রাজশাহীতে নিয়ন্ত্রণহীন বালু ট্রাকের চাকায় বছরে ঝরছে শতাধিক প্রাণ
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীতে বেপরোয়া বালুবাণিজ্য আর নিয়ন্ত্রণহীন বালু ট্রাকের চাকায় বছর বছর প্রাণ হারাচ্ছেন শতাধিক মানুষ। দানবীয় এসব বালু ট্রাক চলাচলে নেই কোনো নিয়ন্ত্রণ। দিনের বেলাতেও ঢুকে পড়ছে নগরীর অলিগলিসহ জনবহুল এলাকায়।
রাজশাহী নগরীর প্রধান সড়কগুলোতেও ঢুকে পড়ছে বালু ট্রাক। কারো কোনো বাধা নেই, নেই পুলিশের বাধা। দানবীয় গতিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে চলাচল করছে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা। বেপরোয়া এসব বালুর ট্রাকের ধাক্কায় অথবা চাপায় অহরহ প্রাণ যাচ্ছে পথচারী কিংবা সড়ক সংলগ্ন হাট বাজারে ব্যস্ত লোকজন। কখনো বালুর ট্রাক ঢুকে পড়ছে সড়কের পার্শ্ববর্তী দোকানে বা বাসা বাড়িতে। অকাতরে ঝরছে প্রাণ কিন্তু নেই কোনো আইনি ব্যবস্থা। বালু মাফিয়ারা টাকা ঢেলে চাপা দিচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের আইনি অধিকারকে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বালু মাফিয়াদের কাছে পুরোপুরি জিম্মি হয়ে পড়েছেন রাজশাহীর নদী তীরবর্তী মানুষ। প্রশাসনও তাদের হাতে। এদিকে রাজশাহীতে বালু ট্রাকের অবাধ চলাচলে ধ্বংস হচ্ছে শত শত কোটি টাকার সড়কসহ যোগাযোগ অবকাঠামো। ইজারা শর্ত লঙ্ঘন করে নদীর পাড় কেটে বালু মাটি উত্তোলন, জনাকীর্ণ এলাকায় যত্রতত্র মজুদ ও বেপরোয়া পরিবহনের ফলে পদ্মার উজানে গোদাগাড়ী থেকে ভাটিতে চারঘাট-বাঘা পর্যন্ত নদী তীরবর্তী গ্রামগুলিতে মানুষের বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, রাজশাহী বালুমহালগুলো আগে নিয়ন্ত্রণ করত একশ্রেণির বালু মাফিয়া যাদের পৃষ্ঠপোষক ছিল আওয়ামী লীগের এমপি-মন্ত্রী-মেয়রসহ প্রভাবশালী নেতারা। গত বছর ৫ আগস্টের পর তারা পালিয়ে গেলে তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন নতুন করে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতাদের একাংশ। ফলে প্রতিবাদ করে বা অভিযোগ দিয়ে লাভ হয় না।
গত ১ জানুয়ারি ভোরে একটি ড্রাম ট্রাক রাজশাহীর শ্যামপুর বালুঘাট থেকে নাটোরের দিকে যাওয়ার সময় পুঠিয়ার ঝলমলিয়া বাজারের কলা ব্যবসায়ীদের ওপর উঠে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই ৫ জন কলা ব্যবসায়ী নিহত হন। এ ঘটনায় নিহত কলা ব্যবসায়ী সিয়ামের বাবা শাহীন আলী বাদী হয়ে গত ২ জানুয়ারি রাজশাহীর পবা হাইওয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে ঘটনার পাঁচদিন পরও পুলিশ ট্রাকের চালককে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
হাইওয়ে থানার ওসি মোজাম্মেল হক জানান, চালক পলাতক। তদন্তসাপেক্ষে ড্রাম ট্রাকের মালিকও আসামি হতে পারেন। জানা গেছে, পুলিশ এখনো চালককে শনাক্ত করতে পারেনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছর ১৩ জানুয়ারি স্কুলে মেয়েকে আনতে গিয়ে নগরীর চন্দ্রিমা থানার বারো রাস্তার মোড়ে বেপরোয়া একটি বালু ট্রাককে সাইড দিতে গিয়ে সড়কের ওপর ভেসপার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে পড়েন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুরনজিত মহালদার। গুরুতর অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একদিন পর রাবির এই শিক্ষক মারা যান।
গত এক বছরেও এ ঘটনার জন্য দায়ী বালুবাহী ট্রাকটিকে চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ। এদিকে গত ১০ অক্টোবর ভোরের দিকে রাজশাহী-নওগাঁ সড়কের নওহাটা আনসার ক্যাম্পের সামনে মান্দাগামী একটি বেপরোয়া বালুর ট্রাক পেছন থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক শিব শঙ্কর রায় ও দর্শন বিভাগের অধ্যাপক আসাদুজ্জামানের মোটরবাইককে ধাক্কা দেয়। এতে সড়কে ছিটকে পড়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন অধ্যাপক শিব শঙ্কর রায়।
গত বছর ২৬ মে রাতে নগরীর বাইপাস সড়কের আমচত্বর এলাকায় বালুবাহী ট্রাক পেছন থেকে আরেকটি পাথর বোঝাই ট্রাককে ধাক্কা দিলে সুমন হোসেন (২৬) নামের একজন নিহত হয়। গত বছর ২৬ জুলাই ভোরে রাজশাহী-নওগাঁ সড়কের মান্দা উপজেলার চৌদ্দ মাইল নামক স্থানে রাজশাহী থেকে নওগাঁগামী একটি বালুবাহী ড্রাম ট্রাক পেছন থেকে আরেক ট্রাককে ধাক্কা মারে। এতে সামনের ট্রাকের হেলপার শ্রাবণ হক (২৩) নিহত হন। সর্বশেষ গত ১ জানুয়ারি পুঠিয়ার ঝলমলিয়া বাজারে বালুর ড্রাম ট্রাক উল্টে ৫ জন কলা ব্যবসায়ী নিহত হন।
রাজশাহী বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, বালুর ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলের কারণে জেলার বিভিন্ন সড়কে বছরে শতাধিক মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। এছাড়া গত এক বছরে রাজশাহীতে ২৬৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ১৮৭ জন। সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল। যানবাহন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের। বালুবাহী ড্রাম ট্রাকের দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে বলে বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে রাজশাহীর সড়কগুলোতে দুর্ঘটনা বাড়ার পাশাপাশি বালুবাহী ট্রাকের কারণে সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাদিয়া আফরিন ঝিনুক। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, বালু ও মাটিবাহী ট্রাকসহ অপ্রচলিত বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে জেলার সড়কগুলো দিয়ে। অনেক সড়ক ঘেঁষে তৈরি হয়েছে ইটভাটা। এসব ইটভাটায় বালু ও মাটি বহন করা হচ্ছে যথেচ্ছভাবে। বালু ও মাটি বহনের সময় ঢেকে রাখা হয় না। ট্রাক থেকে বালু ও কাদামাটি সড়কে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সড়ক পিচ্ছিল হয়ে যায়।
এতে সড়কে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। এতে একদিকে যেমন সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে তেমনি কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা সড়কগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া মাছ বহনকারী ট্রাক থেকে পানি পড়ে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব সড়ক মেরামতে বছর বছর বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ খরচ হচ্ছে; যা এক ধরনের অপচয় বলা যেতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীর পদ্মার বালুঘাটগুলো থেকে দিনরাত বালু ও নদীর পাড় থেকে মাটি কেটে বিক্রি করছে বালু মাফিয়ারা। একেকটি ট্রাকে ৩০ থেকে ৪০ টন করে বালু ও মাটি বহন করা হচ্ছে। অথচ এসব সড়কের সর্বোচ্চ ভারবহন ক্ষমতা ১৫ থেকে ২০ টন। দেখা গেছে, নগরীর উপকণ্ঠ শ্যামপুর বালু মহাল থেকে বালু উত্তোলন করে চৌদ্দপায়া বিহাসের পার্শ্ববর্তী সড়ক দিয়ে চলাচল করছে ড্রাম ট্রাক। মাত্র দেড় বছর আগে বিহাস সড়কটি বিপুল টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয়। এই সড়কটি বালু ট্রাকের দাপটে নষ্ট হচ্ছে।
অন্যদিকে চৌদ্দপায়া থেকে নগরীর বিমান চত্বর পর্যন্ত চারলেন নতুন এই সড়কটি নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে ৩৫০ কোটি টাকা। শ্যামপুর বালুঘাট থেকে ড্রাম ট্রাকগুলি ওভারলোড নিয়ে দিনরাত চলাচল করছে এই সড়কে। বর্তমানে সড়কটির অধিকাংশ স্থান দেবে গেছে। এলাকার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, একটা চকচকে নতুন সড়ক তৈরি হয়েছে কয়েক বছর আগে। বেপরোয়া বালু ট্রাক চলাচলের কারণে সড়কটির অধিকাংশ জায়গা বসে গেছে। এখন যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনে অভিযোগ দিলেও করপোরেশন থেকে বালুর ট্রাক চলাচল নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।
বালুবাহী ড্রাম ট্রাকের বেপরোয়া চলাচল নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার নুর আলম সিদ্দিক গণমাধ্যমকে বলেন, সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নগরীতে কোনো ভারি যানবাহন চলাচল করতে দেয়া হয় না। বালুবাহী ড্রাম ট্রাক চলাচল করলে আমরা আইনি ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। তবে চৌদ্দপায়া-বিমান চত্বর সড়কটি একটি বাইপাস সড়ক। এ সড়কটি দিয়ে বালুবাহী ড্রাম ট্রাক চলাচল করে। বালু পরিবহনে কিছু নিয়ম আছে আমরা সেটা মেনে চলতে নির্দেশ দিয়েছি। ওভারলোড হলে ট্রাফিক আইন অনুযায়ী মামলা করা হয়ে থাকে। বালুর ট্রাকের কারণে কিছু দুর্ঘটনা ঘটে। তবে সব ক্ষেত্রে পুলিশ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে।











