প্রাথমিকে প্রশ্নফাঁস, রাজশাহীতে ৬ জনসহ গ্রেপ্তার ৪৩
স্টাফ রিপোর্টার: দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা। গতকাল শুক্রবার বেলা ৩টা থেকে একযোগে দেশের ৬১ জেলায় এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
তবে পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে বিভিন্ন জেলায় নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সরবরাহ করার আশ্বাস দিয়ে প্রতারণার অভিযোগে রাজশাহী, নওগাঁ, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪৩জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইন-শৃখলা বাহিনী।
গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্যাংকের ১২টি স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক, ২১টি স্ট্যাম্প, ১৮টি মোবাইল ফোন এবং মানিব্যাগসহ নগদ ৩৭ হাজার ৯৪৮ টাকা উদ্ধার করা হয়।
রাজশাহীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সরবরাহ করার আশ্বাস দিয়ে প্রতারণার অভিযোগে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বোয়ালিয়া থানা পুলিশের আলাদা দুটি দল নগরীর উপশহর এবং মালোপাড়া এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তার ৬জন হলেন- নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার মাকলাহাট গ্রামের আল মামুন (৪২), একই গ্রামের আনজুয়ারা খাতুন (২৫), নওগাঁর মান্দা উপজেলার দাওই গ্রামের রায়হান কবির (৩০), আত্রাই উপজেলার হাটকালুপাড়া গ্রামের নয়ন আলী (২৭), নওগাঁ সদরের চক সুখদা গ্রামের জুলফিকার আলী (৪০) ও রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার নোনাভিটা গ্রামের মাহবুব আলম (৪৬)।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে আরএমপির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এ দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ছিল। এই পরীক্ষায় চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার জন্য এরা নিজেদের ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা পরিচয় দিয়েছিলেন। প্রার্থীদের প্রশ্নপত্র সরবরাহের আশ্বাস দিয়ে তারা তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষরিত ব্যাংকের ফাঁকা চেক, স্বাক্ষরযুক্ত ফাঁকা স্ট্যাম্প এবং প্রার্থীদের প্রবেশপত্র ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নিয়েছিলেন।
তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্যাংকের ১২টি স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক, ২১টি স্ট্যাম্প এবং সাতটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাত কয়েকজন আসামি আছেন। তাদেরও শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। আসামিদের মধ্যে রায়হান অসুস্থ। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকিদের আদালতে তুলে রিমান্ডের আবেদন করা হবে।
এদিকে, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) ও পুলিশের যৌথ অভিযানে নওগাঁয় প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের দুজনসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে শহরের নীলসাগর হোটেল ও পোরশা রেস্ট হাউজে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
এসময় তাদের কাছে থেকে ১১টি মোবাইল, একটি মানিব্যাগসহ নগদ ৩৭ হাজার ৯৪৮ টাকা উদ্ধার করা হয়। এনএসআই ও পুলিশের পক্ষ থেকে আটকের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে দুজন প্রশ্নফাঁস চক্রের সদস্য, ৬জন পরীক্ষার্থী ও একজন অভিভাবক।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। পরবর্তীতে বিস্তারিত জানানো হবে। গ্রেপ্তার ৬ পরীক্ষার্থী হলেন- জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার বামইন গ্রামের আবুল বাসারের ছেলে আবু সাইদ (৩১) ও চন্ডীপুর গ্রামের লুৎফর রহমানের ছেলে সারোয়ার হোসেন (৩১), মহাদেবপুর উপজেলার জিওলি গ্রামের ফারাজুল ইসলামের ছেলে হাবিবুর রহমান (২৬) ও মালাহার গ্রামের লুৎফর রহমানের ছেলে ফারুক হোসেন (৩১), সাপাহার উপজেলার কওমি মাদরাসা পাড়ার মৃত ইউসুফ আলীর ছেলে আতাউর রহমান (৩০) ও পোরশা উপজেলার দিঘা গ্রামের রাজ্জাক সরকারের মেয়ে রেহান জান্নাত (৩১)।
প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের দুজন হলেন- পত্নীতলা উপজেলার শিবপুর গ্রামের সালেহ উদ্দীনের ছেলে মামুনুর রশিদ (৪১) ও মহাদেবপুর উপজেলার জিওলি গ্রামের মৃত মোসলেম উদ্দীনের ছেলে আহসান হাবিব (৪০)। এছাড়া আটক অভিভাবক ফারাজুল ইসলাম (৪৮) জেলার মহাদেবপুর উপজেলার জিওলি গ্রামের মৃত লাল মোহাম্মদের ছেলে।
গাইবান্ধা: গাইবান্ধায় সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় নকলের চেষ্টাকালে ডিভাইসসহ এক পরীক্ষার্থীকে আটক করেছে পুলিশ। আটক ব্যক্তির নাম পরিমল সরকার। গতকাল দুপুরে গাইবান্ধা শহরের দারুল হুদা আলিম মাদ্রাসা কেন্দ্রে পরীক্ষা চলাকালে কর্তব্যরত কেন্দ্র পরিদর্শক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্দেহ হলে তাঁকে তল্লাশি করা হয়। এ সময় তাঁর শরীরে লুকানো অবস্থায় কথা বলার একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। পরে ঘটনাটি নিশ্চিত হলে তাঁকে আটক করে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়।
গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আটক পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁকে আদালতে সোপর্দ করা হবে।
কুড়িগ্রাম: কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ও ভুয়া পরীক্ষার্থীসহ প্রশ্নফাঁস চক্রের ১১ সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ। এসময় তাঁদের কাছ থেকে মোবাইল ফোনসহ ডিজিটাল ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে। দুপুরে আলাদা অভিযানে উপজেলা শহরের কাজী মার্কেটের পেছনের একটি বাসা এবং থানা এলাকা থেকে তাঁদের আটক করে পুলিশ। তবে উদ্ধার হওয়া প্রশ্নপত্রের ফটোকপির সঙ্গে পরীক্ষায় ব্যবহৃত প্রশ্নপত্রের মিল রয়েছে কি না তা তাৎক্ষণিক নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। নাগেশ্বরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ হিল জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
আটক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার নাম মিনারুল ইসলাম। তিনি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। বাকিদের পরিচয় শুক্রবার বিকেল পৌনে ৪টা পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। এদের মধ্যে প্রকৃত এবং ভুয়া পরীক্ষার্থী (প্রক্সি) রয়েছে। উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকদলের আহ্বায়ক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘অভিযুক্ত ও আটক মিনারুল ইসলাম আমাদের কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনি একই সঙ্গে উপজেলা বিএনপির সদস্য। তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি চলছে।’
ঘটনার পর নাগেশ্বরী উপজেলার বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শনে যান পুলিশ সুপার খন্দকার ফজলে রাব্বি। তিনি বলেন, ‘আটকদের মধ্যে পরীক্ষার্থী এবং প্রক্সি পরীক্ষার্থী রয়েছে। আটক সকলের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
দিনাজপুর: পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে দিনাজপুরে ডিভাইসসহ ১৬ জনকে আটক করা হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে জেলার ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে তাঁদের আটক করা হয়। প্রশাসন জানিয়েছে, তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
যেসব কেন্দ্রে ডিভাইসসহ পরীক্ষার্থী আটক হয়েছেন কেন্দ্রগুলো হলো- ক্রিসেন্ট কিন্ডারগার্টেন গার্লস হাইস্কুলে দুজন, দিনাজপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে একজন, কাদের বক্স মেমোরিয়াল কলেজে দুজন, দিনাজপুর কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজে একজন, দিনাজপুর উচ্চবিদ্যালয়ে একজন, দিনাজপুর সরকারি মহিলা কলেজে একজন, দিনাজপুর জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়ে একজন, দিনাজপুর মিউনিসিপাল হাইস্কুলে একজন, দিনাজপুর নূরজাহান কামিল মাদ্রাসায় চারজন, দিনাজপুর কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে একজন এবং কেরি মেমোরিয়াল হাইস্কুলে একজন।
দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) এস এম হাবিবুল হাসান জানান, আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় যারা জড়িত, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের চিহ্নিত করে আটক করার প্রক্রিয়া চলছে।











