ঢাকা | এপ্রিল ১৬, ২০২৪ - ১২:৪২ পূর্বাহ্ন

রনি নাদিম সিন্ডিকেটে জিম্মি পবা সাব রেজিস্ট্রি অফিস

  • আপডেট: Sunday, March 31, 2024 - 12:00 am

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিস যেন দুর্নীতি ও অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সেবাপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের কাছে অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়ছেন সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ।

তাদের অভিযোগ, জেলা ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অসাধু কিছু কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ মদদেই এই সিন্ডিকেটের উত্থান। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মাঠে দৃশ্যমান হয়ে যারা এই সিন্ডিকেট সামলাচ্ছেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী অফিসে তাদের কোন নিয়োগ নেই। মৌখিকভাবে নিয়াগ পাওয়ার সুবাদে তাদের ছোট-খাটো কাজ করার কথা থাকলেও নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও যেন তাদের কাছে ধরাসায়ী!

ফলে শক্ত এই সিন্ডিকেটের কাছে পরাজিত হয়ে অনেক সময় তাদের নানা অনৈতিক দাবি মেনে নিতে বাধ্য হতে হয় সেবাপ্রত্যাশীদের। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করেও কোন সুরহা মেলেনি।

সরেজমিন পবা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দেখা গেছে, অফিসের চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করছেন রনি নামের এক ব্যক্তি। দেখে মনে হতে পারে তিনি রেজিস্ট্রি অফিসের বিশেষ কোন কর্মকর্তা।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মায়ের রান্না করে দেয়ার বদৌলতে সাব রেজিস্ট্রি অফিসে উঠাবসা শুরু করেন রনি। তিনি সেবাপ্রত্যাশীদের কাছে নিজেকে অফিস স্টাফ বা পেশকার পরিচয় দিয়ে থাকেন। কিন্তু অফিস সূত্র নিশ্চিত করেছে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রনির নিয়ম মাফিক লিখিত কোন নিয়োগ নেই। নিয়োগ না থাকলেও অফিসের চেয়ার-টেবিলে বসে তিনি কর্মকর্তাদের মতো কাজ করেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মূলত স্বঘোষিত পেশকার এই রনিকেই কেন্দ্র করেই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গড়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। তার সঙ্গে সহযোগী হিসেবে কাজ করেন আরও দু’জন। তাদের এক জনের নাম মামুন ও অপরজনের নাম নাদিম। নকলনবীশ নাদিম রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মচারী হলেও মামুন আর রনি ওই অফিসের কাগজ কলমে কেউ না।

তবে অভিযোগ আছে, তাদের কাছেই রয়েছে অফিসের পুরো নিয়ন্ত্রণ। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের নানা হিসাব-নিকাশ, সরকারি পে-অর্ডারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথির কাজ করেন তারা।

শুধু তাই নয়, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের প্রধান ঘরের চাবিও থাকে তাদের কাছে। অফিসে এসব তারা প্রকাশ্যেই করে থাকেন। নিয়মের বাইরে এসব কর্মকাণ্ডের বিষয়ে রেজিস্ট্রি অফিসের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা অবগত থাকলেও কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।

একাধিক সেবাপ্রত্যাশী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পবা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল সংক্রান্ত সেবা নিতে এলে সবার আগে রনির নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের মুখোমুখি হতে হয়। তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শেষেই যেতে হয় পরবর্তী ধাপে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, আগে রেজিস্ট্রি করতে প্রতি দলিলে এক হাজার টাকা করে ঘুষ নেয়া হতো।

তবে সম্প্রতি গোদাগাড়ী থেকে পবায় খণ্ডকালীন দায়িত্বে আসা সাব রেজিস্ট্রারের নাম ভাঙিয়ে অতিরিক্ত আরও দুই শ টাকা বেশি ঘুষ দাবি করছে রনি সিন্ডিকেট। যারা এই আগের এক হাজার ও পরের দুই শ টাকা দিতে রাজি হচ্ছেন, শুধুমাত্র তাদের জমিই রেজিস্ট্রি হচ্ছে। আর যারা এই অনৈতিক চাওয়া পূরণ করছেন না, নানা অজুহাতে তাদের দলিল আটকে হয়রানি করা হচ্ছে। অনেক সময় রনির সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা সাধারণ দলিল লেখকরাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন।

শুধু তাই নয়, রনির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তার কাছে অফিসের প্রধান ঘরের চাবি থাকায় অনেক গোপন তথ্য সে নিজ বাড়িতেও নিয়ে যায়। নানা সময়ে সেগুলো পুঁজি করে রনি অবৈধ ফায়দা হাসিল করেন। মূল ঘরের চাবি থাকায় দলিলের যে কোন সংযোজন-বিয়োজন করার সুযোগ থাকে তার। ফলে একে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছেন দলিল কেন্দ্রীক শক্ত ব্যবসা।

এর আগে অফিসের গোপন তথ্য ফাঁসের কারণে রিটু ও সেলিম নামের পেশকারকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। এই কাজের জন্য তারা বরখাস্ত হলেও একই কাজের দায়ে রনি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। সবমিলে রনি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম ও অফিসের দায়িত্বরত কর্মকর্তদের নিরবতায় পুরোপুরি অসহায় হড়ে পড়েছেন সেবাপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষ।

এদিকে রনির এমন কর্মকাণ্ড রেজেস্ট্রি অফিসকে শুধু অনিয়মের আখড়ায় পরিণত করেছে তাই নয়, তার মতো অলিখিত কর্মচারীর কাছে প্রধান ঘরের চাবি থাকায় সাব রেজিস্ট্রি অফিসের নিরাপত্তা ও মানুষের তথ্যের সঠিক সংরক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি এই অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও নথি বেহাত হওয়ার আশংকাও তৈরি হয়েছে। ওই অফিসে এমন একটি ঘটনা আগেও ঘটেছে।

২০১৩ সালে নৈশ প্রহরি পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান কবিরুল নামের এক ব্যক্তি। সেও রনি মতো অফিস নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। পরে টাকার বিনিময়ে অফিসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথিসমূহ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে সরবারহ করে তিনি চাকরি থেকে বরখাস্ত হন।

পবা সাব রেজিস্ট্রার অফিসে সেবা নিতে আসা কয়েকজন জানান, রনি, মামুন, নাদিম, নাসরিন এরাই রেজিস্ট্রি অফিসের হর্তাকর্তা। বণ্টননামা, নকল উত্তোলন, দলিল রেজিস্ট্রি করতে এলে তাদের ম্যানেজ না করলে কাজ হয় না। এটি নিয়মে পরিণত হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে রেজিস্ট্রি অফিসের কয়েকজন বলেন, নিয়োগহীন একজন অল্প বয়সের ছেলেকে অফিস কি কারণে চাবি দিয়ে রাখেন, তা আমাদের বোধগম্য নয়। বড় কোনো ক্ষতি হলে এর দায়ভার কে নিবে? শোনা যাচ্ছে ইতোমধ্যে দলিল লুকিয়ে রেখে হয়রানিসহ বালাম বইয়ের রেকর্ড পাচার করছেন তিনি।

এ নিয়ে জানতে চাইলে পবা সাব রেজিস্ট্রি অফিসের সিন্ডিকেট প্রধান রনি বলেন, ‘আমি মাস্টাররোলে অফিস সহায়ক হিসেবে আছি।’ লিখিত নিয়োগ না থাকার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘সাব রেজিস্টার স্যাররা ভালোবেসে আমাকে মৌখিকভাবে রেখেছেন।’ তবে অন্যান্য অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

এ বিষয়ে পবা সাব রেজিস্টার সাদেকুর রহমান বলেন, ‘আমি খণ্ডকালীন দায়িত্বে আছি।’ রনির নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে কর্মরত। এগুলো মৌখিক নিয়োগ হয়।’ মৌখিক নিয়োগের একজন ব্যক্তি কীভাবে অফিসের চেয়ার টেবিল বসে? এছাড়াও তার কাছে অফিসের চাবির বিষয়ে জানতে চাইলে এসব তিনি জানেন না বলে জানান।

এ বিষয়ে জানতে জেলা রেজিস্টার সফিকুল ইসলামকে (অতিরিক্ত দায়িত্বে) ফোন দিলেও তিনি রিসিভি করেননি। তার মোবাইলে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোন সাড়া দেননি।