ঢাকা | জানুয়ারী ১৫, ২০২৬ - ১:৩০ পূর্বাহ্ন

ঋণের চক্রে পড়ে নিঃস্ব জীবন

  • আপডেট: Wednesday, January 14, 2026 - 11:33 pm

স্টাফ রিপোর্টার: কেউ ঋণ নিয়েছিলেন ফসল ফলানোর আশায়। কেউ ব্যবসা দাঁড় করাতে। কেউ আবার পারিবারিক প্রয়োজনে। সময়মতো সেই ঋণের কিস্তি দিতে না পেরে ঋণ করেছেন আরও একাধিক সংস্থায়। কিন্তু ঋণের চক্র থেকে আর বের হতে পারেননি। এখন ঋণ শোধ করতে না পেরে কেউ গ্রাম ছেড়েছেন, কেউ আত্মগোপনে, কেউ আবার আর কোনো পথ না দেখে মৃত্যুকে বেছে নিয়েছেন। রাজশাহী জেলার বাঘা, চারঘাট, পবা, মোহনপুর ও তানোর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঋণগ্রস্ত ২৪টি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

দেখা গেছে, প্রতিটি পরিবার একই সঙ্গে একাধিক জায়গায় ঋণ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে বাঘা, চারঘাট, মোহনপুর ও তানোরের ১৬ জন ব্যবসার জন্য ঋণ নিয়েছিলেন। চারজন ফসল চাষের জন্য ঋণ করেছিলেন। সন্তানের বিয়ে, ছেলেকে বিদেশে পাঠানো, চিকিৎসার মতো পারিবারিক কাজের জন্য ঋণ করেছেন অন্যরা। ঋণ করে জুয়া খেলার ঘটনাও পাওয়া গেছে। গত বছরের ১৬ এপ্রিল থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজশাহীতে ঋণগ্রস্ত এক পরিবারের চারজনসহ ৮জনের অপমৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে চারজন আত্মহত্যা করেছেন বলে জানিয়েছেন পুলিশ ও পরিবারের সদস্যরা। অন্য একজন স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করেন। এসব মানুষ ক্ষুদ্রঋণ দানকারী বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার ‘টার্গেট ঋণের’ শিকার হচ্ছেন বলে মনে করেন রাজশাহীর বেসরকারি সংস্থা রুরাল আন্ডার প্রিভিলাইজড অ্যান্ড ল্যান্ডলেস ফারমার্স অর্গানাইজেশনের (রুলফাও) পরিচালক আফজাল হোসেন। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘টার্গেট (লক্ষ্যমাত্রা) পূরণ করতে গিয়ে এনজিওকর্মীরা ফিজিবিলিটি টেস্ট (সম্ভাব্যতা যাচাই) না করেই মানুষকে ঋণ দিচ্ছেন। দেখছেনও না আরও কয়টা এনজিওতে তাঁদের ঋণ আছে। এতে মানুষের জীবনযাপনের স্বাধীনতাই হারিয়ে গেছে।’

রাজশাহীতে ঋণদানকারী সংস্থাগুলোর অন্যতম একটি শাপলা গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা। এর সহকারী পরিচালক (এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন) জাহাঙ্গীর আলমের কাছে ‘টার্গেট ঋণের’ ব্যাপারে জানতে চাইলে বলেন, ‘ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) কাজ শেষ হলে এই সমস্যা থাকবে না। সিআইবি হলে একজন গ্রাহকের আইডি কার্ড দিয়ে যাচাই করা যাবে তাঁর আর কোনো সংস্থায় বা ব্যাংকে ঋণ আছে কি না। এখন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ না করে টার্গেট পূরণের জন্য তরুণ কর্মকর্তারা অনেক সময় তাড়াহুড়া করে ঋণ দেন। সেই ঋণ নিয়ে গ্রাহক কী করছেন, তা–ও হয়তো দেখেন না। আবার গ্রাহকেরাও তথ্য গোপন করেন। সেই ক্ষেত্রে সমস্যা হয়। এ রকম হলে শুধু গ্রাহক নন, সংস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

ঋণের ফাঁদে প্রান্তিক কৃষকেরা

বাঘা উপজেলার মাঝপাড়া বাউসা গ্রামের চাষি মীর রুহুল আমিন (৭০) তিনটি সংস্থায় ঋণ করে পেঁয়াজ চাষ করেছিলেন। উৎপাদন মৌসুমে পেঁয়াজের দাম পড়ে যায়। এ সময় তাঁর ঋণ ছিল ৯৯ হাজার ২৯০ টাকা। সাপ্তাহিক কিস্তি ছিল ৪ হাজার ৪০০ টাকা। গত বছরের ১৬ এপ্রিল তিনি আড়ানী স্টেশনে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। বাউসা ইউপি সদস্য মহসিন আলী জানান, গ্রামে প্রায় সাড়ে ৬০০ পরিবারের বাস। তাদের মধ্যে সাড়ে ৪০০ পরিবারই ঋণে জর্জরিত। এ উপজেলায় ২৬টি এনজিও কাজ করে। বাঘার পীরগাছা গ্রামের মারজুল হোসেনও পেঁয়াজের আবাদ করতে গিয়ে লোকসানে পড়েন। ঋণ শোধ করতে না পেরে প্রায় দুই বছর আগে স্ত্রী–সন্তান নিয়ে বাড়ি ছেড়েছেন। তাঁর এক প্রতিবেশী জানান, মারজুল ও তাঁর দুই ছেলে এখন ঢাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি করছেন। সেখান থেকে কিছু কিছু টাকা শোধ করার চেষ্টা করছেন।

গত বছরের ১৮ আগস্ট মোহনপুর উপজেলার ধুরইল গ্রামের খাড়ইল এলাকার পানবরজ থেকে এক কৃষক আকবর হোসেনের (৫০) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি এনজিও ও সুদ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। সেই টাকায় বাড়িতে একটি আধা পাকা ঘর নির্মাণ করছিলেন। এমন অবস্থায় কয়েক মাস ধরে পানের দাম না পাওয়ায় তিনি মানসিক চাপে ছিলেন বলে জানিয়েছিল পুলিশ। ২৬ সেপ্টেম্বর খাড়ইল গ্রামে গিয়ে কথা হয় সুজন শাহর সঙ্গে। তিনি জানান, বিভিন্ন সংস্থায় তাঁর বাবার প্রায় ৪ লাখ টাকা ঋণ ছিল। ঋণ নিয়ে খাড়ইল মোড়ের এক দোকানে গ্রামের অন্তত ১০ জন মানুষের সঙ্গে কথা হয়। সেখানে দোকানি ছাড়া সবাই জানান, তাঁরা এনজিও থেকে ঋণের কিস্তি নিয়েছেন।

পারিবারিক প্রয়োজনে ঋণ

বাঘা উপজেলার মাঝপাড়া বাউসা গ্রামের কৃষক রাশিদুল ইসলাম (৪৫) সাত-আট মাস আগে একটি সংস্থা থেকে ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। এই ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি ছিল ৫ হাজার ২০০ টাকা। এরপর আরেকটি সংস্থা থেকে নিয়েছেন ১ লাখ টাকা। সর্বশেষ আরও একটি থেকে নিয়েছেন ৬০ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, গরু কিনেছেন ও পাওয়ার ট্রিলারের যন্ত্রাংশ কিনেছেন। ৭০ হাজার টাকা খরচ করে দুই বিঘা জমি ইজারা নিয়ে পেঁয়াজ চাষ করেছেন। এতে সার-কীটনাশক বাবদ ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অন্যান্য খরচ হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। কিস্তির দায় মেটাতে একের পর এক ঋণ করেছেন। পেঁয়াজ চাষ করে টাকা তুলতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ৬০ হাজার টাকা দিয়ে একটি চায়ের দোকান কিনেছেন। এখন চা বিক্রি করেছেন। সম্প্রতি এই গ্রামে গিয়ে রাশিদুলের সঙ্গে সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘একুনো চলতিচি। আমি যেকোনো জাগাত যাব, আমি নিজেই জানিনি।’ একই গ্রামের বেলায়েত প্রামাণিক (৪০) প্রায় ১০ মাস আগে ৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে পেঁয়াজ চাষ করেছিলেন, ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন। দালাল চক্রের হাতে পড়ে ছেলে ফিরে এসেছে। পেঁয়াজেও লোকসান গুনেছেন। এরপর আরও তিনটি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছেন। যাতে তাঁর সাপ্তাহিক কিস্তি দাঁড়ায় ১১ হাজার ৮৬০ টাকা। কিস্তি দিতে না পেরে চার–পাঁচ মাস আগে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। সেখানে এখন রিকশা চালাচ্ছেন। যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘কিস্তি ধরে আর কোনো এনজিওকেই দিতে পরতিচিনি। যট্টুক জুগাড় হচ্ছে তট্টুকই দিচ্ছি।’ পবা উপজেলার বামুন শিকড় গ্রামের আনারুল ইসলাম (৩৩) কৃষিকাজ করেন। আট বছর আগে স্ত্রীর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের জন্য ৪০ হাজার টাকা ঋণ করেছিলেন। এনজিওকে বলেছিলেন, গরু কেনার কথা। কিস্তির টাকা জোগাড় করতে গিয়ে একে একে পাঁচটি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনটি এনজিওতে সপ্তাহে ১ হাজার ৬০০ টাকার কিস্তি আছে। ঋণের ভেতরে থেকে আর বের হতে পারছেন না বলে জানান তিনি।

ব্যবসার জন্য ঋণ

পবার একটি মেস থেকে গত ১৬ জুলাই বিকেলে অটোরিকশাচালক শামসুদ্দিনের (৩২) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। মৃতদেহের পাশে একটি সুইসাইড নোট পাওয়া যায়। তার এক জায়গায় লেখা ছিল, ‘সুদ দিও না, কিস্তি দিও না।’ তাঁর স্ত্রী শিলা খাতুন বলছেন, ব্যবসার জন্য তাঁর স্বামী ঋণ করেছিলেন। কিন্তু ব্যবসায় লোকসানের পর ঋণের চাপে আত্মহত্যা করেছেন। ঋণের মামলার হাজিরার দিন হাজিরা না দিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি তানোর উপজেলার সামাসপুর গ্রামে। ঋণের দায়ে গ্রাম ছেড়ে পবায় এসে মেসে থাকতেন। চারঘাটের মুংলি গ্রামের সেলিম হোসেন একজন ঋণ কারবারির কাছ থেকে ব্যবসার জন্য ঋণ নিয়েছিলেন। শোধ করতে না পেরে সপরিবার পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। গত ৯ এপ্রিল এসএসসি পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যায় তাঁর ছেলেকে ধরে নিয়ে যান ঋণ কারবারি। পরের দিনে সেনাবাহিনী ওই শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে। এখন সেলিম হোসেনের ইলেকট্রনিকস পণ্যের দোকান বন্ধ পড়ে আছে। চারঘাটের কালুহাটিতে জুতার কারখানা করে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন। তবে অনেকে ঋণ নিয়ে পথেও বসে গেছেন। সেই রকম একজন আলমগীর হোসেন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ছেড়েছেন। বাড়িতে এখন তাঁর মা-বাবা আছেন। তাঁরা বলতে পারেন না, ছেলে কোথায় আছেন। কালুহাটি বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, তাঁদের বাজারের অন্তত ১০ ব্যবসায়ী ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজনের আর ঋণ শোধ করার কোনো উপায় নেই। একই কাজে গ্রামের ঋণগ্রস্ত মাইনুল ইসলাম একতলা ছাদের বাড়ি ফেলে আত্মগোপনে রয়েছেন। ১০ মাস আগে বাড়ির দরজায় সাঁটানো একটি এনজিওর নোটিশে তাঁর অপরিশোধিত ঋণের পরিমাণ লেখা ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার ৫৮০ টাকা। এখনো তিনি বাড়িতে ফিরতে পারেননি। একই অবস্থা গ্রামের উজ্জ্বল ভ্যারাইটি স্টোর নামের দোকানের মালিক উজ্জ্বল আলীর।

চারঘাটের কালুহাটিতে জুতার কারখানা করে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন। তবে অনেকে ঋণ নিয়ে পথেও বসে গেছেন। সেই রকম একজন আলমগীর হোসেন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ছেড়েছেন। বাড়িতে এখন তাঁর মা–বাবা আছেন। তাঁরা বলতে পারেন না, ছেলে কোথায় আছেন। কালুহাটি বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, তাঁদের বাজারের অন্তত ১০ ব্যবসায়ী ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজনের আর ঋণ শোধ করার কোনো উপায় নেই।

 

গত ২৩ সেপ্টেম্বর চারঘাটের বনকিশোর গ্রামের ঋণে জর্জর ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি মিঠন দাস ফেসবুক লাইভে তাঁর দুঃখের কথাগুলো বলে রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তিনি প্রথমে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তখন ঋণ করেছিলেন। ব্যবসা করে ঋণ শোধ করতে পারেননি। পরে ওষুধ কোম্পানিতে ঢুকেছিলেন। কোম্পানির তিন লাখ টাকা পকেটমার নিয়ে নেয়।

ঋণের টাকায় জুয়া, ঋণ করে চল্লিশা

কৃষক মিনারুল ইসলাম (৩৫) পবার বামনশিকড় গ্রামের রুস্তম আলীর ছেলে। গত বছরের ১৫ আগস্ট নিজ বাড়ি থেকে মিনারুল ইসলাম, তাঁর স্ত্রী মনিরা খাতুন (৩০), ছেলে মাহিম (১৪) ও মেয়ে মিথিলার (৩) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। লাশের পাশে চিরকুট পাওয়া যায়, যাতে মিনারুলের স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার কথা স্বীকার করেন। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, মিনারুল জুয়া খেলতেন। ঋণের টাকা জুয়ায় শেষ করেছেন। মিনারুলের মৃত্যুর পর বাবা রুস্তম আলী আবার লাখখানেক টাকা ঋণ করে ছেলের চল্লিশা করেছেন।

রাজশাহী জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনিরা খাতুন বলেন, সমাজসেবা থেকে নিবন্ধন নেওয়া কোনো এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে গ্রাহক আত্মহত্যা করছেন বা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন—এ রকম কোনো অভিযোগ আসেনি। পেলে তাঁরা ব্যবস্থা নিতে পারতেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাজশাহী জেলার সভাপতি আহমদ সফিউদ্দিন বলেন, ‘যাঁরা এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, তাঁদের জন্য ন্যূনতম জীবনমানের একটা নিশ্চয়তা থাকা দরকার সমাজে। তারা কেমন বাসায় থাকছে, ন্যূনতম পুষ্টি, চিকিৎসাটা ঠিকমতো পাচ্ছে কি না—এসব নিয়ে ভাবনাটাই আমাদের আসলে নেই।’ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, সামাজিক দায়বদ্ধতা এসব থাকলে নিশ্চয়ই মানুষ ঋণের দায়ে আত্মহত্যা করা বা বাড়িঘর ফেলে পালিয়ে যাওয়ার মতো কাজ করবে না।