ঢাকা | মে ৩০, ২০২৪ - ১২:০৯ অপরাহ্ন

ত্রিমুখী যন্ত্রণায় বিপর্যস্ত নগরজীবন

  • আপডেট: Saturday, April 6, 2024 - 11:59 pm

* মশার সীমাহীন উপদ্রব
* কাঠ ফাটা রোদ আর তীব্র গরম
* ভয়াবহ লোডশেডিং

জগদীশ রবিদাস: সারা দেশে বাসযোগ্য শহরের তালিকায় রাজশাহীকে একটু আলাদাভাবেই বিবেচনা করা হয়। বলা হয়, অন্য যে কোন শহরের মানুষ রাজশাহীতে এসে স্থায়ী বসবাস করতে চান। কারণ বাতাসে ক্ষতিকারক ধূলিকণা কমাতে বিশ্বের সেরা শহর এই রাজশাহী। সবুজায়ন, নির্মল বাতাস, পরিচ্ছন্নতার মত নানা সূচকে রাজশাহীবাসীর জনজীবন বেশ স্বাচ্ছন্দ্যের হলেও সম্প্রতি তা যেন পরিণত হয়েছে অসহ্য যন্ত্রণায়! একদিকে শহরজুড়ে চলছে মশার সীমাহীন উপদ্রব।

সকাল, সন্ধ্যা, রাত কখনোই যেন মশা থেকে রেহাই নেই। অপরদিকে টানা কয়েকদিন ধরে চলছে মাঝারি তাপপ্রবাহ। কাঠফাটা রোদ আর প্রচণ্ড গরমে হাঁপিয়ে উঠেছে সবুজ নগরীর জনজীবন। এখানেই শেষ নয়, চলমান এই বাড়তি যন্ত্রণায় ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে লোডশেডিং। দিনে-রাতে মশার কামড়, অতিরিক্ত গরম ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে পুরোপুরি বিপর্যস্ত নগরজীবন। সবকিছুতেই যেন যন্ত্রণা। নগরবাসীর অভিযোগ, তাদের এমন যন্ত্রণায় মলম দেয়ার যেন কেউই নেই।

শহরে মশার উপদ্রব বেড়েই চলছে। শুধু সন্ধ্যা বা রাতই নয়, দিনেও মশারি টাঙিয়ে বা কয়েল জ্বালিয়ে থাকতে হচ্ছে পদ্মা পাড়ের মানুষকে। এতে শহরজুড়ে চালানো পরিচ্ছন্নতার প্রকৃত কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সর্বমহলে। সিটি করপোরেশন বলছে, তাদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত এবং নিয়মিত ওষুধ ছিটানো ও স্প্রে করা হচ্ছে। তবে শহরের মানুষের অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের কোন কার্যক্রমই সেভাবে কাজে আসছে না। কাজে আসলে মশা অবশ্যই কমে যেত।

মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটির একটি সভাও হয়েছে। মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা ওয়ার্ড পর্যায়ে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছেন। মাঠ পর্যায়ে গিয়েও কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে নগরবাসীর বক্তব্য- এতো কিছু করেও কেন মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না! হয়তো তারা সমস্যার মূল কাঠামো না বুঝেই কার্যক্রম চালাচ্ছেন, না হয় কার্যক্রম ও পরিকল্পনা দুটোই ভুল।

এ নিয়ে জানতে চাইলে রাসিকের উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা সেলিম রেজা রঞ্জু বলেন, মশা থেকে জনগণকে স্বস্তি দিতে সিটি করপোরেশন নিজের সর্বোচ্চটা করে যাচ্ছে। মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য করপোরেশনের পক্ষ থেকে টাস্কফোর্স কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডেই নানা কার্যক্রম চালাচ্ছে। সবখানেই নিয়মিত লার্ভিসাইড (লার্ভা মারার ওষুধ) ছিটানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে ইতিমধ্যে আমরা একটি সভাও করেছি। আমরা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এসময় তিনি জনগণকে আরও বেশি সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন।

এদিকে রাজশাহীতে প্রচণ্ড গরমে সাধারণ মানুষের অবস্থা কাহিল হয়ে পড়েছে। তীব্র রোদে তেতে উঠেছে পদ্মাপাড়ের শহর। বৃষ্টিহীন চৈত্রে কাঠ ফাটা রোদ আর গরমের দাপটে জনজীবনে যখন ত্রাহি-ত্রাহি অবস্থা; ঠিক তখনই মিলছে না বিদ্যুৎ। মশা আর গরমের মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে লোডশেডিং। গত দুই দিন ধরে রাজশাহীতে গ্রাম ও শহরে বেড়েছে লোডশেডিং। এলাকাভেদে টানা এক ঘণ্টা পর্যন্তও লোডশেডিং হচ্ছে। গত শুক্রবার রাত থেকে গতকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত শহরের অধিকাংশ এলাকাতেই অসহনীয় লোডশেডিং হয়েছে। কোথাও কোথাও টানা দুই থেকে তিন ঘন্টাও বিদ্যুতের দেখা পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ আছে, পবিত্র রমজান মাসে অনেকেই সেহরি খাওয়ার সময় বিদ্যুত পাচ্ছেন না। এতে তাদের অনেকটাই বিপাকে পড়তে হচ্ছে। অস্বাভাবিক ও অসহনীয় এমন লোডশেডিংয়ে নাকাল হয়ে পড়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। পাঠানপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী শামীম আহমেদ বলেন, রমজান মাস চলছে। রাতে সেহরি খেতে উঠতে হয়। গত দুই দিন ধরে দেখছি, হয় সেহরি খাওয়ার সময়, না হয় সেহরি শেষে নামাজ পড়ার সময় একবার করে লোডশেডিং হচ্ছে। অতিরিক্ত গরম থাকায় বিদ্যুত যাওয়ার কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। ভোরের এই সময়টা লোডশেডিং না করাই উচিত।

ছোটবনগ্রাম এলাকার আরেক ব্যবসায়ী শাহীদ হোসেন শিশির বলেন, শনিবার সকাল ৮টায় কারেন্ট গেছে। এসেছে দুপুর ১টায়। ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে এই গরমে কারেন্টবিহীন থাকা খুব কষ্টকর। এসব দেখার কেউ নেই। যার যা ইচ্ছে, তাই করছে। কিছু বলার নেই। এ নিয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী নেসকো পিএলসি বিভাগীয় অফিসের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ বলেন, বিদ্যুতের মেইনটেন্সের কাজ চলছে। কাজ চলমান থাকায় কিছুটা লোডশেডিং হচ্ছে। কাজ শেষ হলে সমস্যা আর থাকবে না।

অতিরিক্ত গরম নিয়ে নগরবাসী বলছেন, অতীতে রাজশাহীতে এতটা গরম অনুভূত হতো না। গরমের মৌসুমে গরম থাকবে, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু কয়েক বছর ধরে নদীর পাড়ের এই শহরে যে পরিমাণ গরম অনুভূত হচ্ছে এর জন্য একটি মহল অবশ্যই দায়ী। নানা অজুহাতে শহরের অনেক গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। রাতের আঁধারে পুকুরগুলো ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে বহুতল ভবন। পদ্মানদীতে পানি থাকে না। এক সময়ের খরস্রোতা এই নদী এখন পুরোটাই চর। চরের উত্তপ্ত বালির তাপ পুরোটাই এসে পড়ে শহরে। যার কারণেই গরম আগের থেকে অনেক বেশি অনুভূত হয়। নদীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে কেউ উদ্যোগ নেয় না। পুকুর ভরাট বন্ধেও যথাযথ কার্যক্রম নেই। গাছ কাটা রোধেও সবাই উদাসীন। এভাবে চলতে থাকলে অবশ্যই রাজশাহী শহর আগামীতে মরুকরণের কবলে পড়বে। এর জন্য যারাই দায়ী হোক, এর রেশ ভোগ করতে হবে পুরো নগরবাসীকেই।

রাজশাহী আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার বিকেল ৩টায় রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল শনিবার বিকাল ৩টায় রাজশাহীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে বৃহস্পতিবার রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলতি মৌসুমে ৩৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এটিই রাজশাহীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। কয়েক দিন ধরেই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করছে রাজশাহীতে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, চলমান তাপপ্রবাহ আরও কয়েক দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

সোনালী/জেআর