ঢাকা | এপ্রিল ১৯, ২০২৪ - ২:৫৬ পূর্বাহ্ন

চাঁদাবাজিতে বিপর্যস্ত সড়ক পরিবহন

  • আপডেট: Saturday, March 30, 2024 - 11:18 am

অনলাইন ডেস্ক: দেশব্যাপী পৌরসভার চাঁদাবাজিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সড়ক পরিবহন খাত। সড়ক-মহাসড়কে বিদ্যমান টার্মিনাল ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাঁদা আদায়ের পাশাপাশি সারা দেশের পৌরসভাগুলো যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহন থেকে বেপরোয়া হারে চাঁদা আদায় করছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইজারাদার নিয়োগ করে সড়কে টোল আদায়ের নামে চাঁদা তুলছে পৌরসভাগুলো। এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বারণ করা চিঠিও কোনো কাজে আসছে না। পরিবহন খাতের উদ্যোক্তা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পৌর টোলের তাণ্ডবে তারা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। জবরদস্তিমূলক এ চাঁদার কারণে তাদের পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। যার প্রভাব পড়ছে যাত্রী ও পণ্যের ওপর।

দেশের স্থানীয় প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ একক হচ্ছে পৌরসভা। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর, গাজীপুর এবং ময়মনসিংহ মহানগরগুলোর ১২টি সিটি করপোরেশন ছাড়া ৩৩১টি পৌরসভা রয়েছে। অধিকাংশ পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনগুলো স্থানীয়ভাবে তাদের অধ্যুষিত সড়কপথে চলাচলকারী যানবাহন থেকে নিজেদের নির্ধারিত হারে টোল আদায় করে পরিবহন খাতে সংকট তৈরি করছে।

টার্মিনাল ছাড়া সড়ক ও মহাসড়কে টোল আদায়ে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অধিকাংশ পৌরসভা এ নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করছে না। পৌরসভার মেয়রদের উদ্দেশে ইতিপূর্বে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, হাই কোর্ট বিভাগে দায়েরকৃত রিট পিটিশন নং-৪৬৪০/২০২২ এর গত ২১ এপ্রিলের আদেশের আলোকে টার্মিনাল ছাড়া কোনো সড়ক বা মহাসড়ক থেকে টোল উত্তোলন না করার জন্য সব সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভার মেয়রদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিজ্ঞপ্তি জারি করার জন্য সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ওই নির্দেশনা প্রতিপালনের জন্য পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মেয়রদের অনুরোধ জানায়। কিন্তু উচ্চ আদালত ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা টোলের নামে চাঁদা তুলছে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো।

ফেনীর সোনাগাজীতে সড়কের কয়েকটি স্থানে আদায় করা হচ্ছে পৌর টোল। পৌর শহরের জিরো পয়েন্ট ও বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন স্থানে পরিবহন বাস, ট্রাক, পিকআপ ও ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক থেকে নির্ধারিত হারে পৌর টোল আদায় করা হয়। সোনাগাজী পৌরসভার জিরো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে চলাচলরত যাত্রীবাহী বাস থেকে পৌর টোল আদায়কারী এক কর্মী বলেন, টোল আদায় বন্ধ করার জন্য ইজারাদার ও পৌরসভা থেকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। আমি দৈনিক ৬৫০ টাকা বেতনে ইজারাদারের চাকরি করছি। তাই ইজারাদারের নির্দেশে টোল আদায় করছি।

অভিযোগ রয়েছে, ভোলার বিভিন্ন পৌর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই টোলের নামে বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ যানবাহন চালকরা। পৌর এলাকায় প্রবেশ করলেই পৌর টোলের নামে চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন যানবাহন চালকরা। যানবাহনের প্রকারভেদে আদায় করা হচ্ছে বিভিন্ন অঙ্কের চাঁদা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পণ্য পরিবহন শ্রমিক জানান, চরফ্যাশন ও লালমোহন পৌরসভার ইজারাদাররা পৌর টোলের নামে জোরপূর্বক চাঁদা নিচ্ছে।

বরিশাল থেকে পণ্য নিয়ে আসা ট্রাকচালক মো. কবির হোসেন বলেন, আমি ট্রাক আনলোড করার জন্য চরফ্যাশন বাজারে এলে ফরেস্ট অফিসের সামনে দুই ব্যক্তি আমাকে গাড়ি দাঁড় করানোর জন্য সিগন্যাল দেয়। গাড়ি দাঁড় করালে তারা আমার কাছে পৌরসভার টোলের জন্য ৫৫০ টাকা দাবি করে, টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা প্রথমে গালিগালাজ ও পরে আমাকে মারধর করে।

দৌলতখান পৌর মেয়র মো. জাকির হোসেন তালুকদার, লালমোহন পৌর মেয়র মো. এমদাদুল ইসলাম তুহিন ও চরফ্যাশন পৌর মেয়র মো. মোরশেদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, টার্মিনালের বাইরে কোনো প্রকার টোল আদায় করা যাবে না বলে মৌখিকভাবে ইজারদারদের বলা হয়েছে। তবে পৌর শহরের মধ্যে বেশ কয়েকটি টমটম ও থ্রি-হুইলার মাহেন্দ্রা স্ট্যান্ড রয়েছে। সেগুলো আমরা পৌরসভা থেকে স্বীকৃতি দিয়েছি। ওই সব স্ট্যান্ড থেকে পৌরসভার টোল আদায় করা হচ্ছে।

পাবনার ঈশ্বরদীতে পৌরসভার টোল আদায়ের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। মহাসড়কের পাশে রঙ্গিন ছাতা ও কাঠের বেঞ্চ নিয়ে একটু আড়ালে দলবদ্ধভাবে চাঁদার রসিদ নিয়ে বসে থাকে স্থানীয় যুবকরা। রসিদ দিয়ে চালক ও তার সহকারীর কাছ থেকে টোলের নামে আদায় করা হচ্ছে টাকা। চাঁদা দিতে না চাইলে চালকদের সঙ্গে আদায়কারীর ঝগড়াবিবাদ লেগে থাকে। দীর্ঘ সময় গাড়ি আটকে রাখার ঘটনাও ঘটছে। এভাবেই প্রকাশ্যে পৌরসভার টোল আদায়ের নামে চাঁদাবাজি চলছে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার ঈশ্বরদী-পাবনা মহাসড়কের আলহাজ মোড়সহ কয়েকটি এলাকায়।

সূত্র জানায়, ঈশ্বরদী শহরের বকুলের মোড়, চাঁদআলীর মোড়, রেলগেট, ভেলুপাড়া মোড়সহ পাঁচটি স্থানে ইজারাদারের প্রায় ১৫ জন চাঁদা আদায় করছেন। মালবাহী ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ড ভ্যান, নসিমন, বাস, মিনিবাস থেকে ৫০ টাকা, অবৈধ ইঞ্জিনচালিত ভটভটি থেকে ২০ টাকা করে আদায় হয়। প্রতিদিন প্রায় ৪ শতাধিক যানবাহন থেকে চাঁদা তোলা হয়। বছরে প্রায় কোটি টাকার বেশি আদায় হয় এসব স্পটে। রাতে উল্লেখিত মূল্যের থেকে বেশি পরিমাণে, অনেক সময় রসিদ ছাড়াই চাঁদা দিতে হয় বলে অভিযোগ চালকদের।

ইজারাদারের কর্মী পরিচয় দিয়ে টোল আদায়কারীরা বলেন, পৌরসভার অনুমতিক্রমে ইজারার মাধ্যমে টাকা তোলা হয়। প্রতি বছরই পৌরসভাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে টোল আদায়ের ইজারা নেওয়া হচ্ছে।

পৌরসভার মেয়র ইসহাক আলী মালিথা বলেন, পৌরসভা থেকে ডাক হয়ে পৌর এলাকার ভিতরে মালামাল আনলোডের সময় টোল আদায় হয়। তবে সিএনজি বা অটো থেকে আদায় করা হয় না জানিয়ে তিনি আরও বলেন, নসিমন, করিমন, ভটভটি এগুলো থেকে আদায় হয়। এক বছরের জন্য ইজারা দিয়ে পৌরফান্ডে টাকা পাই। পৌরসভার উন্নয়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে টোল আদায় হচ্ছে। ইজারার মাধ্যমে এটি সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে আদায় হচ্ছে।

পৌরসভা বিধানের ৯৮ ধারার ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে শুধু পৌরসভা নির্মিত টার্মিনাল ছাড়া পার্কিং ফির নামে টোল আদায় সম্পূর্ণ অবৈধ। অথচ ট্রাক টার্মিনাল না থাকলেও সড়কের ওপর থেকে বছরের পর বছর ধরে পৌর উন্নয়নের নামে টোল আদায়ের রসিদ দিয়ে সারা দেশে চাঁদাবাজি চলছে।

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে পৌর টোলের নামে পরিবহন খাতে অতিরিক্তি চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ইজারাদারদের বিরুদ্ধে। এতে অতিষ্ঠ পরিবহন মালিক শ্রমিকরা। ড্রাইভারকে মারধর ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। পৌরসভা, স্থানীয় পরিবহন মালিক ও শ্রমিকের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, রামগঞ্জে দেড় হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ১৫০টি যাত্রীবাহী বাস, ২ শতাধিক মালবাহী ট্রাক, পিআপ ও কাভার্ড ভ্যান, ২০০ মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকার রয়েছে। এসব পরিবহন থেকে ইজারাদারদের নিয়োজিত একদল সক্রিয় চাঁদাবাজ পৌরসভার লোগো সংবলিত রসিদ, টোকেন ব্যবহার করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে দৈনিক ৩০ টাকা, যাত্রীবাহী বাস থেকে ১১০ থেকে ২১০ টাকা, মালবাহী ট্রাক, পিকআপ ভ্যান ও কাভার্ড ভ্যান থেকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, মাইক্রোবাস থেকে মাসিক ৫০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করে আসছে। এভাবে বছরে অতিরিক্ত ৩ কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করছে তারা। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রামগঞ্জ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনের সড়কে চাঁদা আদায় কালে একজন ড্রাইভার অতিরিক্ত চাঁদা দিতে না চাইলে রামগঞ্জ বাজার ইজারাদারের নিয়োজিত চাঁদা আদায়কারীরা ড্রাইভারকে মারধর ও গাড়ি ভাঙচুর করে। ২৭ ফেব্রুয়ারি পৌরসভার বাজার পরিদর্শক আবদুর রহিম চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে মো. বাবলু, মো. শাওন ও মো. মিলনের নামে থানায় মামলা করেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশ বাবলুকে গ্রেফতার করে। কয়েকজন চালক জানান, এখনো প্রতিদিন তাদের কাছ থেকে পৌরসভার টোল নেওয়া হয়।

রামগঞ্জ পৌরসভা মেয়র আবুল খায়ের পাটোয়ারী বলেন, অতিরিক্ত টোল আদায়ের অভিযোগ পেয়ে ইজারাদারদের সতর্ক করে দিয়েছি। একজন ইজারাদারের তিনজন চাঁদা আদায়কারীর বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে। কোনো ইজারাদার নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত চাঁদা নিলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ছাড়া রাজশাহীর বিভিন্ন পৌরসভা, বরগুনার আমতলী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল, ফরিদপুরসহ দেশের অধিকাংশ পৌরসভা ইজারাদার নিয়োগ করে পৌর টোলের নামে চাঁদা তুলছে। বরিশাল-পটুয়াখালী-আমতলী-কুয়াকাটা সড়কে চলা বাস মায়ের দোয়া পরিবহনের মালিক মো. আক্কাস বলেন, আমাদের প্রতিটি গাড়ি থেকে ৫০ টাকা করে পৌর টোল আদায় করা হয়। রুটে যতগুলো বাস চলাচল করে সবার কাছ থেকেই টোল আদায় করছে আমতলী পৌরসভার টোল আদায়কারীরা। ঢাকা-কুয়াকাটা রুটের সাকুরা পরিবহনের আমতলী কাউন্টারের এক কর্মী বলেন, এ রুটে চলে এমন প্রতিটি বাস থেকে আমতলী পৌরসভা টোল আদায় করছে। আমরা উচ্চ আদালতের নির্দেশনার কথা বললেও তারা শুনছে না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মসিউর রহমান রাঙ্গা গত রাতে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় পৌরসভার টোলের নামে চাঁদা তোলা হচ্ছে। এ জবরদস্তিমূলক চাঁদা আদায় বেআইনি। টার্মিনাল ছাড়া সড়কের কোনো জায়গা থেকে চাঁদা তোলা যাবে না। এ ব্যাপারে আমরা প্রশাসনকে বলেছি। তারা চাঁদা আদায়ের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

 

সোনালী/ সা