রাজশাহীর ছয় আসন: ডিজিটাল মাঠেও ভোটের লড়াই জমজমাট
জগদীশ রবিদাস: আর মাত্র ১১ দিন পর দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে দেয়ালে-দেয়ালে পোস্টার লাগানো নিষেধ। দড়িতে বেঁধে বা যেকোনো পদ্ধতিতেও পোস্টার লাগানো যাবে না। তবে বাঁধা নেই ব্যানার, বিলবোর্ড কিংবা লিফলেটে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিধিনিষেধের কারণে এবার রাস্তাঘাট, দেয়াল কিংবা খুঁটিতে পোস্টার বা ব্যানার তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। নেই কিছুক্ষণ পর পর মাইকের গগনভেদি শব্দ। ফলে এখন নির্বাচনি প্রচারণার শক্তিশালী “মঞ্চ” হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
রাজশাহী জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনেই এখন ডিজিটাল পোস্টারে সয়লাব নেট দুনিয়া। মাঠের প্রত্যক্ষ পোস্টার আর মাইকের স্থান যেন দখলে নিয়েছে মোবাইল ফোনের স্ক্রিন। ছয় আসনেই প্রার্থীরা নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি করছেন। ফেসবুক জুড়েই চলছে প্রার্থী বা দলের নির্বাচনি গান, সংক্ষিপ্ত ভিডিও ও ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট।
নেট দুনিয়ায় একইসঙ্গে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে বানানো মিথ্যা বক্তব্য, বিকারগ্রস্ত ভিডিও ও হিংসাত্মক কনটেন্টও। যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে ভোটের মাঠে। কারণ, এবারের ভোটে অনলাইন প্রচারণা শুধু একটি সহায়ক মাধ্যম নয়; বরং এটি নিজেই একটি আলাদা যুদ্ধক্ষেত্র। ডিজিটাল মাধ্যমে যে রাজনৈতিক দল আলোচনার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে, তার মাঠের প্রচারণাও সুবিধা পাবে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া তরুণ প্রজন্মকে ঘিরেই এই ডিজিটাল কৌশল সাজানো হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর তরুণ ভোটার। সেই তরুণ ভোটাররাও ডিজিটাল প্রচারণাকে সময়োপযোগী হিসেবে উল্লেখ করছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলী হাসান সীমান্ত বলেন, “তরুণ প্রজন্মের সিংহভাগই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত। তাই ডিজিটাল যুগে এসে পোস্টারের প্রয়োজন কতটুকু তা আলোচনার দাবি রাখে। পোস্টার না থাকাই পরিবেশের জন্য ভালো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই সব পাওয়া যায়। কে কী বলছে, কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে সবকিছুই যাচাই করা যায়।”
এ বিষয়ে তার মতো করেই কথা বলেছেন রাজশাহীতে বসবাসকারী একাধিক শিক্ষার্থী। রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী লিমন আহমদে বলেন, “রাজনীতি ছিল আগে হাটে-মাঠে-ঘাটে। গ্রামের বাড়িতে প্রার্থীদের নির্বাচনি ক্যাম্পে চায়ের কাপে জমে উঠতো রাজনীতি। এখন রাজনীতি নিউজফিডেই বেশি দেখি। কে কী বলছে, সেটা অনেক সময় যাচাই করার সুযোগ পর্যন্ত থাকে না।”
রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনে ইতিমধ্যেই জমে উঠেছে ভোটের মাঠ। ছয়টি আসনে বিএনপি এবং জামায়াত প্রার্থীদের উপস্থিতিই অনলাইনে বেশি।
রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তার নামে করা একটি নির্বাচনি পেজে প্রতিদিনই তার প্রচার-প্রচারণার খবরগুলো তুলে ধরে বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে। সেখানে তার অনুসারীরা বিভিন্ন ইতিবাচক মন্তব্য করে সেটি আরও বেশিসংখ্যক মানুষের মধ্যে শেয়ার করে দিচ্ছেন। একই আসনে বিএনপির প্রার্থী শরিফ উদ্দীনও পিছিয়ে নেই। তার পক্ষেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জোরালোভাবে প্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি প্রতিদিন কোথায় কী কর্মসূচি করছেন বা করবেন সেটাও অনলাইনে নিয়মিত প্রচার করা হচ্ছে।
রাজশাহী-২ (সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী হচ্ছেন সাবেক সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনু। অনলাইন মাধ্যমে তার পক্ষের প্রচার-প্রচারণা একটু বেশি লক্ষ্য করা গেছে। শুধুমাত্র ফেসবুক পেজই নয়, তার পক্ষে তৈরি করা হয়েছে একটি নির্বাচনি ওয়েবসাইটও। সেই নির্বাচনি ওয়েবসাইটে তার এলাকার ভোটাররা বিভিন্ন মতামত জানাতে পারবেন। এছাড়াও মিজানুর রহমান মিনুর নির্বাচনি প্রচারণার বিভিন্ন তথ্যও সেখানে পাওয়া যাচ্ছে।
একইভাবে অনলাইনে সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে রাজশাহী-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ডা. জাহাঙ্গীরের। জামায়াতের অনুসারীরা বিভিন্ন ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ডা. জাহাঙ্গীরের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। তাদের উপস্থিতি অনলাইনে কমবেশি সবসময়ই পাওয়া যাচ্ছে। জামায়াত-শিবির কর্মীরা কেন্দ্রের সঙ্গে মিল রেখে বিভিন্ন ফটোকার্ড তৈরি করছেন এবং গুজব প্রতিরোধে টিম (দল) তৈরি করে কাজ করে যাচ্ছেন।
একই অবস্থা রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনেও। সেখানে বিএনপির প্রার্থী এ্যাড. শফিকুল হক মিলন ও জামায়াত মনোনীত প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ পুরোদমে অনলাইনে নিজেদের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়াও রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে বিএনপি প্রার্থী ডিএম জিয়াউর রহমান, জামায়াত প্রার্থী ডা. আব্দুল বারী, রাজশাহী-৫ আসনে বিএনপি প্রার্থী অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ও রাজশাহীর-৬ আসনের বিএনপি প্রার্থী আবু সাইদ চাঁদের পক্ষেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে। তারাও তাদের কর্মসূচি ও প্রতিশ্রুতি অনলাইনের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে তুলে ধরছেন।
এদিকে, রাজনৈতিক দলগুলো ভোটকে সামনে রেখে তাদের ‘থিম সং’ বানিয়েছে। বিএনপির থিম সং-এর মূল ফোকাস রাখা হয়েছে দলের প্রতীক ‘ধানের শীষে।’ জামায়াতে ইসলামীর থিম সং-এ ফোকাস রাখা হয়েছে তাদের দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লাকে।’ একইভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) তাদের থিম সং-এ প্রাধান্য দিয়েছে দলীয় প্রতীক ‘শাপলা কলি’কে।
বিএনপি তাদের দলের প্রচারে গান প্রকাশ করেছে। গানের কথায় বলা হয়, ‘আমার আগে আমরা, আমাদের আগে দেশ, ক্ষমতার আগে জনতা, সবার আগে বাংলাদেশ।’ জামায়াতের নির্বাচনি গান ‘নৌকা, ধানের শীষ, লাঙ্গল দেখা শেষ, দাঁড়িপাল্লা এবার গড়বে বাংলাদেশ।’
নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, ডিজিটাল প্রচারণা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠলেও মাঠের প্রচার এখনও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মাঠের প্রচারণায় যারা বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবে, তাদের প্রতিই ঝুঁকবেন ভোটাররা।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৩ কোটি। এটি দেশের আনুমানিক ১৭ কোটি ৬০ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ৭৪ শতাংশ। ডেটা রিপোর্টাল নামের এক বৈশ্বিক ডিজিটাল গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ২০২৫ সালের শেষের দিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারী, প্রায় ৫ কোটি ইউটিউব ব্যবহারকারী এবং প্রায় ৯২ লাখ ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী আছে।
এ ছাড়া ১৮ বছরের বেশি বয়সী ৫ কোটি ৬০ লাখের বেশি টিকটক ব্যবহারকারী রয়েছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটারের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। এই তরুণদের বেশির ভাগই প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। গত এক মাসের পরিসংখ্যানে বিজ্ঞাপনের প্রচারে দল হিসেবে এগিয়ে রয়েছে বিএনপি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
এদিকে, ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানারের পরিসংখ্যান বলছে, সংসদ নির্বাচন ঘিরে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০৯টি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভুয়া ফটোকার্ড, এআই দিয়ে বানানো ভিডিও প্রচারণায় নজরদারি রাখছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। কাজ করছে নির্বাচন কমিশনসহ জেলা প্রশাসনের নেতৃবৃন্দও।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার বলেন, প্রার্থীরা অনলাইন মাধ্যমে কিভাবে এবং কি ধরনের কনটেন্ট প্রচার করছেন, তা অবশ্যই জানাতে হবে। এছাড়াও গুজব প্রতিরোধে জেলা প্রশাসনসহ নির্বাচন কমিশন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পৃথক কমিটি আছে, তারা এসব সবসময়ই নজরদারি করছেন।
সোনালী/জেআর











