ঢাকা | জানুয়ারী ৩০, ২০২৬ - ১:৪৪ পূর্বাহ্ন

রাজশাহীতে এসে পদ্মা ব্যারেজ স্থাপনের প্রতিশ্রুতি তারেক রহমানের

  • আপডেট: Thursday, January 29, 2026 - 10:29 pm

দীর্ঘ ২২ বছর পর  নেতাকে কাছে পেয়ে আনন্দিত কর্মীরা 

স্টাফ রিপোর্টার: বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে কৃষকদের জন্য সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে। একই সঙ্গে বরেন্দ্র প্রকল্প পূর্ণ শক্তিতে চালু, পদ্মা ব্যারেজ স্থাপন ও আম সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হবে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত বিএনপি’র নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দীর্ঘ ২২ বছর পর  রাজশাহীতে সফরে আসায় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। দলীয় প্রধান হিসেবে রাজশাহীতে এটিই তার প্রথম সফর।

তারেক রহমান বলেন, ‘রাজশাহী বললেই বুঝায় পদ্মা নদী। এখন দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে পদ্মাই বলেন, তিস্তাই বলেন, ব্রক্ষপুত্রই বলেন, যে নদীই বলেন, পানি আছে কোনো? কোনো পানি নাই। পদ্মা নদীর সঙ্গে যে খালগুলো আছে সেখানেও পানি নাই। আমাদের নদীতে পানি দরকার। এই এলাকার খালগুলো আমরা খনন করতে চাই। পদ্মা ব্যারেজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, পদ্মা ব্যারেজ হলে সবাই সুবিধা ভোগ করবেন। সেই সঙ্গে রাজশাহীর আমের জন্য হিমাগার এবং কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে। জিয়াউর রহমানের হাত ধরে শুরু হওয়া বরেন্দ্র প্রকল্প খালেদা জিয়ার শাসনামলে আরও বড় হয়েছিল। ক্ষমতায় গেলে এই প্রকল্প চালু করতে চাই, খাল খনন করতে চাই, পদ্মা নদী খনন করতে চাই।

তিনি বলেন, ‘যেহেতু রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত এবং দেশের বৃহৎ একটি অংশ কৃষি পেশার সঙ্গে জড়িত। কৃষক ভালো থাকলে দেশের মানুষ ভালো থাকবে, কৃষি যদি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়, তাহলে দেশের মানুষ সহজে কৃষি পণ্য ক্রয় করতে পারবে। এজন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগামী ১২ তারিখে ধানের শীষ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে আমরা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করব।’

তারেক রহমান বলেন, ‘কেন এসব কাজ করছি? এই পরিকল্পনার কথাগুলো আপনাদের এ জন্য বললাম, বিগত ১৬/১৭ বছর এই দেশের সাধারণ মানুষের ভোটের অধিকার যেমন কেড়ে নেয়া হয়েছিল, এ দেশের মানুষের কথা বলার অধিকার যেমন কেড়ে নেয়া হয়েছিল ঠিক দেশের মানুষের জন্য তারা (বিগত সরকার) কোনো কাজ করে নাই।’

তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি, কীভাবে তারা মেগা প্রকল্প করেছে এবং এই মেগা প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ছিল মেগা দুর্নীতি। এলাকার মানুষের জন্য রাস্ত-ঘাট নির্মাণ, কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো, মা-বোনদের পাশে দাঁড়ানো, এলাকায় হাসপাতাল, এলাকায় স্কুল কলেজ ঠিক করা, হাসপাতাল ঠিক করা এসব কোনো কাজ বিগত সরকারের সময়ে হয়নি। কাজেই ২৪ সালের ৫ আগস্ট যে পরিবর্তন হয়েছে এর মাধ্যমে যেন জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়। সেজন্য ১২ তারিখে নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

তারেক রহমান বলেন, ‘১২ তারিখে বাংলাদেশের মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আগামী দিন আমরা দেশকে কোন দিকে পরিচালিত করব। দেশকে আমরা গণতন্ত্রের দিকে পরিচালিত করব নাকি দেশ অন্য কোনো দিকে চলে যাবে। এই বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গণতন্ত্রের দিকে যদি আমরা দেশকে ধাবিত করি, গণতন্ত্রের পথে যদি দেশকে আমরা পরিচালিত করি তাহলে আজকে আমরা যেসব পরিকল্পনার কথা বললাম, আপনাদের যে দাবিগুলোর কথা তুলে ধরলাম, মানুষের উপকার হয় সেই কাজগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যদি গণতন্ত্রকে ধরে রাখতে না পারি তাহলে মেগা প্রজেক্ট হবে, জনগণের কোনো প্রজেক্ট হবে না। জনগণের প্রজেক্ট যদি বাস্তবায়ন করতে হয় তাহলে অবশ্যই গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করতে হবে, গণতন্ত্রের ভিত্তিকে মজবুত করতে হবে। তাহলেই জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা শান্তিতে বিশ্বাস করি। কারণ শান্তি থাকলে আমি যে কথা বললাম, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবো। আমরা ঝগড়া-বিবাদের মধ্যে যেতে চাই না। আমি আজ এখানে দাঁড়িয়ে কারো সমালোচনা করছি না। আমি যদি সমালোচনা করি আপনাদের কোনে লাভ হবে? আপনাদের পেট ভরবে? আপনাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে? আপনাদের কৃষি ঋণ মওকুফ হবে?’ কিন্তু কোথাও যদি কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে অন্তর্বর্তীকালীন যে সরকার আছে তাদের উচিত সুষ্ঠু তদন্ত করা। সেই সুষ্ঠু তদন্তে যদি বিএনপির ভূমিকা থাকে আমরা সার্বিকভাবে সহযোগিতা করব।

সঠিক তদন্ত হলে দেশের আইন অনুযায়ী বিচার হতে হবে। আমরা মুসলাম, বৌদ্ধ, হিন্দু, খ্রিস্টান সকলে এদেশে আমরা শান্তিতে বসবাস করতে চাই। একাত্তর সালে যখন আমরা দেখিনি কে কোনো ধর্মে, ২৪ সালের ৫ আগস্টেও আমরা দেখিনি কে কোন ধর্মে। তাই আজ দেশ গড়ার সময় এসেছে, স্বাধীনতাকে রক্ষা করার সময় এসেছে। আজ আমরা ধর্ম দেখতে চাই না, আমরা দেখব মানুষ, আমরা দেখব বাংলাদেশি। যারা গণতন্ত্রের বিশ্বাসী আমরা তাদের সঙ্গে আছি।’

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে রাজশাহী, নাটোর ও চাপাইনবাবগঞ্জ জেলায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের হাতে ধানের শীষ তুলে দিয়ে নেতাকর্মী ও স্থানীয়দের সাথে পরিচয় করিয়ে বলেন, প্রত্যেকের হাতে ধানের শীষ তুলে দিলাম। আপনাদের দায়িত্ব তাদের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এদের দেখে রাখা আর নির্বাচিত হয়ে ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে এরা আপনাদের দেখবে। সবশেষে করবো কাজ গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ এই শ্লোগান দিয়ে জনসভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

মহানগর বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব মামুন-অর-রশিদের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটনের সঞ্চালনায় জনসভায় বক্তব্য রাখেন রাজশাহী, নাটোর এবং নওগাঁ জেলার বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রাজশাহী-১ আসনে মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন, রাজশাহী-২ আসনের মিজানুর রহমান মিনু, রাজশাহী-৩ আসনের এড. শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের ডি এম জিয়াউর রহমান, রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দূর্গাপুর) আসনের নজরুল ইসলাম মন্ডল, রাজশাহী ৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের আবু সাঈদ চাঁদ, নাটোর-১ আসনের ফারজানা শারমীন, নাটোর-২ আসনের রুহুল কুদ্দুস তালুকদার, নাটোর-৩ আসনের আনোয়ার হোসেন, নাটোর-৪ আসনের আবদুল আজিজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক শাহজাহান মিঞা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের আলহাজ্ব মোহা. আমিনুল ইসলাম ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের হারুনুর রশিদ।

এদিন সকাল থেকেই জেলা ও মহানগর বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা দলে দলে সমাবেশে যোগ দেন। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে মাদরাসা মাঠ ধীরে ধীরে জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সমাবেশকে কেন্দ্র করে নগরীর তালাইমারী, ভদ্রা, রেলগেট, নগরভবন, লক্ষ্মীপুর, আলুপট্টি, জিরো পয়েন্ট ও সি অ্যান্ড বি মোড়সহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা যায়।

এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টায় তারেক রহমান রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে নামেন। দলের প্রধান হিসেবে এটিই তারেক রহমানের প্রথম রাজশাহী সফর। এর আগে ২০০৪ সালে তিনি রাজশাহী এসেছিলেন।

বিমানবন্দরে নামার পর কড়া নিরাপত্তার ভেতর দিয়ে তারেক রহমানকে আমচত্বর-সিটিহাট-তেরোখাদিয়া-লক্ষ্মীপুর-সিঅ্যান্ডবি-সার্কিট হাউস হয়ে মাদ্রাসা ময়দানের সামনে দিয়ে শাহ মখদুম (রহ.)-এর মাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। মাজার জিয়ারত শেষে বেলা ১টা ৫৫ মিনিটে তিনি মাদ্রাসা মাঠে জনসভাস্থলে যান। এ সময় হাত নেড়ে নেতা-কর্মীদের অভিবাদন জানান তিনি। অন্যদিকে নেতাকর্মীদের বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়।