ঢাকা | জুলাই ১৭, ২০২৪ - ৮:১৭ অপরাহ্ন

রাবিতে জন্ডিসের ‘হটস্পট’, প্রশাসনের উদ্যোগ নেই

  • আপডেট: Tuesday, February 6, 2024 - 9:00 pm

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হঠাৎ জন্ডিসের প্রকোপ বেড়েছে। গত তিন সপ্তাহে ৩২৪ জন শিক্ষার্থী জন্ডিস পরীক্ষা করেছেন। এদের মধ্যে অন্তঃত ১৩১ শিক্ষার্থীর দেহে জন্ডিস ধরা পড়েছে। যা মোট পরীক্ষার ৪০ শতাংশের বেশি।

আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসের দোকানগুলোতে সুপেয়পানির অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার পরিবেশনের কারণে এমনটা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা। এদিকে জন্ডিসের প্রকোপ বৃদ্ধি পেলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসের দোকানগুলোতে একদিন মনিটরিং ছাড়া কার্যত কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার পরিবেশন নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, দোকানি ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একদিন ক্যাম্পেইন করা হয়েছে। তাছাড়া ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোতে যেন সাবমারসিবল পাম্পের পানি পরিবেশন করা হয় সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছি। যদি কেউ সাপ্লাইয়ের পানি সরবরাহ করে সেক্ষেত্রে তাকে জরিমানা করা হবে। পুরো ক্যাম্পাসে সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিতে চারটি সাবমারসিবল পাম্প বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এছাড়া ক্যাম্পাস জুড়ে আজ থেকে জন্ডিস বিষয়ে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রের তথ্য অনুয়ায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে হঠাৎ জন্ডিসে আক্রান্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত মাসের ১৫ তারিখ থেকে জন্ডিসে আক্রান্ত শিক্ষার্থী ও অসুস্থ হয়ে জন্ডিস পরীক্ষা করা রোগীর সংখ্যা লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। গত ২১ দিনে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত জন্ডিস পরীক্ষা করেছেন ৩২৪ শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে ১৩১ জন শিক্ষার্থীর দেহে জন্ডিস শনাক্ত হয়েছে। এ হিসেবে গড়ে প্রতিদিন ৬ জন শিক্ষার্থী এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসক মো. তবিবুর রহমান বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে জন্ডিসের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। মূলত অস্বাস্থ্যকর পানি ও খাবারের কারণে জন্ডিস দেখা দেয়। হেপাটাইসিস ‘এ’ ভাইরাসে আক্রান্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি। অস্বাস্থ্যকর পানি ও খাবার খাওয়ার কারণেই শিক্ষার্থীরা এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে মনে করেন এই চিকিৎসক।

এ রোগ প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে উপ-প্রধান চিকিৎসক ফ ম আ জাহিদ বলেন, পানি ও খাবারের মাধ্যমে হেপাটাইসিস ‘এ’ রোগ ছড়ায়। শিক্ষার্থীরা এই ভাইরাসেই আক্রান্ত হচ্ছেন। এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে লিভার সংক্রমণ। এ রোগের কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। প্রতিরোধ করার নির্ভরযোগ্য উপায় টিকা প্রদান। আক্রান্ত রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রাম ও প্রচুর পানি খেতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন খাবার ও সুপেয় পানি পান করলেই এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

ক্যাম্পাসে পানি ও খাবারের পরিবেশ সকালে ও দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই ক্যাম্পাসের ভ্রাম্যমাণ দোকানে খাওয়া-দাওয়া করেন। ক্যাম্পাসের টুকিটাকি চত্বর, সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী ভবন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবন, ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া একাডেমিক ভবন, বাসষ্টান্ড সংলগ্ন দোকানগুলোতে অস্বাস্থ্যকর খাবার ও পানি সরবারহ করা হয় বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। সাপ্লাইয়ের পানি দ্বারা খাবার রান্নাও করা হয়। দোকানগুলোতে অপরিষ্কার পানির ট্যাঙ্কে খাবার পানি রাখা হয় এবং খোলা অবস্থায় খাবার পরিবেশন করা হয়ে থাকে।

শিক্ষার্থীরা যা বলছেন

এদিকে জন্ডিসের প্রকোপ বাড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে জন্ডিস পরীক্ষা করছেন। সম্প্রতি জন্ডিসে আক্রান্ত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মো. শামিম উদ্দিন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কাজলা এলাকার একটি মেসে থাকেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসে অধিক সময় থাকার কারণে প্রতিনিয়ত বাইরেই খাওয়া হয়। খাবারের দোকানগুলোতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পানি ও খাবার পরিবেশন করা হয়। চিকিৎসক জানিয়েছেন এসব খাবার খেয়েই এ রোগে আক্রান্ত হয়েছি। এ রোগ থেকে রক্ষা পেতে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও পানি পান করতে বলেছেন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী কেয়া মনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা খাবার এবং পানি নিয়ে অভিযোগ করলেও প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। কয়েক সপ্তাহ ধরে হঠাৎ করে জন্ডিসের প্রকোপ বৃদ্ধি পেলেও কর্তৃপক্ষ নিরব। পরিচিতদের অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছে। কেউ কেউ বাড়ি চলে গেছে। এই পরিস্থিতিতে খুবই আতঙ্ক কাজ করছে। অনতিবিলম্বে একটি মেডিকেল টিম গঠন করে ক্যাম্পাসের দোকানগুলোর খাবার এবং পানির মান যাচাই করার জন্য দাবি জানান তিনি।

প্রশাসনের উদ্যোগ নেই

ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মাঝে জন্ডিসের প্রকোপ বৃদ্ধি পেলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ক্যাম্পাসের ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোতে পানি ও খাবার পরিবেশন করা হলেও এগুলো নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে না। নামে মাত্র একদিন ক্যাম্পাসে মনিটরিং করা হয়েছে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য সুলতান-উল-ইসলাম দাবি করেন, এক সপ্তাহ আগে তিনি ক্যাম্পাসের দোকানগুলো মনিটরিং করেছেন। পুরাতন পানির ট্যাঙ্কগুলো পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাবার পরিবেশন করতে বলেছেন। কেন শিক্ষার্থীরা এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, এ রোগের প্রতিকার ও করণীয় সম্পর্কে ইতোমধ্যে একটি সচেতনতামূলক লিফলেট তৈরি করা হয়েছে। আজ বুধবার থেকে ক্যাম্পাসের সর্বত্র এটি প্রচার করা হবে। হলগুলোতেও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও পানি পরিবেশন করার জন্য হল প্রাধ্যক্ষদের বলা হয়েছে।

সোনালী/জেআর