ঢাকা | এপ্রিল ১৫, ২০২৪ - ৫:৪৭ পূর্বাহ্ন

বৈরি আবহাওয়ায় চাঁপাইয়ের অধিকাংশ গাছেই মুকুল নেই 

  • আপডেট: Tuesday, March 5, 2024 - 10:22 pm

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যুরো: ভরা মৌসুমে মুকুলে মুকুলে শোভিত থাকার কথা থাকলেও বৈরি আবহাওয়ার (জলবায়ু পরিবর্তনে এবার বিলম্বিত শীত) কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অধিকাংশ গাছেই মুকুল নেই।

গত বছর এসময় আমবাগানগুলো মুকুলে মুকুলে ছেয়ে সোনা রং ধারণ করলেও এবার চিত্র ভিন্ন। এমন অবস্থায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বাগান মালিক ও আমচাষিরা। আশঙ্কা চলতি বছরে আমের ভালো ফলন না হওয়ার। আর কৃষি বিভাগ বলছে, উপযুক্ত সেচ ও স্প্রেসহ অন্যান্য প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে এখনো কিছু গাছে মুকুল আসতে পারে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে ৩৭ হাজার ৬০৪ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হচ্ছে। যা গত বছর ছিল ৩৭ হাজার ৫৮৮ হেক্টর জমিতে। চলতি বছর আমগাছের সংখ্যা ৭৫ লাখ ৭৯ হাজার ৮২৫টি। আর চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ৪০-৪৫ শতাংশ গাছে এসেছে নতুন মুকুল। কৃষি বিভাগ, এবছর এখনো আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেনি।

সরেজমিনে জেলার শিবগঞ্জ, ভোলাহাট, গোমস্তাপুর, নাচোল ও সদর উপজেলার বিভিন্ন আমবাগান ঘুরে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসের তিন সপ্তাহ পর্যন্ত আমবাগানগুলোতে তেমন মুকুলের দেখা নেই। তবে, তুলনামূলকভাবে গত দুই সপ্তাহে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু বাগানে অর্ধেকের কম গাছে মুকুলের দেখা মিলেছে।

আর কৃষি বিভাগের পরামর্শে কাঙ্খিত মুকুলের দেখা পেতে আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা বাগানগুলোতে স্প্রে ও সেচ দেয়া নিয়ে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। যদিও বারি-৪, বারি-১১, কাটিমন, ব্যানানাসহ বিভিন্ন হাইব্রিড জাতের বাগানগুলোতে আগাম ভরপুর মুকুলের দেখা পাওয়া গেছে।

ভোলাহাট উপজেলার আমচাষি একরামূল হক বলেন, মুকুল পেতে এখন আমরা বাগানে স্প্রে ও সেচ দিচ্ছি। আর কৃষি বিভাগ বলছেন, সঠিক নিয়মে ও উপযুক্ত সেচ ও স্প্রেসহ অন্যান্য প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে এখনো গাছে মুকুল আসতে পারে।

কানসাটের আমচাষি রবিউল ইসলাম জানান, বাগান থাকলেই গাছের পরিচর্যা করতে হবে। গাছের যত্ন না নিলে ভালো ফলনও আশা করা যায় না।

এদিকে, ফের সার, কীটনাশকের দাম বাড়েছে। পরিচর্যা খরচ বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে চিন্তা হচ্ছে। খরচ করে যদি আমের নায্য দাম না পাই, তাহলে খরচ করায় বৃথা হয়ে যাবে।

আমচাষি ও আম ব্যবসায়ী ফরিদ উদ্দিন বলেন, গত ১০ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আমের বাগানে মুকুল পুরাপুরি দেখা দেয়নি। যা আমাদেরকে অনেকটা হতাশ করেছে।

শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রোডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন শামীম খান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ বছর আমবাগানে কাঙ্খিত মুকুল আসেনি। তাই খুব চিন্তিত আছি। তার ওপর এ বছরে বালাইনাশকের দাম কয়েক বছরের মধ্যে অনেক বেশি হওয়ায় খরচ অনেক বেশি হচ্ছে। পণ্যের দাম বাড়ার সাথে সাথে শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। ফলে অনেক টাকা লগ্নি করে কাঙ্খিত ফল না পেলে আবারো ক্ষতিগ্রস্ত হবো।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক বলেন, সার-কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি সব কিছুরই মূল্য বাড়ছে। যার কারণে চাষিদের পরিচর্যা খরচ বাড়ছে। চাষিদের প্রণোদনার ব্যবস্থা করলে কিছুটা হলেও; তারা স্বস্তি পাবে। তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে এবার দেরীতে তীব্র শীত এবং বিলম্বিত শীতের কারণে বাগানে মুকুলের দেখা নেয়, তাই আগামীতে জলবায়ুর প্রভাবে মুকুলের বিপর্যয়ের বিষষয়টি গবেষকদের ভাবতে হবে।

গবেষকরা বলছেন, যেহেতু এখনো সময় আছে; সেহেতু কৃষি অফিসারদের সাথে পরামর্শ করে সঠিকভাবে সেচ ও বালাই নাশক স্প্রে করতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই মুকুল আসবে। আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব (আম গবেষণা কেন্দ্রের) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোখলেসুর রহমান বলেন, আমগাছে পর্যাপ্ত মুকুল আসেনি বলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই।

এ বছর শীত ও ঠান্ডা বেশি হওয়ায় মুকুল আসতে কিছুটা দেরী হচ্ছে। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে গাছগুলোতে মুকুলের পরিমাণ বাড়বে। তবে, বড় গাছগুলোতে তেমন মুকুল না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত বছর যেহেতু শতভাগ মুকুল হয়েছিল সেহেতু এবার তুলনামুলক মুকুল কিছুটা কম হবে। এছাড়া যেসব আম গাছে আর এক সপ্তাহ পর নতুন পাতা গজাবে।সেগুলোতে মুকুল কম আসবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. পলাশ সরকার জানান, গত বছর যেহেতু বেশি পরিমাণে মুকুল এসেছিল; সেহেতু এবার মুকুল কম আসতে পারে। তাছাড়া বিলম্বিত শীতের কিছুটা প্রভাবতো পড়েছেই। তবে, জেলার প্রায় সব আমবাগানেই কমবেশি মুকুল আসতে শুরু করেছে। আমরা আশাবাদী শেষ পর্যন্ত দেরিতে হলেও; মুকুল আসবে।

তবে, কৃষি পণ্যের দাম বাড়ার বিষয়টি স্বীকার করে উপ-পরিচালক আরও বলেন, কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে আমচাষ করলে বালাইনাশকের ব্যবহার কিছুটা কমানো যাবে। এতে করে কৃষকদের আমের পরিচর্যা খরচ কিছুটা সাশ্রয় হবে।

এদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশব্যাপী আমের উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে নায্যমূল্য পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না, বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে আমভিত্তিক কলকারখানা এবং আম থেকে বিকল্প পণ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরনের পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের দাবি জানিয়েছেন আম সংগঠনের নেতারা।

সোনালী/জেআর