ঢাকা | মে ২১, ২০২৪ - ৭:৩০ অপরাহ্ন

সিনহা হত্যার দুই বছর: ফাঁসি কার্যকর চান মা-বোনসহ টেকনাফবাসী

  • আপডেট: Sunday, July 31, 2022 - 1:19 pm

অনলাইন ডেস্ক: কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান।

এ ঘটনায় করা হত্যা মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশসহ দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে ছয় আসামিকে। সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স এখন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায়।

সেই হত্যার ২ বছরে এসে মামলায় মৃত্যুদণ্ড দ্রুত কার্যকর চেয়েছেন সিনহার মা বোনসহ টেকনাফবাসী।

নিহত সেনা কর্মকর্তার মা নাসিমা আক্তার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার ছেলে ছিল আমাদের প্রাণের উৎস। যখনই সুযোগ পেয়েছে, মানুষের কল্যাণে এগিয়ে গেছে। যে নরপিশাচরা সিনহাকে হত্যা করে আমার বুক খালি করেছে, তাদের কোনো দিন ক্ষমা করব না। পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে বিচার দিয়ে রেখেছি।

‘প্রত্যাশা একটাই, যারা আমার ছেলেকে হত্যা করে বুক খালি করেছে, সেসব নামধারী নরকের কীটদের যেন দ্রুত ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি আমাদের আস্থা রয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এই বিচারের রায় কার্যকর হবে। এটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে মানুষের জন্য। যেন আর কেউ এভাবে কোনো মায়ের বুক খালি করার দুঃসাহস না পায়।’

মামলার বাদী ও সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস সাংবাদিকদের জানান, উচ্চ আদালতে মামলাটি আপিলে রয়েছে। এ পর্যন্ত মামলা যতটুকু এগিয়েছে, তাতে তারা সন্তুষ্ট। এখন উচ্চ আদালতে দ্রুত শুনানি শেষে বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি আরও জানান, মামলার আসামিদের মধ্যে যারা খালাস পেয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে আপিলের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। দ্রুত শুনানি শেষে ভাইয়ের হত্যার ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছেন শারমিন।

অপরদিকে, সিনহা হত্যা মামলায় পাওয়া মৃত্যুদণ্ড দ্রুত কার্যকর চান টেকনাফে কারণে-অকারণে হত্যার শিকার ২০৪ ব্যক্তির পরিবার। তাদের দাবি ওসি প্রদীপের বদ চিন্তা ও ক্ষমতার অপব্যবহারে শতাধিক শিশু এতিম হয়েছে। বিধবা হয়েছেন দুশতাধিক নারী। কয়েকশ নারী সম্ভ্রমও হারিয়েছেন। বাড়ির পুরুষ সদস্যদের ধরে এনে দিনের পর দিন থানা কম্পাউন্ডে আটকে রেখে স্ত্রী, বোন, মেয়েকে থানায় আসতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এমনও আছে চাহিদা মতো সবকিছু দেওয়ার পরও বাড়ির পুরুষ সদস্যকে বুলেট থেকে বাঁচিয়ে ফেরানো যায়নি। এমন সব পরিবারের সদস্যরা প্রদীপ লিয়াকতের ফাঁসির রায় দ্রুত কার্যকর হতে প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করছেন।

দুই বছরে এসে মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘রায়ের পর বিচারিক আদালতের সব কাগজপত্র উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের পক্ষে হাইকোর্টে দুটি আপিলও করা হয়েছে। খালাসপ্রাপ্তদের ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের কথা ছিল। তা হয়েছে কি না, জানা নেই।

‘স্বাভাবিকভাবে এ ধরনের আপিলের শুনানিতে সময় লাগে। আদালত কখন শুনানি করে, তা দেখার অপেক্ষায় আছি, তবে গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার শুনানি দ্রুত করা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘বিচারিক আদালতের রায় উচ্চ আদালতেও বহাল থাকবে আশা করি। একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার জাতি দেখবে।’

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) ফরিদুল আলম বলেন, ‘খালাসপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের মেয়াদ ৩১ জুলাই শেষ হচ্ছে। আপিলের বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নই, তবে উচ্চ আদালতের কাছে আবেদন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের আপিলের শুনানি দ্রুত করে এর বিচার নিশ্চিত করা হোক।’

টেকনাফ থানার দায়িত্বে থাকাকালে ওসি প্রদীপের চাঁদাবাজি, নারী ধর্ষণ, ক্রসফায়ার বাণিজ্য ও মাদক কারবারের খবরা-খবর জেনে গিয়েছিলেন মেজর সিনহা। কৌশলে এসব ভিডিও চিত্রও ধারণ করেন তিনি। এমন খবর জানতে পেরে ওসি প্রদীপ মেজর সিনহাকে কক্সবাজার ত্যাগ করার নির্দেশ দেন। সেনাবাহিনীর সাহসী এ মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান তার ইউটিউব চ্যানেল ‘জাস্ট গো’ ডকুমেন্টারি নির্মাণে কক্সবাজারে অবস্থান করে নিজ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এতে মেজর সিনহাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করেন ওসি প্রদীপ, লিয়াকত ও তার সহযোগীরা।

প্রথমে ৩১ জুলাই রাতে বাহারছড়া মারিশবুনিয়া পাহাড়ে ভিডিও ফুটেজ ধারণ করার সময় ডাকাত আখ্যা দিয়ে গণপিটুনিতে মেজর সিনহাকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল প্রদীপ-লিয়াকতের। এতে স্থানীয় লোকজন মেজর পরিচয় পেয়ে তাকে সম্মানজনকভাবে বিদায় দেওয়ায় তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। পরে বাহারছড়া এপিবিএন চেকপোস্টে ওসি প্রদীপ তার অধীন লিয়াকতকে দিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে সিনহাকে। এ কারণে সাক্ষ্য প্রমাণ হওয়ায় কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ ও লিয়াকতকে ফাঁসি এবং তাদের সহযোগিতা করায় অপর ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত মাত্র ৩৩ কার্যদিবসে শেষ করেছেন মামলাটির বিচারকাজ। স্বল্প সময়ে চার্জগঠন, শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর জেলা ও দায়রা জজ আদালত ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি এ রায় দেন।

সোনালী/জেআর