ঢাকা | জুলাই ২৫, ২০২৪ - ৩:৪০ পূর্বাহ্ন

২৭ বছর কাটা-ছেঁড়া মরদেহ গোসল করাচ্ছেন তিনি, নেই স্বীকৃতি

  • আপডেট: Tuesday, June 14, 2022 - 12:12 pm

অনলাইন ডেস্ক: বছরের পর বছর ধরে মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে সেই মরদেহ গোসল দেওয়ার কাজ করছেন আনসারী বেগম। ১৪ বছর বয়স থেকে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আজ ৬০ বছরে পৌঁছেছেন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে নারীদের মরদেহ গোসল করাতে করাতে আজ প্রায় জীবনের শেষ প্রান্তে তিনি। তবু কাজ থেমে নেই তার। তেমনি নেই কোনো স্বীকৃতি। এ কাজের জন্য তার কোনো বেতন বা পারিশ্রমিক নেই। মরদেহের স্বজনদের বকশিশের ওপর চলে তার সংসার।

পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়িতে থাকা অবস্থায় জুতার কারিগর চান মিয়ার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল আনসারী বেগমের। সে সময় তার বয়স ছিল ১২। বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই জীবন যুদ্ধে নেমে পড়েন। ছোট ছোট তিন মেয়েকে রেখে বিয়ের ১০ বছরের মাথায় অসুস্থতাজনিত কারণে স্বামী চাঁন মিয়া মারা যান। তার কিছুদিন পরে তার মা মারা যান। ফলে একেবারেই অসহায় হয়ে পড়েন তিনি।

এদিকে অনেক আগেই বাবার মৃত্যুতে এতিম আনসারী বেগম স্বামী ও মাকে হারিয়ে সে সময় ছোট ছোট তিন সন্তান নিয়ে কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তারপর থেকেই শুরু হয় তার জীবন যুদ্ধের মূল সূচনা। তার মা সরকারি চাকরি করতেন ঢামেক হাসপাতালে। ফলে সেখানে আসা-যাওয়া ছিল তার। এ কারণে ঢামেক হাসপাতালের অনেকের সঙ্গে পরিচয় ছিল।

সেই সুবাদে আজ থেকে প্রায় ২৬ বছর আগে ঢামেক হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ গোসলের কাজ শুরু করেন আনসারী বেগম। এই কাজ করতে করতে জীবন থেকে ৬০ বছর চলে গেছে। এই বয়সে এসেও এখনো জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাকে। এর আগে এক সময় পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়ি এলাকায় কোনো নারী মারা গেলে শরিয়া মোতাবেক গোসল করিয়ে যা উপার্জন করতেন তা দিয়েই সংসার চলতো তার।

সোমবার (১৩ জুন) বিকেলে ঢামেক মর্গে কথা হয় আনসারী বেগমের সঙ্গে। বলেন, আমি শুধু জানি কীভাবে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়। বছরের একটা নারী দিবস আছে। কিন্তু নারী দিবস তো আমাকে কোনো চাকরি দিল না।

তিনি আরও বলেন, প্রথমে পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়ি এলাকায় নারীদের মরদেহ গোসল করালে খুশি হয়ে যা দিত তাই নিতাম। তখন তারা পরনের কাপড়ও দিত। একপর্যায়ে ঢামেক মর্গে নারীদের ময়নাতদন্ত শেষে সেই মরদেহ গোসল করানোর কাজ শুরু করি। সেই থেকে মর্গে ২৭ বছর পেরিয়ে গেল মরদেহ গোসল করানোর কাজ।

আনসারী বেগম আরও বলেন , আমার কোনো বেতন নেই। আমি কোনো চাকরি পাইনি। অনেক চাকরি খুঁজেছি, না পেয়ে অবশেষে মরদেহ গোসলের কাজ করে যাচ্ছি। এই মর্গে অনেক বিকৃত ও টুকরো টুকরো মরদেহের গোসল দিয়েছি। খণ্ডিত মরদেহগুলো পার্ট বাই পার্ট সাজিয়ে গোসল দিয়ে শরিয়া মোতাবেক কাফনের কাপড় পরিয়ে স্বজনদের কাছে দিয়েছি। তাদের স্বজনরা খুশি হয়ে যা দিয়েছে তাই দিয়ে সংসার চালিয়েছি, চালিয়ে যাচ্ছি। এই কাজ করে তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। এছাড়া মর্গের যিনি দায়িত্ব আছেন, উনি খুবই ভালো মানুষ। তার সহযোগিতা থাকে সব সময়। বছরখানেক আগে আমার বড় মেয়েটা মারা গেছে।

আমি সবার জন্য কষ্ট করেছি, এখনো করে যাচ্ছি। এই ৬০ বছর বয়সেও খেটে যাচ্ছি। কিন্তু এখন মনে হয় অসুস্থ হয়ে পড়লে আমাকে কেউ দেখার নেই। অসুস্থ হলে, ওষুধ অথবা খাবার মুখে তুলে দেওয়ার কেউ নেই।

এই কথা বলে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আনসারী বেগম আরও বলেন, সারাজীবন তো বাঁচার জন্য নিজেই সংগ্রাম করে গেলাম। অনেক জায়গায় দরখাস্ত করেছি, অনেক খুঁজেও কোনো চাকরি পেলাম না। শেষে এভাবে মরদেহ গোসল করিয়ে জীবনটা পার করছি।

তিনি জানান, রানা প্লাজা, চুড়িহাট্টা, নিমতলীসহ অনেক ট্র্যাজেডির ঘটনায় নিহত নারীদের গোসল করিয়ে শরিয়ত মোতাবেক সবকিছু সম্পন্ন করে স্বজনদের কাছে মরদেহ বুঝিয়ে দিয়েছি। তবে রানা প্লাজার ঘটনায় নিহত নারীদের মরদেহ অনেক বিকৃত ছিল।

বর্তমানে আনসারী বেগম বকশি বাজার এলাকায় একটি বাসায় একাই ভাড়া থাকেন। বছরখানেক আগে মারা যাওয়া বড় মেয়ের একটি সন্তান তার সঙ্গে থাকে। এভাবেই তার দিন কেটে যাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, ময়নাতদন্ত শেষে গোসল ছাড়া স্বজনরা মরদেহ নিতে চায় না। তাই বাধ্য হয়ে আমাদের গোসল দিয়ে শরিয়া মোতাবেক কাফনের কাপড় পরিয়ে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করতে হয়।

মর্গে এত বছর কাজ করলেও আনসারী বেগমের কোনো বেতন নেই। কলেজ কর্তৃপক্ষও তাকে কোনো টাকা-পয়সা দেয় না। অথচ মর্গের মরদেহ গোসল করানো একটি নিয়মিত কাজ।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গের দায়িত্বরত মর্গ সহকারী সেকান্দর আলী জানান, আনসারী বেগমসহ আরও দুই একজন মর্গে বিনা পয়সায় মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। মানুষ খুশি হয়ে যা দেয়, তা দিয়েই তাদের জীবন চলে যাচ্ছে।

আনসারী বেগমের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপাল অধ্যাপক টিটো মিয়া বলেন, আউটসোসিংয়ের নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। সামনে ওই আনসারী বেগমের জন্য কিছু করা যায় কিনা সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে।

সোনালী/জেআর