বরেন্দ্র অঞ্চলের শুষ্ক মাটিতে সুবাস ছড়াচ্ছে জিরা, কৃষকদের নতুন স্বপ্ন
গোদাগাড়ী প্রতিনিধি: বরেন্দ্র অঞ্চলের খরাপ্রবণ মাটিতে এবার ভিন্ন এক দৃশ্য। ধান বা গম নয়-রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাঠজুড়ে দুলছে মসলা ফসল জিরা। প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক উদ্দেশে জিরা চাষ শুরু হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার গল্প। দেশে জিরার চাহিদা দীর্ঘদিন ধরেই আমদানিনির্ভর।
সেই বাস্তবতায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়াতে গোদাগাড়ীতে নেয়া এই উদ্যোগকে কৃষি সংশ্লিষ্টরা দেখছেন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে। চলতি মৌসুমে উপজেলার কয়েকটি ব্লকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩ বিঘা (প্রায় ১ একর) জমিতে জিরার আবাদ করা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে প্রায় ১১০ কেজি জিরা উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখা গেছে। সে হিসাবে এক একর জমি থেকে প্রায় ৩৩০ কেজি জিরা পাওয়া যেতে পারে। কম সেচ, কম সার এবং তুলনামূলক কম শ্রমের কারণে এই ফসল চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে। এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত দেশের প্রথম উচ্চফলনশীল জাত ‘বারি জিরা-১’।
জাতটি বেলে-দোঁআশ ও পানি নিষ্কাশন সুবিধাযুক্ত জমিতে ভালো ফলন দেয়। মাত্র ১০০ থেকে ১১০ দিনের মধ্যেই ফসল ঘরে তোলা যায় এবং সঠিক ব্যবস্থাপনায় হেক্টর প্রতি ৬০০ থেকে ৮০০ কেজি পর্যন্ত উৎপাদন সম্ভব। রবি মৌসুমের এই ফসল নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে বপন করা হয়। প্রতি হেক্টরে প্রয়োজন হয় মাত্র ৮ থেকে ১০ কেজি বীজ। ধানসহ অন্যান্য প্রচলিত ফসলের তুলনায় সেচ ও সারের খরচ অনেক কম হওয়ায় লাভের অঙ্কও বেশি-এমনটাই বলছেন কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মরিয়ম আহমেদ বলেন, গোদাগাড়ীতে জিরা চাষ নিয়ে আমরা কয়েক বছর ধরে কাজ করছি। ফলন ও লাভ দুই দিক থেকেই এটি সম্ভাবনাময়। কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। দেশীয় উৎপাদন বাড়লে আমদানির চাপ কমবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে। জিরা শুধু রান্নাঘরের অপরিহার্য উপাদান নয়, এর রয়েছে ওষুধি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণাগুণও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলের শুষ্ক আবহাওয়া জিরা চাষের জন্য আদর্শ। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তা পেলে ভবিষ্যতে গোদাগাড়ী দেশের অন্যতম মসলা উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত হতে পারে। এমনকি রপ্তানির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা। বরেন্দ্রের মাঠে দুলতে থাকা এই জিরা এখন শুধু ফসল নয়—এটি কৃষকের স্বপ্ন, সম্ভাবনা আর নতুন দিগন্তের প্রতীক।











