ঢাকা | জুন ১৬, ২০২৪ - ৫:৩০ অপরাহ্ন

সমানে চলছে পুকুর খনন, ৫ বছরে কমেছে ১১৫১ হেক্টর কৃষিজমি

  • আপডেট: Thursday, January 19, 2023 - 5:04 pm

অনলাইন ডেস্ক: নাটোরের গুরুদাসপুরে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তিন ফসলি কৃষিজমিতে ব্যাপক হারে পুকুর খনন চলছে। ফলে দিনের পর দিন কমে যাচ্ছে কৃষি জমি। গত ৫ বছরে কমেছে এক হাজার ১৫১ হেক্টর ফসলি জমি কমে গেছে। গুরুদাসপুরে এখন পর্যন্ত বেসরকারি হিসাবে প্রায় ১০ হাজার পুকুর রয়েছে।

এছাড়াও সড়ক-মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলছে খনন করা পুকুরের মাটি বহনকারী ট্রাক্টর। কৃষি জমি যেমন কমছে, তেমনি পাকা রাস্তাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত উপজেলাব্যাপী ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার হাড়ি ভাঙ্গা বিল, হাজিরহাট, চাপিলা, বিয়াঘাট, ধারাবারিষা, নাজিরপুর মশিন্দা মাঠসহ প্রায় ১০টি মাঠে এক্সক্যাভেটর মেশিন দিয়ে তিন ফসলি জমিতে পুকুর খনন চলছে। এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে নাটোর সদর, নলডাঙ্গা, সিংড়া, বাগাতিপাড়া ও গুরুদাসপুর উপজেলার নাম উল্লেখ করে কৃষিজমিতে পুকুর খনন বন্ধের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

আদালতের নির্দেশ অমান্য করে প্রতি বছর দুই-তিন ফসলি জমিতে পুকুর করা হলেও এসব বন্ধে প্রশাসন কার্যকর পদক্ষে নিচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয় কৃষকদের। তবে পুকুর খননকারী মাটি ব্যবসায়ীদের দাবি, উপজেলা প্রশাসনের মৌখিক অনুমতি নিয়ে এসব করা হচ্ছে।

উপজেলার মশিন্দা ইউনিয়নের কাছিকাটা মাঠে বৃহস্পতিবার দেখা যায়, মশিন্দা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহাবুব হাসান লাবু তার নিজের ছয় বিঘা জমিতে পুকুর খনন করছেন। একই জায়গায় রুহুল ও রফিক নামের দুই ব্যবসায়ী পাঁচ বিঘা জমিতে পুকুর খনন করছেন। হাজিরহাট এলাকায় মহাসড়কের পাশেই আব্দুল আজিজ ১০ বিঘা জমিতে পুকুর খনন করছেন। এছাড়াও হাড়ি ভাঙ্গা বিলে শাহাদৎ হোসেন রান্টু, সানোয়ার হোসেন, কৃষি জমি নষ্ট করে পুকুর খনন করছেন। চাপিলা ইউনিয়নের ধানুড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশেই খনন করা হচ্ছে পুকুর। ফলে বিদ্যালয়ে শব্দ দূষণসহ ভবিষ্যতে বিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ভবন ধসে পড়ারও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পুকুর খননের ফলে উপজেলাজুড়ে আবাদি জমি কমেছে প্রায় এক হাজার ১৫১ হেক্টর। ২০১৮ সালেও উপজেলাজুড়ে ফসলি জমির পরিমাণ ছিলো ১৫ হাজার ৮১৪ হেক্টর। ২০২২ সালে যেটা দাড়িয়েছে ১৪ হাজার ৬৬৩ হেক্টরে। এছাড়াও চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের এই ১৯ দিনেও প্রায় ২৫০ বিঘা জমিতে পুকুর খনন করা হয়েছে। ২০১৮ সালে কমেছে, ১৩৪ হেক্টর, ২০১৯, ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ মিলে চার বছরে কমেছে এক হাজার ১৭ হেক্টর।

এদিকে উপজেলা মৎস অধিদপ্তর বলছে, গুরুম্নদাসপুর উপজেলাজুড়ে মোট মাছের উৎপাদন ১০ হাজার ৩১৩ টন, যা চাহিদার চেয়ে চার হাজার ৫৪২ টন বেশি। পাঁচ হাজার ৭৭০ টন চাহিদা থাকলেও উদ্বৃত্ত হচ্ছে চার ৫৪২ টন।

হাজিরহাট এলাকার কৃষক নবীর উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের এই মাঠে সারা বছর বিভিন্ন ফসল চাষাবাদ হয়। বিনাহালে রসুনের চাষ এই মাঠ থেকেই আদিকাল থেকে শুরু হয়েছে। কিন্তু দিনের পর দিন এক শ্রেণীর অসাধু ব্যক্তিরা তিন ফসলি জমি নষ্ঠ করে পুকুর খনন করছে। সেই সঙ্গে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাস্তা অবৈধ মাটি বহনকারী ট্রাক্টর দিয়ে নষ্ট করছে। এ বিষয়ে প্রশাসন তেমন নজরদারি করছে না। প্রতিবছর এই মাটি বহনকারী ট্রাক্টরের দুর্ঘটনায় শিকার হয়ে কেউ না কেউ মারা যায় বা গুরুতর আহত হয়।’

বনপাড়া হাটিকুমরুল মহাসড়ক দিয়ে চলাচলকারী বাস ড্রাইভার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা টু রাজশাহী যাতায়াত করি আমরা। গাড়িতে অনেক যাত্রী থাকে। আমাদের গাড়িগুলো হাজিরহাট এলাকায় আসলে পরিচালনা করতে হয় খুব সাবধানে এবং ধীরগতিতে। অনেক সময় হুট হাট করে ব্রেকও ধরতে হয়। মাঠ থেকে মাটি বোঁঝাই ট্রাক্টর হঠাৎ করেই মহাসড়কে উঠে পড়ে। এছাড়াও রাস্তায় অতিরিক্ত মাটি পড়ে থাকার কারণে সামান্য বৃষ্টি বা ভারি কুয়াশা হলেও মহাসড়ক পিচ্ছিল হয়ে থাকে। মহাসড়ক কাঁদা হয়ে থাকলে গাড়ি চালানো খুব বিপজ্জনক হয়ে যায়। নিজের ও যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে।’

প্রশাসনের লিখিত অনুমোদন নিয়ে পুকুর খনন করে মাটি বিক্রি করছেন কিনা জানতে চাইলে পুকুর খননকারী মাটি ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ মুঠোফোনে বলেন, ‘প্রশাসনের লিখিত কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। তাছাড়াও জানেনই তো সব, কিভাবে এগুলোর অনুমোদন হয়।’

মশিন্দা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহাবুব হাসান লাবু বলেন, ‘আমার জমিতে ফসল না ফলার কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ী ময়ছের, শামিম ও রঞ্জুকে চুক্তিবদ্ধভাবে পুকুরটি খনন করার কাজ দিয়েছি। তবে প্রশাসনের কোনো অনুমোতি নেই।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হারুনর রশিদ বলেন, ‘দিনের পর দিন ফসলি জমি নষ্ট করে পুকুর খনন করার কারণে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে। এতে কৃষির ওপর বিরুপ প্রভাব পড়বে।’

এ বিষয়ে গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্রাবণী রায় বলেন, ‘কৃষিজমিতে পুকুর খনন বন্ধে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত আছে।’

সোনালী/জেআর