ঢাকা | ফেব্রুয়ারী ৫, ২০২৬ - ৩:৫৬ পূর্বাহ্ন

নতুন-পুরোনো প্রার্থীর লড়াই, রাজশাহীতে ছড়াচ্ছে উত্তাপ

  • আপডেট: Thursday, February 5, 2026 - 1:00 am

স্টাফ রিপোর্টার: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র কয়েকদিন। ভোটের এ আবহে রাজশাহীর ৬টি সংসদীয় আসনেই চলছে জোর প্রচার-প্রচারণা। পোস্টার-ব্যানার, মাইকিং আর গণসংযোগে সরব নির্বাচনি মাঠ। প্রতীক নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন প্রার্থীরা, শোনাচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতির কথা। এবারের নির্বাচনি লড়াই জমে উঠেছে নতুন ও পুরোনো প্রার্থীদের মধ্যে।

রাজশাহীর ৬টি আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে মিজানুর রহমান মিনু, আবু সাঈদ চাঁদ, এডভোকেট শফিকুল হক মিলন ও অধ্যাপক নজরুল ইসলাম আগেও নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তবে শরীফ উদ্দীন ও ডিএম জিয়াউর রহমান প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছেন। অন্যদিকে জামায়াত জোটের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ছাড়া সকলেই নতুন প্রার্থী। তবে রাজশাহী-০৪ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের তাজুল ইসলাম খান ছাড়া অন্যানো রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সবাই নতুন। বড় ধরনের কোনো ঘটনা ছাড়াই প্রার্থীদের এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ভোটাররা।

রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে নির্বাচনি মাঠে রয়েছেন বিভিন্ন দলের পাঁচ জন। এর মধ্যে বিএনপির মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন (ধানের শীষ), জামায়াতের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা), গণঅধিকার পরিষদের মির মো. শাহজাহান (ট্রাক), আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) আবদুর রহমান (ঈগল) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আল-সাআদ (মোবাইল ফোন)। এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৩৫৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩৪ হাজার ৭৯, নারী ২ লাখ ৩৪ হাজার ২৭৭ ও হিজড়া তিন জন।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ১৯৮৬ সালে এ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন। স্থানীয়ভাবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক শক্তিকে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে দেখছেন ভোটাররা। তবে বিএনপি প্রার্থী বিএনপির মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটারদের মন জয় করতে এই দুই প্রার্থী সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। তারা দুজনেই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। নতুন ও পুরোনোর লড়াইয়ে জমে উঠেছে রাজশাহী-০১ আসনের নির্বাচনি মাঠ।

জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান দেশ ও জাতির কল্যাণে ইসলামী আদর্শভিত্তিক রাজনীতির গুরুত্ব তুলে ধরে ভোটারদের সৎ, যোগ্য ও আদর্শবান নেতৃত্ব নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশে ন্যায়বিচার, সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য জামায়াতে ইসলামী কাজ করে যাচ্ছে। জনগণের সমর্থন পেলে তিনি এলাকার মানুষের অধিকার আদায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।

উপজেলার গোগ্রামর ভোটার এবাদত হোসেন বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এই আসনে মূল সমস্যা মাদক। আমরাই চাই, আমাদের আসনটি মাদকমুক্ত হোক। আসনটিতে বেশকজন প্রার্থী থাকলেও মূলত লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াত মনোনীত প্রার্থীর মধ্যে। বড় এই দুদলের প্রার্থীই ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। সবাই চেষ্টা করছেন ভোটারদের মন জয় করতে। জামায়াতের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এর আগেও আসনটিতে সংসদ সদস্য ছিলেন। তবে বিএনপির প্রার্থী শরিফ উদ্দিন নতুন। কে ভোটরদের মন জয় করতে পেরেছে, সেটি ১২ ফেব্রুয়ারিই বোঝা যাবে। তবে নতুন ও পুরোনোর লড়াইয়ে জমে উঠেছে এই আসনের ভোটের মাঠ।

বিএনপি প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন গণমাধ্যমকে বলেন, প্রার্থী নতুন হলেও মনোবল দৃঢ়। তিনি নির্বাচিত হলে এই মাটির ঋণ শোধ করবেন কাজের মাধ্যমে, কথায় নয়। এই জনপদের উন্নয়ন হবে মানুষের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে, কোনো মানুষ আর অবহেলিত থাকবে না। শিক্ষা হবে অধিকার, স্বাস্থ্য হবে নিশ্চয়তা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা পৌঁছাবে ঘরে ঘরে বলে জানান শরীফ উদ্দীন।

রাজশাহী-২ (সদর) মোট ভোটার ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫৬৪ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৫১, নারী ১ লাখ ৯১ হাজার ৩০৫ ও হিজড়া ৮ জন। এই আসনে লড়ছেন ছয় জন। এর মধ্যে বিএনপির মিজানুর রহমান মিনু (ধানের শীষ), জামায়াতের ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর (দাঁড়িপাল্লা), আমার বাংলাদেশ পার্টির মু.সাঈদ নোমান (ঈগল), নাগরিক ঐক্যের মোহাম্মদ সামছুল আলম (কেটলি), বাংলাদেশ লেবার পার্টির মেজবাউল ইসলাম (আনারস) ও স্বতন্ত্র সালেহ আহমেদ (মোটরসাইকেল) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু আসনটিতে সংসদ সদস্য ও সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন। রাজশাহী-০২ আসনে বিএনপির মিজানুর রহমান মিনু হেভিওয়েট প্রার্থী। তার বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতের ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। তিনি সাংগঠনিক বড় দায়িত্ব পালন করলেও সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া এবি পার্টির সাঈদ নোমান, নাগরিক ঐক্যের সামছুল আলম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মেজবাউল ইসলাম ও স্বতন্ত্র সালেহ আহমেদ আগে কখন জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেননি। এবার প্রার্থীদের মনভোলানো প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট হতে রাজি নন ভোটাররা, যাচাই করবেন নেতৃত্বের সক্ষমতা।

বিএনপি প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু বলেন, ১৭ বছরে যারা দেশকে নিঃশেষ করেছে, সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে এসে আমরা রাজশাহীকে একটি সুন্দর, বসবাস উপযোগী, নিরাপদ মহানগরী, পরিচ্ছন্ন মহানগরী, সবুজ মহানগরী হিসেবে গড়ে তুলবো। সেই সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করব।

জামায়াতের প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেছেন, ইনশাআল্লাহ্ জয়ের ব্যাপারে আমরা কনফিডেন্ট। আলহামদুলিল্লাহ্ খুব ভালো ফিডব্যাক পাচ্ছি। আমরা ব্যাপক জনসমর্থন লক্ষ্য করছি এবং জামায়াতকে বা দাঁড়িপাল্লাকে বিজয়ী করার জন্য তরুণ ভোটারসহ জনগন খুব উন্মুখ হয়ে আছে।

রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে লড়ছেন ছয়জন। এর মধ্যে বিএনপির এডভোকেট শফিকুল হক মিলন (ধানের শীষ), জামায়াতের আবুল কালাম আজাদ (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির আফজাল হোসেন (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের ফজলুর রহমান (হাতপাখা), আমজনতার দলের সাইদ পারভেজ (প্রজাপতি) এবং স্বতন্ত্র হাবিবা বেগম (ফুটবল)। এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২৩ হাজার ১৯৯ জন। পুরুষ ২ লাখ ১০ হাজার ৮৮৬, নারী ২ লাখ ১২ হাজার ৩০৭ ও হিজড়া ভোটার ছয় জন। এই আসনে বিএনপির এডভাকেট শফিকুল হক মিলন ছাড়াই সবাই নতুন প্রার্থী। জামায়াতের আবুল কালাম আজাদ দীর্ঘ সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থাকলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেননি। তবে রাজনৈতিক দক্ষতা ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে জনগণের সুখ দু:খে সবসময় পাশে ছিলেন এই রাজনীতিবিদ।

রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে লড়ছেন তিন জন। তারা হলেন- বিএনপির ডি.এম.ডি জিয়াউর রহমান (ধানের শীষ), জামায়াতের আবদুল বারী সরদার (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির ফজলুল হক (লাঙ্গল) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের তাজুল ইসলাম খান (হাতপাখা)। আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯২৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৬০ হাজার ৭৩৫, নারী ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৮৬ ও হিজড়া চার জন। এই আসনে বিএনপি ও জামায়াতসহ সব প্রার্থীই জাতীয় নির্বাচনের মাঠে নতুন মুখ। তবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের তাজুল ইসলাম খান ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। আসনটির প্রার্থীরা ছুটছেন ভোটারদের বাড়ি বাড়ি। নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন।

রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে লড়ছেন সাত জন। তারা হলেন বিএনপির নজরুল ইসলাম মণ্ডল (ধানের শীষ), জামায়াতের মনজুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রুহুল আমিন (হাতপাখা), বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির আলতাফ হোসেন মোল্লা (একতারা), স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসফা খায়রুল হক (ঘোড়া), রায়হান কাওসার (মোটরসাইকেল) ও রেজাউল করিম (ফুটবল)। এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৬৮, নারী ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫০০ ও হিজড়া পাঁচ জন। আসনটিতে বিএনপির দুইজন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ইসফা খায়রুল হক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন। একই আসনে যুক্তরাজ্য জিয়া পরিষদের সহ-সভাপতি রেজাউল করিম পেয়েছেন ফুটবল প্রতীক। আসনটিতে গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত রায়হান কাওসার এবার পেয়েছেন মোটরসাইকেল প্রতীক। এখানে বিএনপির নজরুল ইসলাম মণ্ডল ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির আলতাফ হোসেন মোল্লা এর আগেও নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।

রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনে লড়ছেন চার জন। তারা হলেন বিএনপির আবু সাইদ চাঁদ (ধানের শীষ), জামায়াতের নাজমুল হক (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির ইকবাল হোসেন (লাঙ্গল) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবদুস সালাম সুরুজ (হাতপাখা)। এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৮ হাজার ১৮, নারী ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৩৩ ও হিজড়া দুজন। আসনটিতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবু সাঈদ চাদ ছাড়া আর সবাই নতুন প্রার্থী।

বিএনপি প্রার্থী আবু সাঈদ চাঁদ বলেন, ২৮ বছর জনপ্রতিনিধি ছিলেন তিনি। এরমধ্য চারবার চারঘাটের সলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও দুইবার চারঘাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। যেকোনো পরিস্থিতিতে সবসময় জনগণের পাশেও ছিলেন। আগামীতেও থাকবেন। চারঘাট-বাঘা আসনে সকলের পরিচিত মুখ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষের জয় হবে ইনশাআল্লাহ্।

‘উত্তরবঙ্গের মাটি বিএনপির ঘাঁটি’ কথাটি বেশ প্রচলিত। তবে এবার কথাটির কিছুটা হলেও ব্যত্যয় ঘটতে পারে বলে অভিমত সুশীল, সাধারণ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। বিতর্কিত তিনটি নির্বাচনের মাধ্যমে রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসন গত ১৭ বছর দখলে রেখেছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দেড় বছর পর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রায় দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এবারের নির্বাচনে হারানো আসনগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় ব্যস্ত। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী ভোটারদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ও বিএনপির মধ্যে তৈরি হওয়া বিভেদকে কাজে লাগিয়ে অর্ধেকের বেশি আসনে ভাগ বসাতে চায় জামায়াতে ইসলামী।