ঢাকা | এপ্রিল ২০, ২০২৪ - ২:৫৩ পূর্বাহ্ন

‘বাম্পার ফলন’ এবং হাওরের হাসি-কান্না

  • আপডেট: Friday, May 5, 2023 - 4:06 am

দেশের হাওরাঞ্চলে হাসি-কান্না যে হাত ধরাধরি করে চলে, এর প্রধান উপলক্ষ বোরো ধানের মৌসুম। বর্তমান নিবন্ধে থাকবে মূলত চলতি বোরো মৌসুমের ধান কাটা পর্ব এবং এর পরিণতি নিয়ে। প্রসংগত জানান দেওয়া দরকার, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির কল্যাণে সুবিধাগ্রস্ত অঞ্চলে ধান চাষ যেমন সহজ এবং প্রকৃতির খেয়ালখুশির ওপর তেমন নির্ভরশীল নয়; পক্ষান্তরে অনুন্নত ও অসুবিধাগ্রস্ত অঞ্চল হাওরে ধান চাষ ততটাই কঠিন এবং প্রকৃতিনির্ভর। এখানে মাত্র একটা ধান হয়, অ-কৃষি কর্মকাণ্ড, যা দারিদ্র্য দূরীকরণে ভূমিকা রাখে–নাই বললেও চলে। হাওরের জলাশয়গুলো মানুষরূপী ‘হাঙর’ দখল করে থাকে বিধায় মাছ ধরে জীবিকা অর্জনের সহজ পথটিও আজ রুদ্ধ।

দুই.

অধিকাংশ হাওর উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের সাতটি জেলায় অবস্থিত– সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার এবং ব্রাহ্মণবাড়িয় এবং ছোট-বড় মিলিয়ে এদের সংখ্যা চারশর মতো হবে। বিশেষ প্রতিবেশ ব্যবস্থার কারণে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে এখানকার শস্য-বিন্যাস, জীবন-জীবিকা এমনকি সংস্কৃতি ভিন্নতর। হাওর হচ্ছে সবচেয়ে অনুন্নত অঞ্চলের অন্যতম। ‘দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র’ এর জলজ্যান্ত উদাহরণ। এখানে দারিদ্র্যের হার অনেক বেশি, যার প্রধান কারণ ঝুঁকিপূর্ণ কৃষি, অনুন্নত ভৌত অবকাঠামো এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা।

আমরা জানি, দেশের প্রধান ফসল ধানের প্রধান মৌসুম বোরো। এই মৌসুমে উৎপাদিত ধানের বড় একটি অংশ, কেউ কেউ বলেন এক-পঞ্চমাংশ, আসে আবার হাওর অঞ্চল থেকে। কিন্তু এই অঞ্চলের বোরো ধানই আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের দিক থেকে সবচেয়ে নাজুক। যেমন অন্যত্র বোরো ধান উৎপাদন বেশ নিরাপদ নিয়ন্ত্রিত পানির জন্য। কিন্তু হাওরে আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টি এবং খরা বিশেষত ব্রি ধান ২৮, ২৯ জাতের বোরো উৎপাদনে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে আঘাত হানে।

বাংলাদেশের মোট ধানের আনুমানিক ৬০ ভাগ আসে বোরো মৌসুমে এবং বোরো চাষ করে মার খেলে চাষি আমন বা আউশ দিয়ে কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে পারে। কিন্তু হাওরের ব্যাপারটা সম্পূর্ণভাবে ব্যতিক্রম– হয় বোরো না হয় মরো। এখানে বর্ষা মৌসুমে বুকের ওপর পানি থাকে ৭০ শতাংশ জমিতে, আর বুক পর্যন্ত ৩০ শতাংশে। বসতভিটা ছাড়া সব জমি পানির নিচে থাকে ৫-৬ মাস। এমন প্রতিকূল পরিবেশ হাছন রাজার সুনামগঞ্জ শহর থেকে উত্তরে শাহ আব্দুল করিমের দিরাই এবং আরও উত্তরে রাধারমণের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলাসহ সাতটি জেলার হাওরাঞ্চল। সাধে কি উকিল মুন্সির লেখা গান বারী সিদ্দিকীর কণ্ঠে– ‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানিরে/ পুবালি বাতাসে/ বাদাম দ্যাইখ্যা চাইয়্যা থাকি/ আমার নি কেউ আসেরে…’।

তিন.

ভৌগোলিক কারণে হাওরাঞ্চলের প্রায় তিনদিকে ঘেরা পাহাড়ি অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত কিংবা বন্যা হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে হাওরে চলে আসে পানি। কখনও-সখনও আচমকা বন্যায় (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) হাওরাঞ্চল আক্রান্ত হয় বিশেষত এপ্রিল-মে মাসে। জুন-জুলাই বা সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে যে মৌসুমী বন্যা দেশের বিভিন্ন নদী অববাহিকায় দেখা দেয়, সেটা হাওরাঞ্চলের ফসলের জন্য ততটা ক্ষতিকর নয়। কারণ তখন মাঠে ধান থাকে না। এপ্রিল-মে মাসে কৃষকের ক্ষেতে যখন পাকা-আধপাকা ধান থাকে, সেই সময়ের আচমকা বন্যাই সবচেয়ে ক্ষতিকর। ওই ধরনের বন্যা প্রলয়ঙ্করী নয়; কিন্তু ক্ষেতের বোরো ধানের সর্বনাশ ঘটিয়ে দেয়। ২০১৯ সালে এমন এক চকিত বন্যায় হাওরাঞ্চলের কৃষক সর্বস্বান্ত হয়েছিল। উদ্বিগ্ন সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছিল বিধায় বাঁচোয়া। নয়তো অবর্ণনীয় খাদ্য সংকটের আশঙ্কা ছিল।

আগাম বন্যা হলে স্বাভাবিকভাবেই হাওরে হাহাকার পড়ে যায়। এই বন্যা প্রতিরোধ করার জন্য যে বাঁধ নির্মাণ করা হয়, তাও দুর্নীতির দুর্বিপাক হিসেবে কৃষকের ঘাড়ে সওয়ার হয়। বাংলাদেশে মোট খাদ্য উৎপাদনে হাওরাঞ্চল থেকে আসে ২০-২৫ লাখ টন, যা আমাদের মোট চাল আমদানির সমান। সুতরাং, সাধারণ হিসেবে হাওরের ধান আমাদের খাদ্যে স্বয়ম্ভরতার সহায়ক হিসেবে দাঁড়ায়। এক হিসাবে দেখানো হয়েছে, হাওর আছে এমন জেলাগুলোতে প্রায় ১৩ লাখ হেক্টর চাষ করা জমির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পড়েছে হাওরে এবং চার-পঞ্চমাংশ চাষের জমি বোরোর আওতায়। এখানে উৎপাদিত মোট ধানের বাজারমূল্য প্রায় ৪০০০ কোটি টাকা। এ কাজে পুরুষের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে নারী।

আশার কথা, এ বছর এপ্রিল মাস ভালোয় ভালোয় কেটেছে। মে মাসেরও প্রথম সপ্তাহ চলছে, এখনও আচমকা বন্যার পদধ্বনি শোনা যায়নি। কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, হাওরাঞ্চলে এবারের মৌসুমের বোরো ধানের ৯০ ভাগ ইতোমধ্যে কাটা হয়ে গেছে (সমকাল, ১ মে ২০২৩)। কৃষিমন্ত্রীই ঈদের আগে একদিন ফসল কাটা উৎসবের উদ্বোধন করে প্রত্যাশা রেখেছিলেন, যদি প্রকৃতি বাকি সময়টাতে বিরূপ না থাকে তা হলে হাওরাঞ্চলে এবার ‘বাম্পান ফলন’ হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। সমকালের প্রতিবেদনটিতেই কৃষিমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘চলমান ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৯ লাখ ৭৬ হেক্টর। আর আবাদ হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে। এ বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ২ কোটি ১৫ লাখ টন চাল। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১০ লাখ টন বেশি চাল উৎপাদন হতে পারে’।

চার.

বাম্পার ফলন কৃষকের জন্য আশীর্বাদ, না অভিশাপ– এ নিয়ে অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ে বেশ সুন্দর আলোচনা আছে। অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী, অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে বাম্পার ফলন কৃষকের জন্য কালও হতে পারে। অতিরিক্ত উৎপাদন সীমিত চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বাজারে দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ সৃষ্টি করলে পণ্যটির দাম পড়ে যায় এবং দেখা যায় অধিকাংশ সময় কৃষক উৎপাদন খরচও তুলে আনতে পারে না। এই অর্থে উৎপাদন কম হওয়া মানে পণ্যটির দাম বৃদ্ধি এবং কৃষকের লাভ।

সুতরাং, হাওরাঞ্চলের বাম্পার ফলন কৃষকের জন্য আশীর্বাদ, না অভিশাপ– নির্ভর করবে সরকারের সংগ্রহনীতি এবং আড়তদার, মিল মালিক, চালের বাজারে ক্রিয়াশীল সিন্ডিকেট ইত্যাদিতে কঠোর সরকারি নজরদারির ওপর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমনকি বাংলাদেশেও কৃষক তার বাম্পার ফলনের পণ্য রাস্তায় ঢেলে দেয়; বাজার দখলে রাখে কিছু সিন্ডিকেট এবং সরকার সময়মতো কৃষকের পাশে দাঁড়াতে পারে না।

আশা করি, বর্তমান ‘কৃষিবান্ধব’ সরকারের সময় এমনটি হবে না। তখনই সফল হবে কৃষকের শ্রম; আনন্দে ভাসবে হাওর। হাসি-কান্নার হাওরে হাসির হিস্যা যেন বেশি থাকে, সে জন্য সরকারের বিশেষ দৃষ্টি দাবি করে ওই অঞ্চলটি।

অধ্যাপক আব্দুল বায়েস: অর্থনীতিবিদ; সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়