ঢাকা | এপ্রিল ১৫, ২০২৪ - ১০:৩১ অপরাহ্ন

রাজশাহীতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যা বাড়ার কারণ কি

  • আপডেট: Friday, May 26, 2023 - 7:19 pm

অনলাইন ডেস্ক: বুলবুল আহমেদের স্বপ্ন ছিল বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সরকারি চাকরিতে ঢুকবেন। সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনে চিন্তামুক্ত করবেন পেশায় রাজমিস্ত্রি বাবাকে। রাজশাহী কলেজ থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করা বুলবুলকে নিয়েও স্বপ্ন বুনছিল পরিবার।

তবে গত শনিবার আকাশ ভেঙে পড়ে পরিবারের মাথায়। ভোরবেলা বাড়ির পাশের মসজিদের ভেতরে পাওয়া যায় বুলবুলের ঝুলন্ত দেহ। এর এক দিন আগেই বিসিএস পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। রাতে বাবা-মাকে নিয়ে একসঙ্গে খাবার খান। এর কয়েক ঘণ্টা পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

বুলবুল আহমেদের বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর ইউনিয়নের পূর্ব নয়াপাড়া গ্রামে। তাঁর বাবা সাহেব আলীসহ এলাকাবাসীর ধারণা, বিসিএস পরীক্ষা হয়তো ভালো হয়নি। সে জন্য আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বুলবুল।

বুলবুলের মতো বেশ কিছু তরুণ গত কয়েক বছরে আত্মহত্যা করেছেন, যাঁরা রাজশাহীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছিলেন বা পড়ালেখা মাত্র শেষ করেছেন। এর মধ্যে কেবল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৩ সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী গত সাত বছরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) দুই শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন চলতি মাসে। নগরীর অন্য উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্তত ৪ শিক্ষার্থী গত দুই বছরে আত্মহত্যা করেছেন।

বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। তাঁরা বলছেন, আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীর বড় একটি অংশের মধ্যে ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক হতাশা লক্ষ্য করা গেছে। করোনা মহামারির সময় দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় হতাশার মাত্রা অনেক বেড়েছে।

রুয়েট শিক্ষার্থী সামিউর রহমান গত ২০ মে ছাত্রাবাসে নিজ কক্ষে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এর তিন দিন আগে রুয়েটের লেফটেন্যান্ট সেলিম হলের নিজ কক্ষে তানভীর ফাহাদ রুমি নামে আরেক ছাত্র গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। রুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘তারা হতাশায় ভুগত; শুনেছি। তবে হতাশার মূল কারণ জানা যায়নি।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছয় শিক্ষার্থী গত বছর আত্মহত্যা করেন। পরিসংখ্যান বলছে, গত সাত বছরের মধ্যে এই সংখ্যা সর্বোচ্চ। এর আগের বছর করোনা মহামারির সময় অন্তত তিনজন আত্মহত্যা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, করোনার সময় দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা বেড়েছে। এতে অনেকের মধ্যে তৈরি হয়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা।

সর্ম্পক বিচ্ছেদের হতাশা থেকে গত বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখে আত্মহত্যা করেন রাবির বাংলা বিভাগের সাবেক ছাত্র ইশতিয়াক মাহমুদ পাঠান। একই বছরের ৮ এপ্রিল ‘জীবনের কাছে হার মেনে গেলাম। আমি আর পারলাম না’– ফেসবুকে এমন স্ট্যাটাস দিয়ে গলায় গামছা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন চারুকলা অনুষদের ছাত্র সোহাগ খন্দকার।

এর কিছুদিন পর নাট্যকলা বিভাগের ছাত্রী জান্নাতুল মাওয়া দিশার লাশ উদ্ধার করা হয় রাজধানীর আদাবরে স্বামীর বাসা থেকে। মানসিক অশান্তি ও হতাশার কারণে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে দাবি করা হচ্ছে।

গত বছরের ১০ মে ‘চোরাবালির মতো ডিপ্রেশন, মুক্তির পথ নেই, গ্রাস করে নিচ্ছে জীবন, মেনে নিতে পারছি না’– এমন সুইসাইড নোট লিখে ময়মনসিংহের নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া তাবাসসুম।

২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বিয়ের ৩ মাসের মাথায় স্বামীর বাসায় গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন রাবির অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছন্দা রায়। এর পর ২০ ডিসেম্বর হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মৃত্যুঞ্জয়ী সেন ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগে আত্মহত্যা করেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক ও মনোবিদ অধ্যাপক আনোয়ারুল হাসান সুফি বলেন, ‘আমাদের কাছে প্রায় প্রতিদিন মানসিক সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীরা আসছে। হতাশা ও উদ্বেগে ভোগা রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। শিক্ষার্থীরা ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক দুশ্চিন্তায় বেশি ভুগছে। করোনা মহামারি-পরবর্তী সেশনজট, পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল করতে না পারা, প্রত্যাশার মতো সরকারি চাকরি নিয়ে দুশ্চিন্তায় তারা জীবনের মায়া ত্যাগ করছে।’

অধ্যাপক আনোয়ারুল হাসান বলেন. ‘শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে– সবাই সরকারি চাকরি পাবে না। যতজন সনদধারী গ্র্যাজুয়েট বের হয়, তার তুলনায় খুবই কম সরকারি চাকরি আছে। এটা বোঝাতে হবে তাদেরকে।’

দুশ্চিন্তাগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা নিঃসঙ্গ থাকলে হতাশা বাড়তে পারে। সে জন্য কাছের মানুষদের সবসময় তাকে ভরসা দিতে হবে।’

রাজশাহীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সব জায়গায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। রাজশাহীতে বাড়ার কারণ হিসেবে আমার ব্যক্তিগত মত, এখানে আর্থিক সোর্স কম।

অন্য শহরের তুলনায় রাজশাহীতে টিউশনি, পার্ট টাইম চাকরিও কম। আবার এখানে শিক্ষার্থীও বেশি। ফলে আর্থিক সংকটের কারণে দুশ্চিন্তায় থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা বাড়তে পারে। আবার স্থানীয়ভাবে রাজশাহীতে কর্মক্ষেত্র না থাকায় এখানে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভবিষ্যতে চাকরি পাওয়া নিয়েও কিছুটা হতাশা কাজ করে।’

পারিবারিক চাপ, সেই সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক খারাপের কারণেও অনেকের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হয় জানিয়ে তিনি বলেন, এখন সামাজিক মাধ্যমগুলোও শিক্ষার্থীদের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা দিতে একটি মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। এই কেন্দ্রের কো-অর্ডিনেটর মেহেদী হাসান জানান, ২০১৭ সালের আগস্টে কার্যক্রম শুরুর পর এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘করোনা মহামারি শেষে ক্যাম্পাস খোলার পর ২০২২ সালেই আমরা ৬৮৭ জনকে চিকিৎসা দিয়েছি। তাদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যার উচ্চ ঝুঁকিতে ছিল। আত্মহত্যার চেষ্টা করা কয়েকজন চিকিৎসা নিয়ে স্বাভাবিকও হয়েছেন। চলতি বছরে এই পাঁচ মাসে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী চিকিৎসা নিতে এসেছে। এর মধ্যে অধিকাংশের আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে।’

মেহেদী হাসান বলেন, ‘এখানে যারা আসে তাদের মধ্যে ৪১টি সমস্যা পেয়েছি। অধিকাংশেরই ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা, আর্থিক এবং সম্পর্কের সমস্যা। অনেকেই ভাবে, অন্যরা বড় কিছু হয়ে যাচ্ছে, অথচ আমি পারলাম না! অথবা একজন ভালো সাবজেক্টে পড়ছে, আমি তুলনামূলক কম ভালো সাবজেক্টে পড়ছি। পড়া শেষ করে কী করব; পরিবারের হাল কীভাবে ধরব– নানা বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থীরা হতাশাগ্রস্ত হচ্ছে।’ সমকাল

সোনালী/জেআর