ঢাকা | এপ্রিল ১৬, ২০২৪ - ১২:৪৭ পূর্বাহ্ন

মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ

  • আপডেট: Saturday, April 29, 2023 - 12:00 am

অনলাইন ডেস্ক: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক গতকাল শুক্রবার বিকেলে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী এলাকা বাসনে গিয়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লা খানের পক্ষে কর্মিসভায় অংশ নিয়েছেন। বাসন থানার চান্দনা চৌরাস্তায় সাগর সৈকত কনভেনশন সেন্টারে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের আয়োজনে এই কর্মিসভায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী প্রধান অতিথি ছিলেন।

এ সভায় নৌকার প্রার্থী আজমত উল্লা খান ছাড়াও বক্তব্য দেন সংরক্ষিত আসনের এমপি শামসুন্নাহার ভূঁইয়া, ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউল্লাহ মণ্ডল প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আওয়ামী লীগের কর্মিসভায় বক্তব্যের ফলে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।

নির্বাচনী আইন অনুযায়ী সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তি নির্বাচন কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না। মন্ত্রী অনুষ্ঠানে নিজেই বলেছেন, এই কর্মিসভায় নির্বাচনী আলোচনা হয়েছে। তবে আপনারা জানেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনী যে আচরণবিধি রয়েছে, সে অনুসারে ১০ মের আগে এই প্রচারণা শুরু করা যায় না। আমি যেহেতু সংসদ সদস্য, তাই এই নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে পারব না। আমি সারা জীবন আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

এদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের ‘আমাকে গুম, গ্রেপ্তার অথবা মেরে ফেলা হতে পারে’– এমন বক্তব্য নিয়ে তোলপাড় চলছে। এ নিয়ে তুমুল আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে।

অন্যদিকে, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় বরখাস্ত হওয়া মেয়র জাহাঙ্গীর আলম কঠোর সাংগঠনিক শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন বলে দলের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন। এবার তাঁকে স্থায়ীভাবে দল থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে।

বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘হয়তো কালকের পর আমার পায়ে শিকল পরাতে পারে। অ্যারেস্ট করতে পারে। গুমও করতে পারে।’ গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আলোচিত চরিত্র জাহাঙ্গীরের এমন বক্তব্য গোটা মহানগরজুড়ে এখন আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

তবে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজমত উল্লা খান গতকাল শুক্রবার রাতে বলেছেন, ‘জাহাঙ্গীর সব সময়ই নাটক করে থাকেন। নাটক সাজানোর জন্যই জাহাঙ্গীর বলেছেন, তাঁকে গুম করা হবে। আওয়ামী লীগ ২০১৩ সালে আমাকে মনোনয়ন দেওয়ার পর জাহাঙ্গীর গোপনে হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে চার দিন অবস্থান করেন। এদিকে রটানো হয়, জাহাঙ্গীরকে গুম করা হয়েছে। কে তাকে গুম করবে? সরকার? স্টান্টবাজি করার জন্যই তাঁর এই নাটক। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অনুরোধ করব, জাহাঙ্গীরকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হোক।’

এদিকে শুক্রবার মহানগরের চান্দনা চৌরাস্তা কেন্দ্রীয় মসজিদে জুমার নামাজ আদায় শেষে আজমত উল্লা খান মুসল্লিদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি ১৮ বছর টঙ্গী পৌরসভার মেয়র ছিলাম। স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠান চালানোর মতো অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। নির্বাচনে জয়ী হলে আগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নগরবাসীকে সঙ্গে নিয়েই সব উন্নয়ন করব।’ তিনি বলেন, গাজীপুর শহর আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত। বর্জ্য, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নানা সমস্যায় আবর্তিত আজ নগরবাসী। এর মধ্য দিয়েই এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। দল আমার ওপর আস্থা রেখে নৌকা প্রতীক দিয়েছে। যদি জয়লাভ করি তাহলে নগরবাসীকে আধুনিক স্মার্ট নগরী উপহার দেব। মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত নগর গড়ে তুলব।’

অন্যদিকে, মহানগরের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের খাইলকুর এলাকার জান্নাতুল মাওয়া জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেছেন গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। নামাজ শেষে উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। নগরের উন্নয়নের যে ধারা আমি তিন বছর অব্যাহত রেখেছিলাম, সে ধারা ধরে রাখার জন্য আমাকে আপনারা পুনরায় ভোট দিয়ে বিজয়ী করবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে নগরবাসীর উন্নয়নে কাজ শুরু করেছিলাম। তিন বছরের মাথায় অপবাদ তুলে একটি ভুয়া চিঠির মাধ্যমে আমাকে মেয়র পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি সব জায়গায় গিয়েছি সুবিচারের জন্য। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও আদালতে গিয়েছি। আদালত তিনবার সময় নির্ধারণ করেও রায় দেননি। নগরবাসী চেয়েছে, আমি যাতে নির্বাচন করি। সে জন্য আমি প্রার্থী হয়েছি। তারা শুধু একটি প্রতীক চেয়েছে। তাদের কথা মতো আমি একটি প্রতীক তাদের হাতে তুলে দিচ্ছি। বাকিটা নির্ভর করবে তাদের ওপর।

মহানগরের ৫২ নম্বর ওয়ার্ডের মুদাফা এলাকায় একটি কুলখানি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সরকার শাহ নূর ইসলাম রনী। তিনি এ সময় আসন্ন নির্বাচনে নিজের জন্য ভোট প্রার্থনা করেন।

মহানগরের বাসন থানা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের আয়োজনে এক কর্মিসভায় বক্তব্য দেন নৌকার প্রার্থী আজমত উল্লা খান। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। বক্তব্য দেন সংরক্ষিত আসনের এমপি শামসুন্নাহার ভূঁইয়া, ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউল্লাহ মণ্ডল প্রমুখ।

স্থায়ী বহিষ্কার হচ্ছেন জাহাঙ্গীর

আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেছেন, ক্ষমা চেয়ে ও দলীয় শৃঙ্খলা মেনে চলার শর্তে দলের পক্ষ থেকে জাহাঙ্গীর আলমের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছিল। কিন্তু চার মাস যেতে না যেতেই ফের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে আরেক দফা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে না দাঁড়ালে তাঁকে আবারও কঠোর সাংগঠনিক শাস্তির মুখে পড়তে হবে।

আগামী ২৫ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। আগামীকাল রোববার মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে ৮ মে পর্যন্ত মনোনয়ন প্রত্যাহারের সুযোগ আছে। এ সময়ের মধ্যে জাহাঙ্গীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে সরে না দাঁড়ালে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

তবে ভোটের মাঠ থেকে সহজে সরছেন না– এ কথা বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র দাখিল করেই জানিয়ে রেখেছেন জাহাঙ্গীর। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর তিনি বলেছেন, ‘ষড়যন্ত্র করে না সরালে তিনি সরবেন না। আমার স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার কোনো পথ নেই, যদি আমাকে সরিয়ে দেওয়া না হয়। ওপরে আল্লাহ আছেন। নিচে গার্জিয়ানরা আছেন। তাঁরা বুঝবেন।’

ঘরোয়া আলোচনায় বঙ্গবন্ধু ও একাত্তরে শহীদদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠার পর দল ও সিটি করপোরেশনের পদ হারানোর দেড় বছর পর জাহাঙ্গীর ক্ষমা পান গত ১ জানুয়ারি। কিন্তু চার মাস না যেতেই রাজধানী লাগোয়া মহানগরটিতে ২০১৩ সালের নির্বাচনের আমেজ ফিরে এসেছে নির্বাচনে তাঁর অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান বলেছেন, ‘জাহাঙ্গীরের প্রার্থী হওয়া নিয়ে বক্তব্য আমাদের কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হলে দলে আর জায়গা পাবে না, জায়গা হবে না।’
দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘দলের দৃষ্টিভঙ্গি একই রকম আছে। দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হবে না। যখন যেটা প্রয়োজন, দল সেই সিদ্ধান্তই নেবে। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত আর ব্যক্তিগত কথা নিয়ে কথা বলার সময় আরও আছে। এটা নিয়ে কথা বলার সময় এখনও আসেনি।’

সোনালী/জেআর