ঢাকা | এপ্রিল ১৯, ২০২৪ - ১:১১ পূর্বাহ্ন

রাজনীতির বিরোধ যখন পরিবারে পৌঁছে যায়

  • আপডেট: Thursday, May 11, 2023 - 3:00 am

মোহাম্মদ গোলাম নবী

পশ্চিমবঙ্গ থেকে নির্বাচিত বিজেপি সংসদ সদস্য সৌমিত্র খাঁ এবং তাঁর স্ত্রী ও বর্তমানে তৃণমূল নেত্রী সুজাতা মণ্ডলের ‘রাজনৈতিক বিরোধ’ কীভাবে পরিবারে ভাঙন ধরিয়েছে, সেই কেচ্ছা সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকাতেও মাঝেমধ্যে এসে থাকে। এখানকার বিভিন্ন সুপরিচিত পরিবারেও অতটা না হলেও সাধারণ পরিবারগুলোতে রাজনৈতিক বিরোধ কম নেই। এমনকি দাম্পত্য কলহেরও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর রাজনীতির কারণে পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ তো প্রায় পুরোনো বিষয়।

প্রায় দুই যুগ আগে এক পরিবারের দাম্পত্য কলহ মেটাতে গিয়ে প্রথমবারের মতো জানতে পেরেছিলাম, ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য এবং দলীয় সমর্থনের পছন্দ-অপছন্দ থেকেও বিরোধ তৈরি হতে পারে। যে দম্পতির দাম্পত্য কলহ মেটাতে গিয়েছিলাম, তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রেম করেই বিয়ে করেছিলেন। আলোচনা থেকে বুঝতে পেরেছিলাম, তখন প্রেমই বড় ছিল। বিয়ের পর ধীরে ধীরে বিভিন্ন অমিলের বিষয় সামনে আসতে থাকে এবং সেই অমিল থেকে এক সময় পরস্পরের রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিন্নতার বিষয়ই বড় হয়ে ওঠে। এমনকি সন্তানের চেয়েও রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য বড় হয়ে যায়।

ঘটনাটি মনে রয়ে গিয়েছিল। এর পর গত দুই যুগে আমি যখনই কোনো দাম্পত্য কলহ বা বিয়ে বিচ্ছেদের কথা শুনেছি; কৌতূহলী মন জানতে উৎসাহিত করেছে– স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে রাজনীতি নিয়ে বিরোধ ছিল কিনা। একাধিক বিচ্ছেদের ঘটনায় স্বামী-স্ত্রীর ভিন্ন রাজনীতি ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের বিষয়টি অন্যতম কারণ হিসেবে জানতে পেরেছি। কিছুদিন আগে একজন তাঁর বিয়ে বিচ্ছেদের কথা বলতে গিয়ে বললেন, তাঁর সাবেক স্বামী ও সন্তানের বাবা অত্যন্ত ভালোমানুষ। কিন্তু শুধু তাঁর ও তাঁর পরিবারের রাজনৈতিক বিশ্বাস ভিন্ন হওয়ায় তিনি আর সংসার করতে পারলেন না। কারণ, তিনি স্ত্রী ও মা হলেও তাঁর নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তাঁকে স্বামীর সঙ্গে সংসার চালিয়ে নিতে দেয়নি। কারণ, তাঁর স্বামীও নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে বের হতে রাজি ছিলেন না।

আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজ রাজনৈতিকভাবে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি– এ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ার বিষয়টি এখন প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে যথেষ্ট আলোচনাও হয়। অনেকেই বিষয়টি থেকে নানা অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

গত বছর আমার কয়েকজন স্কুলবন্ধুকে দাওয়াত দিয়েছিলাম। যাদের মধ্যে দু’জন বিএনপি নেতা, অন্য দু’জন আওয়ামী লীগের নেতা। দু’পক্ষই আমার দাওয়াতে আসার ব্যাপারে অন্যদের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি তুলেছিল। তবে আওয়ামী লীগ নেতাদের আপত্তিটা বেশি ছিল। তাদের যুক্তি– ছোট শহর; এখানে বিএনপি নেতাদের নিয়ে একসঙ্গে দাওয়াত খেতে এলে বিষয়টি নিয়ে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। আমি তাদের যুক্তি প্রথমে মানতে না চাইলেও দীর্ঘ আলোচনার পর মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম।

পরে ভেবে দেখেছি, আসলেই তো। এই সমাজ ও দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এতটাই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে; এত বেশি স্বার্থ দিয়ে চালিত হচ্ছে– সুবিধাবাদী মানুষ যারা সত্যকে মিথ্যা কিংবা মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে নিজেদের এগিয়ে নিতে চায় কিংবা অন্যকে হেনস্তা করতে চায়, তারা এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

প্রশ্ন হলো, আইনত বিয়ে করে চার দেয়ালের মধ্যে সংসার শুরু করা স্বামী-স্ত্রীর জীবনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জামায়াতে ইসলামী বা অন্য কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতি আকর্ষণ কীভাবে স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে দেয়াল তুলে দেয়? তাদের তো বটেই, এমনকি তাদের ভালোবাসার ফসল সন্তানকে পর্যন্ত ছেড়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করে? রাজনীতি মানুষের জীবনকে কতটা গ্রাস করলে এমনটা হতে পারে!

যাঁরা মানুষের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেন, তাঁদের এখন বিয়ে বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে রাজনৈতিক মতবিরোধের বিস্তার আমাদের সমাজে কতটা ঘটেছে, সেটা জানা দরকার। এতদিন বাংলাদেশে বিয়ে বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে তাঁরা যেসব কারণের কথা বলে আসছেন, সেসবের সঙ্গে এখন রাজনৈতিক মতভিন্নতার বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। স্বামী বা স্ত্রীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এক সময় ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের অবস্থান বাধা না হলেও এখন তা হচ্ছে।

বর্তমানে সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদন জমা দেওয়ার সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বাড়লেও সেখানে কারণ হিসেবে রাজনৈতিক বিরোধের কথা কেউ লিখেছে– সেটা বলা যাবে না। এমনকি দুই যুগ আগের যে দম্পতির কথা লেখার শুরুতে বলেছি, তারাও যখন শেষ পর্যন্ত বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদন করেছিল, সেখানে তাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠা নিত্যদিন রাজনৈতিক বিশ্বাসের মতবিরোধকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেনি। তাই বলে এই কারণটা মিথ্যা নয়। আর সাম্প্রতিক সময়ের যে উদাহরণটি দিলাম, সেই পরিবারও তাদের বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদনে নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের প্রয়োজনে বিচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেনি। কিন্তু উভয় ঘটনার ক্ষেত্রে তাদের বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতজন জানেন কারণগুলো কী।

তাই রাজনীতির বিরোধ, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিরোধ যে সংসার পর্যন্ত পৌঁছে গেছে এবং বিয়ে বিচ্ছেদের কারণ হচ্ছে, তার মাত্রাগত গভীরতা সমাজে কতটুকু এবং এ নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কিনা কিংবা হচ্ছে কিনা এবং মোট বিয়ে বিচ্ছেদের কত শতাংশের ক্ষেত্রে এটি একমাত্র কারণ না হলেও অন্যতম, সে বিষয়ে সমাজ নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন এমন সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কাজ করার কথা ভাবতে পারেন। কারণ, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে বিভক্ত হয়ে পড়া সমাজ কাঠামোতে যদি পরিবার পর্যন্ত এর বিস্তার ঘটে, তাহলে সেটা চূড়ান্তভাবে সমাজের অগ্রগতিতে নেতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

যে কোনো রাষ্ট্র তথা সমাজের কল্যাণের প্রধানতম শর্ত হলো, অন্তর্ভুক্তি ও বৈচিত্র্যকে ধারণ করা; বিভাজন নয়। সংসারের ক্ষেত্রে যেমনটা বলা হয়– বোঝাপড়া, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও বিশ্বাস সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য প্রধান শর্ত।

মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন