ঢাকা | ফেব্রুয়ারী ২৯, ২০২৪ - ৯:৩২ পূর্বাহ্ন

নৌকার পক্ষে অভূতপূর্ব জোয়ার, বিজয়ের প্রস্তুতি

  • আপডেট: Saturday, January 6, 2024 - 6:00 pm

অনলাইন ডেস্ক: টানা চতুর্থ মেয়াদে বিজয়ের লক্ষ্য নিয়ে সর্বাত্মক নির্বাচনী প্রস্তুতি গুছিয়ে এনেছে আওয়ামী লীগ। বহুল আলোচিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আরেক দফা ক্ষমতায় আসার বিষয়েও বেশ আশাবাদী দলটি। সারাদেশের কোটি কোটি নেতাকর্মী-সমর্থকেরও দৃঢ় বিশ্বাস, এক দিন পরই আবারও বিজয়ের কেতন ওড়াবে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দেশের প্রাচীনতম এ রাজনৈতিক দলটি। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। নির্বাচনী প্রচার শেষ হওয়ার পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নৌকার পক্ষে সারাদেশে অভূতপূর্ব গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

নেতারা বলছেন, বিএনপিবিহীন এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে এক ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছে, এটা ঠিক। বিশেষ করে রাজপথের বিরোধী দলগুলোর ‘নির্বাচন বর্জন’ আন্দোলনকে ঘিরে ২০১৪ সালের মতো ভয়াবহ অগ্নিসন্ত্রাস ও জ্বালাও-পোড়াওয়ের শঙ্কা রয়েছে। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার বেশ কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের মাধ্যমে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। এরপরও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোপরি নির্বাচন কমিশনের কঠোর অবস্থানে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবেু এমনটাই মনে করা হচ্ছে। বিদেশি দুটি নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলকেও গতকাল এমন আশ্বাস দিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারক নেতারা।

আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে এই প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল বেশ আগে থেকেই। ভেতরে ভেতরে প্রার্থী বাছাই, লক্ষাধিক পোলিং এজেন্ট প্রশিক্ষণসহ প্রাথমিক প্রস্তুতিও চলছিল। বিএনপি ও তার মিত্রদের প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পরে এক দফা ও সরকার পতন, সর্বশেষ ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন আন্দোলন মোকাবিলা করেই এই প্রস্তুতি সফলভাবে এগিয়েও গেছে। গত ১৫ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর থেকেই আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিকতাও শুরু হয়। নভেম্বর পর্যন্ত চলে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও জমাদান, সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে প্রার্থিতা চূড়ান্তকরণের কাজ। ডিসেম্বরের প্রথমার্ধ থেকে ১৪ দল শরিক ও জাতীয় পার্টি এবং অপরাপর নির্বাচনী মিত্র দলগুলোর সঙ্গে আসন বণ্টন ও সমঝোতার বৈঠক শুরু করে শেষ হয়েছে ১৭ ডিসেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত।

প্রতীক বরাদ্দের পর ১৮ ডিসেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণায় নেমেছিলেন সারাদেশের আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও তাদের সমর্থক নেতাকর্মীরা। জমজমাট প্রচার-প্রচারণায় এরই মধ্যে সারাদেশে নির্বাচনকে ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ এবং মানুষের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার সূচনা ঘটেছে বলেও দাবি আওয়ামী লীগের। দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০ ডিসেম্বর সিলেট থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন এবং ৪ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের জনসভার মধ্য দিয়ে শেষ করেন। এই সময়ের মধ্যে ১০টিরও বেশি জেলার নির্বাচনী জনসভায় সরাসরি এবং ২৩টি জেলা-উপজেলার নির্বাচনী জনসভায় ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা।

এরই মধ্যে ২৭ ডিসেম্বর ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ে তোলাসহ ১১টি বিষয়ে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে দলের নির্বাচনী ইশতেহারও ঘোষণাও করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। সর্বশেষ ৪ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে দেওয়া নির্বাচনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নৌকায় ভোট দিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো তাঁর দলকে ক্ষমতায় এনে জনগণের সেবার করার সুযোগ করে দিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন।

এবারের নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রয়েছেন ২৬৪ জন। ১৪ দল শরিকদের নিয়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়ছেন ২৭২ জন। আসন সমঝোতার মাধ্যমে ২৬টি আসনে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দিয়েছে টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতাসীন থাকা এ দলটি। এর আগে ২৬ নভেম্বর দুটি আসন বাদে ২৯৮টি আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ। এরপর ১৪ দল শরিক ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে আসন সমঝোতার মাধ্যমে ৩২টি আসন থেকে দলীয় প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেয় তারা। তবে দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপিসহ নানা কারণে পাঁচটি আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিলের পর আপিল করে তিনজন ফেরত পান। দুইজনের প্রার্থিতা শেষ পর্যন্ত বাতিলই রয়ে গেছে।

এদিকে,বিএনপি ও তার মিত্রদের এবারের নির্বাচন বর্জনের মুখে ভোটের মাঠ অনেকটাই আওয়ামী লীগের অনুকূলে। অবশ্য সারাদেশের শতাধিক আসনে দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তাদের জয়ের পথে কাঁটা হয়েও দাঁড়িয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে মনোনয়নবঞ্চিত একাদশ জাতীয় সংসদের ৭২ জন এমপির মধ্যে ১৯ জন রয়েছেন। এবারের বিএনপিবিহীন নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করাসহ ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা মেনে ১০১ জন মনোনয়নবঞ্চিত নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। পরে প্রার্থিতা বাতিল কিংবা প্রার্থী হওয়ার পরও ভোটের মাঠ থেকে ‘সরে দাঁড়ানোর’ ঘোষণার পর এখনও ৯০টির মতো আসনে দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়ে গেছেন। এসব আসনে নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে সংঘাত-সহিংসতায় নির্বাচন ঘিরে বেশ উত্তাপও ছড়িয়েছে।

২৭টি দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হলেও প্রধান প্রধান বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে আগামীকালের নির্বাচনী মাঠে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোও আওয়ামী লীগের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি উত্তরণে নানা পদক্ষেপও নিয়েছে দলটি। সারাদেশের প্রার্থী ও নেতাকর্মীর মাধ্যমে দেশের মানুষকে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটদানে সচেতন ও উৎসাহিত করা হয়েছে। ‘রোড টু স্মার্ট বাংলাদেশ’ কর্মসূচির আওতায় সারাদেশের ৭৮টি জেলা ইউনিটের ছয় লাখ নেতাকর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাদের সবাইকে কমপক্ষে ২০০ জন করে ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্য ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে প্রশিক্ষিত এক লাখ পোলিং এজেন্টকেও দেওয়া হয়েছে বিশেষ নির্দেশনা।

সব মিলিয়ে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার প্রস্তুতিও শেষ করেছে আওয়ামী লীগ। এর মধ্য দিয়ে দেশ-বিদেশে আগামী নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করে তোলার উদ্যোগও রয়েছে দলটির মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দলটির নীতিনির্ধারক নেতারা এরই মধ্যে ঘোষণাও দিয়েছেন, ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ইতিহাসে ‘মাইলফলক হয়ে থাকবে।

নৌকার পক্ষে অভূতপূর্ব জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে

নির্বাচন সামনে রেখে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ ভবনে দলের মিডিয়া সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে ভোটের দিন পর্যন্ত দলের প্রেস ব্রিফিংসহ অন্যান্য কার্যক্রম চলবে। গতকাল এই মিডিয়া সেন্টারে প্রেস ব্রিফিং করে নির্বাচন বিষয়ে দলের সর্বশেষ অবস্থান ও প্রস্তুতি তুলে ধরেছে আওয়ামী লীগ। এতে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের কাছে নির্বাচন হলো উৎসব, গণতন্ত্রের উৎসব। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বরং তীব্র শীত উপেক্ষা করে জনগণ নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়ে প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিয়েছে। নৌকার পক্ষে সারাদেশে অভূতপূর্ব গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, এরই মধ্যে অনেক বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক এসেছেন। তা দেখে আমরা উৎসাহিত। তারা একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করবেন।

আমরা আশা করব অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং এর সঠিক চিত্র তারা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবেন। নির্বাচনে মানুষ নির্ভয়ে ভোট দেবে জানিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ৭ জানুয়ারি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া হবে। সবাই ভোটকেন্দ্রে আসবে। ভোট দিতে কেউ বাধা দিলে তাদের প্রতিহত করা হবে। নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করে বিএনপির আন্দোলনের নামে সহিংসতার সমালোচনার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি প্রয়োগ না হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন ওবায়দুল কাদের।

দুই প্রতিনিধি দলকেও সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস
এর আগে তেজগাঁওয়ের ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল এবং সোনারগাঁও হোটেলে কমনওয়েলথ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন আওয়ামী লীগ নেতারা। দুই বৈঠকেই ৭ জানুয়ারির নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করা নিয়ে আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তারা। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে বৈঠকে অংশ নেন শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল আলম চৌধুরী নওফেল, আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, অর্থবিষয়ক সম্পাদক ওয়াসিকা আয়সা সিদ্দিকা, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ, উপদপ্তর সম্পাদক সায়েম খান, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আরাফাত, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শতবর্ষ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী প্রমুখ। বৈঠকে ১৫ সদস্যের কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের নেতৃত্ব দেন টিম লিডার জ্যামাইকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী অরিত্রি ব্রুস গোল্ডিং এবং ওআইসির পক্ষে নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির সেক্রেটারি জেনারেল ফর পলিটিক্যালের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ইউসুফ মোহাম্মদ আল দুবাই।

সোনালী/জেআর