্যবহার না করায় ১ বিঘা জমিতে এ বছর আলুর আবাদে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখান থেকে সর্বোচ্চ ৮০ মণ আলু পাবো। সেই আলু ৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি করায় উৎপাদন খরচই উঠছে না। ন্যায্যমূল্য না পেলে এরপর মাঠেই আলু ফেলে রেখে নষ্ট করবো।
নওগাঁ সদর উপজেলার কির্ত্তীপুর ইউনিয়নের কির্ত্তীপুর গ্রামের কৃষক বাবুল হোসেন বলেন, বাজারে সবকিছুর দাম বাড়ে। শুধু কৃষকের ফসলের দাম কমে যায়। মাত্র ৫ টাকা কেজিতে আলু বিক্রি হওয়াটা কৃষকের সঙ্গে প্রহসন। আমরা ভিক্ষা চাই না। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য চাই। সরকার যদি কৃষককে বাঁচাতে এগিয়ে না আসেন, তাহলে কৃষিপণ্য উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না। বদলগাছী উপজেলার দেউলিয়া গ্রামের আরেক কৃষক হাসান আলী বলেন, এ বছর ৫ বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করেছি। বাজারে দাম শুনে মাঠ থেকে আলু উত্তোলনের সাহস পাচ্ছি না। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী বীজ-সারের দামই উঠছে না। লোকসান গুণতে গুণতে এ বছর আমাদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। সরকারিভাবে কৃষক পর্যায় থেকে ন্যায্যমূল্যে আলু কেনার ব্যবস্থা করতে হবে। নয়তো আগামী বছর থেকে আলু চাষ পুরোপুরি বন্ধ করে দিবো।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে নওগাঁর ১১টি উপজেলায় ২১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও ২১ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ করেছেন চাষিরা। আবাদকৃত এই জমি থেকে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যেখানে ইতিমধ্যে ১৩ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমির আলু উত্তোলনের পর ২ লাখ ৫৪ হাজার ১৬৫ মেট্রিক টন ফলন পেয়েছে কৃষি বিভাগ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হোমায়রা মন্ডল বলেন, এ বছর মৌসুমের শুরু থেকেই আলু চাষে কৃষকদের পুরোপুরি নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। আলুর পরিবর্তে সরিষা চাষে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হলেও কৃষকরা সেটি মেনে চলেনি। গত বছর আলুর বীজ কৃষকদের ঘরে ঘরে সংরক্ষণ করা ছিল। সেই বীজের সদ্ব্যবহার করতে গিয়ে কৃষকরা সঙ্কটের মুখে পড়েছেন।
তিনি বলেন, আলু চাষিরা অনুকূল আবহাওয়ায় বাম্পার ফলন পেয়েছেন। অনেকে বেশি লাভের আশায় অধিক পরিমাণ জমিতে আবাদ করেছেন। সব মিলিয়ে বাম্পার ফলনই এখন তাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ন্যায্য দাম পেতে কৃষকদের আলু সংরক্ষণের পরামর্শ দেয়ার সাহস আমাদের নেই। কারণ সংরক্ষণের পর আদৌ তারা ন্যায্য দাম পাবে কিনা। সেটি আমরা নিশ্চিত নই। নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, আলুর বাজারে দরপতন রোধে করণীয় সম্পর্কে কৃষি বিভাগের মতামত চাওয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার এ সংক্রান্ত বিষয়ে কৃষি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।











