ঢাকা | মে ৩০, ২০২৪ - ৯:৪৬ পূর্বাহ্ন

ইট ভাটায় পুড়ছে শিশুর শৈশব

  • আপডেট: Monday, May 13, 2024 - 9:39 pm

রফিকুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জ থেকে: যেখানে আগে চোখ মেলে তাকালেই দেখা যেত রবি ও বোরো শষ্যের খেত। আজ সেখানে থরে থরে সাজানো কাঁচা ইট। ইটগুলো রোদে পরিমাপ মতো শুকানোর পর উঠবে চুল্লিতে।

আগুনের তাপে পুড়ে হবে ইট। ইটভাটার এসব চুল্লিতে শুধু ইটই পুড়ছে না, পুড়ছে শিশুর স্বপ্নও। লেখাপড়া ছেড়ে ইটভাটাগুলোতে নিজের শৈশব-কৈশোর কাটিয়ে দিচ্ছে বহু শিশু।

সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ জেলার কয়েকটি উপজেলার ইটভাটায় গিয়ে দেখা যায়, পূর্ণবয়স্কদের মতোই ভারি কাজ করছে ৮-১৫ বছরের শিশুরা। কম অর্থে বেশি শ্রম আদায় করতে ভাটা মালিকরা এসব শিশু শ্রমিক নিয়োগ করে থাকেন বলে দাবি শ্রম অধিকার কর্মীদের।

ওইসব শিশু শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। এখন চুক্তিতে নেমেছে এই কাজে। আবার অনেকে বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দিয়ে শ্রমিক হয়েছে। কেউ এসেছে বাড়ি থেকে পালিয়ে, কেউ কেউ বাবার সঙ্গেই ভাটায় কাজ করতে এসেছে।

ভাটাগুলোতে এসব শিশুরা কাঁচা ইট রোদে শুকানো, ইট তৈরি, ট্রলিতে করে ইট টেনে ভাটাস্থলে পৌঁছানো, মাটি বহন করা ও চুল্লিতে কয়লা পৌঁছে দেয়াসহ পানি ছিটানোর কাজ করে থাকে।

সরেজমিন রায়গঞ্জ উপজেলার পাঙ্গাসী ইউনিয়নের পদ্মা ইটভাটার প্রবেশ পথেই দেখা যায় তিনজন শিশু রাস্তায় পানি দিচ্ছে। জিজ্ঞাসা করতে না করতেই বলে, ‘পানি দিয়ে আবার ইট উল্টাবো তাইলে ১০০ টাকা করে হবে আমাদের।’

পানি ছিটানোর কাজে নিয়োজিত ফয়সাল (১০) স্থানীয় বৈকুন্ঠপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। এখন লেখাপড়া ফেলে ভাটায় কাজ করছে। সে ইট উল্টানো ও মাটি আনার কাজ করে। শিশু শ্রমের একই চিত্র দেখা যায় ওই উপজেলার মেসার্স সরকার ব্রিকস, মেসার্স আরএস ব্রিকস, এডিবি ব্রিকস, কেএম ব্রিকস ও মামা ভাগ্নে ব্রিকসে।

রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে শিশুদের ত্বক ও নখ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রক্তস্বল্পতা, অ্যাজমা, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাছাড়া শিশু শ্রম সরকারি ভাবেই নিষিদ্ধ। ফলে যারা কাজ করায় তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ।

ওই উপজেলার চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রুবেল আহম্মেদ বলেন, ইটভাটায় কাজ করতে গিয়ে শিশুরা শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট লোকমান হাকিম বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি শিশু বা কিশোরকে কোনো কাজে নিযুক্ত করলে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

জানা যায়, সিরাজগঞ্জে মোট ১১৯টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ১১২টি ইটভাটার কোনো ধরনের লাইসেন্স বা বৈধ কাগজপত্র নেই। এর মধ্যে রায়গঞ্জে ৪৯টি ভাটায় ইট পোড়ানোর কার্যক্রম চললেও ৪০টির নেই লাইসেন্স। আরও কিছু ইটভাটার লাইসেন্স থাকলেও তা ২০১৭ সালের পর নবায়ন করা হয়নি।

দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ অবৈধভাবেই চলছে এসব ইটভাটা। তবে অবৈধ ইটভাটা বন্ধে হাইকোর্ট নির্দেশ দিলেও তা মানা হচ্ছে না। বরং ইটের মৌসুম আসায় ভাটাগুলোতে জোরেশোরে কাজ চলছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন বা পরিবেশ অধিদপ্তর।

জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা তালুকদার ইটভাটায় শিশু শ্রমিক নেই দাবি করে বলেন, কিছু শিশু তাদের বাবার সঙ্গে আসে। তবে শিশুদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় না। অবৈধ ভাটার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারি বিধি অনুযায়ী ইটভাটাগুলোর শর্ত পূরণ না হওয়ায় পরিবেশের ছাড়পত্র মিলছে না। তবে শর্তগুলো শিথিল করা হলে বৈধভাবেই ভাটা পরিচালিত হবে।

এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইমরান হোসেন বলেন, যেসব ইটভাটা শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত করছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাছাড়া অবৈধ ইটভাটা বন্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।