ঢাকা | এপ্রিল ২১, ২০২৪ - ৯:০৫ পূর্বাহ্ন

হঠাৎ আগুনে সতর্ক চোখ সরকারের

  • আপডেট: Monday, June 13, 2022 - 11:00 am

অনলাইন ডেস্ক: সীতাকুন্ড থেকে পারাবত এক্সপ্রেস। গতকাল সকালেও রাজশাহী স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা খুলনাগামী সাগরদাঁড়ি আন্তনগর ট্রেনে আগুন। অল্পের জন্য রক্ষা পান যাত্রীরা। একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে সতর্ক সরকার। হঠাৎ হঠাৎ এমন ঘটনায় সতর্ক দৃষ্টি রাখছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। কিন্তু সব ঘটনাই দুর্ঘটনা নাকি অন্য কিছু- তা খতিয়ে দেখতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মাঠে কাজ করছেন গোয়েন্দারাও। তবে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হতে র‌্যাব-পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সব সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। সবাইকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার অনুরোধ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

র‌্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘প্রতিটি ঘটনাই আমরা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছি। এগুলো দুর্ঘটনা নাকি অন্য কিছু- এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মতো আমরাও কাজ করছি। তবে সবাইকে সতর্ক থাকার জন্য আহ্বান করা হচ্ছে। প্রতিটি ব্যাটালিয়নকে এসব বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দিতে বলা হয়েছে।’

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের সব সংস্থার আরও সতর্ক হওয়া উচিত। সেটা তদারকি কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাই হোক না কেন। কোনো নাশকতার ঘটনা হলে এর মদদদাতা ও প্রকৃত অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ফায়ার ফাইটিং যন্ত্রপাতির উপস্থিতি নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, ‘সুষ্ঠু তদন্ত হলেই প্রকৃত কারণগুলো বেরিয়ে আসবে। কারণ আমাদের দেশে প্রায়ই ব্লেম গেম ঘটে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো গড়ে না ওঠার কারণেই মাঝেমধ্যে এমনটা হয়। আবার প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার জন্যই একটি মহল এমনটা করে। তবে একটা বিষয় হলো, আমাদের তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও অ্যাকটিভ হতে হবে। যাতে অপরাধীরা তৎপর হতে না পারে। আবার রেল, কারখানা কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যে কোনো মূল্যে আধুনিক ফায়ার ফাইটিং ইনস্ট্রুমেন্ট নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মাঝেমধ্যে এগুলোর প্র্যাকটিস নিশ্চিত করতে হবে।’

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের কাজ হলো আগুন লাগলে তা নেভানো। তবে সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে শিগগিরই আমাদের একটি চিঠি যাচ্ছে। সেখানে যুগোপযোগী ফায়ার ইকুইপমেন্ট নিশ্চিত করা, নিয়মিতভাবে ফায়ার ড্রিলসহ আগুন নেভানোর প্রস্তুতির ব্যাপারে আরও সচেতনতার বিষয়টি উল্লেখ করা হচ্ছে।’ ৪ জুন রাত সাড়ে ৯টায় চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার শীতলপুরে বিএম কনটেইনার ডিপোয় ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে। আগুনের সূত্রপাতের ৮৬ ঘণ্টা পর তা নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর সমন্বিত টিম। তাদের সঙ্গে যোগ দেন বিভিন্ন এলাকা থেকে যাওয়া স্বেচ্ছাসেবীরা। তবে প্রলয়ঙ্করী সেই আগুন কেড়ে নিয়েছে ১০ ফায়ার ফাইটারসহ ৪৬ জনের জীবন। বিভিন্ন হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন ২ শতাধিক নিরীহ মানুষ। এ ঘটনার মাত্র দুই দিন পর ৬ জুন ভোরে রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় ডিআইটি প্রজেক্টে একটি টিনশেড মার্কেটে আগুন লেগে ১৬টি দোকান পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি ইউনিটের দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

একই দিন রাত ১০টার দিকে রাজধানীর বসিলা আবাসিক এলাকার ১০ নম্বর রোডের বসিলা সিটি ডেভেলপার হাউজিংয়ের আহমেদ ফুটওয়্যার নামে একটি জুতা তৈরির কারখানায় অগ্নিকান্ড ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ৮ জুন রাত সোয়া ১১টার দিকে রাজধানীর পোস্তগোলার পূর্ব জুরাইনে একটি চিপসের কারখানায় অগ্নিকান্ড ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট প্রায় দেড় ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ১০ জুন শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রগতি সরণির কোকাকোলা মোড়ে তুরাগ পরিবহনের একটি বাসে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এর আগেই বাসটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে কোকাকোলা মোড়ে হঠাৎ তুরাগ পরিবহনের একটি বাসে আগুন ধরে যায়। এ ঘটনায় ওই পথে চলাচলকারী যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ১১ জুন মৌলভীবাজারের শমসেরনগরে ঢাকা থেকে সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেসে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে। এ ঘটনায় মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি ও রেলওয়ের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সাবেক উপপরিচালক সেলিম নেওয়াজ ভূইয়া বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ফায়ার এক্সপার্ট হিসেবে কাজ করেন। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনার ঘর আপনাকেই সামলাতে হবে। এজন্য বিএনডিসি ও ফায়ার সার্ভিস অর্ডিন্যান্স অনুসরণ করেই প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। নইলে একের পর এক ঘটনা ঘটতেই থাকবে। আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নাশকতা না দুর্ঘটনা তা আমি বলতে পারব না। তদন্ত কমিটি অবশ্যই এগুলো খুঁজে বের করবে। তবে প্রস্তুতি এবং সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই।’

পুলিশ সদর দফতরের সহকারী উপমহাপরিদর্শক (মিডিয়া) কামরুজ্জামান বলেন, ‘আপাতত সব ঘটনাই দুর্ঘটনা মনে হচ্ছে। তবে তা গভীরভাগে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্যানিক হওয়ার মতো কিছু নেই। আমাদের সবাইকে আরও সচেতন থাকতে হবে।’ কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র কিংবা সন্দেহ মনে করলে ৯৯৯-এ কল করার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ করেন তিনি।