ঢাকা | ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২৪ - ১২:০৩ পূর্বাহ্ন

ভারতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের জন্য হচ্ছে অভিন্ন আইন

  • আপডেট: Friday, June 3, 2022 - 8:20 pm

 

অনলাইন ডেস্ক: ভারতে সব নাগরিকের জন্য একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড বাস্তবায়নের কথাবার্তা চলছিল অনেকদিন আগে থেকেই। এরকম কোন আইন হলে বিয়ে, বিচ্ছেদ বা সম্পত্তির উত্তরাধিকারের মত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে ভারতের বিভিন্ন সম্পদ্রায়ের মানুষেরা নিজ নিজ ধর্ম অনুযায়ী যে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিগত আইন অনুসরণ করেন- তা আর থাকবে না। ধর্ম, লিঙ্গ, বা যৌন অভিরুচি নির্বিশেষে সবার জন্য একটিই অভিন্ন আইন হবে।

এ কারণে শুরু থেকেই এতে প্রধান বাধা আসছে ধর্মের দিক থেকে। ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ও প্রধান সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠী – উভয়েই এর তীব্র বিরোধিতা করে আসছেন।

শুক্রবার বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতে একটি ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা ইউসিসি করার জন্য আলোচনা শুরু হয় ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই। ভারতের সংবিধানেও বলা আছে যে, রাষ্ট্রের উচিত হবে এরকম একটি আইন করার জন্য প্রয়াস চালানো। কিন্তু আজ পর্যন্ত ভারতে এরকম একটি অভিন্ন আইন হতে পারেনি, সুপ্রিম কোর্টের ভাষায় এটি এক ‘ডেড লেটার’ হয়েই রয়ে গেছে। তবে বর্তমানে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্দ্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি এরকম একটি আইনের ভাবনাকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলছে।

ভারতের যেসব রাজে বিজেপি ক্ষমতায় আছে- যেমন উত্তর প্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশ – সেখানে ইউসিসি নিয়ে আলোচনা ক্রমশই জোরালো হচ্ছে। বাস্তবিক, বিজেপির মূল নির্বাচনী প্রচারের সময় প্রধান অঙ্গীকার ছিল তিনটি। অযোধ্যায় বিতর্কিত ধর্মীয় স্থানটির ওপর রামমন্দির নির্মাণ, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করা এবং একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রবর্তন।

সেই মন্দির নির্মাণ এখন চলছে, কাশ্মীরের স্বায়ত্বশাসিত মর্যাদাও বাতিল করা হয়েছে। সুতরাং এখন পাদপ্রদীপের আলো এসে পড়েছে ইউসিসির ওপর। এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি সম্পর্কে হিন্দু ডানপন্থী মহল থেকে যেসব কথাবার্তা বলা হচ্ছে তাও লক্ষণীয়। এতে ইউসিসিকে দেখানো হচ্ছে তাদের ভাষায় ‘পশ্চাৎপদ’ মুসলিম ব্যক্তিগত আইনসমূহের একটি প্রতিপক্ষ হিসেবে।

মুসলিমদের তিন তালাক বা ‘তাৎক্ষণিক বিবাহবিচ্ছেদের’ উদাহরণও টানা হচ্ছে – যা ২০১৯ সালে মোদির সরকার নিষিদ্ধ করে। বিজেপির ম্যানিফেস্টোতে বলা হচ্ছে, ভারত যতদিন অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রবর্তন না করবে ততদিন পর্যন্ত সে দেশে লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে না। তবে রাজনীতিবিজ্ঞানী আসিম আলি মনে করেন, বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।

তিনি বলেন, ‘ইউসিসি ভারতের হিন্দু ও মুসলিম উভয়েরই সামাজিক জীবনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে।’ আসিম আলির কথায়, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি তৈরি করতে গেলে তা এমন এক ‘প্যানডোরার বাক্স’ খুলে দেবে, যার ফলে বিজেপি যে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠদের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি কওে, তাদের জন্যও অনাকাঙ্খিত পরিণতি বয়ে আনতে পারে।

ইউনিফর্ম সিভিল কোড বিষয়ে ২০১৬ সালে ভারতের আইন কমিশন একটি জনমত যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করার পরই এর তীব্র প্রতিবাদ হয়েছিল। কমিশনের চেয়ারম্যান জাস্টিস বি এস চৌহান তাদের ওয়েবসাইটে চার পাতার একটি প্রশ্নপত্র আপলোড করেছিলেন। যাতে বলা হয়, দেশে ‘সামাজিক অন্যায়’গুলো দূর করার জন্য একটি ইউনিফর্ম সিভিল কোড প্রণয়ন করা যায় কি না, সেই লক্ষ্যেই তাদের এ উদ্যোগ।

প্রশ্নপত্রে মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত তিন তালাকের প্রথা পুরোপুরি রদ করা, বহাল রাখা কিংবা তাতে সংশোধনী আনার ব্যাপারে মানুষের রায় কী জানতে চাওয়া হয়। ভারতের প্রায় প্রধান সব ধর্মের বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয় নিয়েই জাতীয় আইন কমিশন মতামত আহ্বান করে। মুসলিমদের তালাক ছাড়াও খ্রিস্টানদের বিবাহবিচ্ছেদ চূড়ান্ত করার আগে দুই বছর অপেক্ষা করা, হিন্দু সমাজের কিছু অংশে ‘মৈত্রী-কারার’ বা বহুবিবাহের মতো যে পদ্ধতি চালু আছে, অথবা হিন্দু মেয়েদের পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার পাওয়া সহজ করতে আইন পরিবর্তন করা উচিত কি না- এসব নানা ব্যাপারে মতামত আহ্বান করা হয়।

কিন্তু ভারতের মুসলিম সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠন মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড এই জনমত যাচাই নিয়ে তীব্র আপত্তি জানায়। ভারতের মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড এই প্রক্রিয়া বয়কটের আহ্বান জানিয়ে অভিযোগ করে, ইউনিফর্ম সিভিল কোড প্রণয়নের নামে আইন কমিশন আসলে বিজেপি সরকারের গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইছে।

বোর্ডের সদস্য হজরত মওলানা ওয়ালি রহমানি দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করে বলেন, বহু ধর্ম, বহু মতের দেশ ভারতে ইউনিফর্ম সিভিল কোড কখনও প্রযোজ্য হতে পারে না। বিবাহ, বিবাহ-বিচ্ছেদ, সম্পত্তি বা উত্তরাধিকারের মতো বিষয়গুলো বিভিন্ন ধর্মের ‘পার্সোনাল আইনে’র মধ্যে পড়ে এবং সেখানে আইন কমিশন নাক গলাতে পারে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে কয়েক হাজার ইমাম এক সমাবেশ করে বলেন, মুসলিম পারিবারিক আইনের বদলে অভিন্ন দেওয়ানী বিধি তারা কোনমতেই মেনে নেবেন না।

বিবিসির ভারত সংবাদদাতা সৌতিক বিশ্বাস এক রিপোর্টে লিখছেন, ভারতের মত একটি বিশাল ও বহু জাতি-ধর্মের দেশে ব্যক্তিগত আইনের প্রশ্নটি অতিমাত্রায় দুরূহ একটি বিষয়। যেমন হিন্দুরা যদিও ব্যক্তিগত আইনের কিছু বিধি মেনে চলে, তাহলেও তারা বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আচরণ-রীতিনীতিকে স্বীকৃতি দেয়। মুসলিম ব্যক্তিগত আইনও সর্বক্ষেত্রে একই রকম নয়। যেমন সুন্নি বোহরা মুসলিমদের অনেকে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে হিন্দু আইনের নীতিগুলো অনুসরণ করেন।

এরপর রয়েছে সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারের অধিকারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন রকম আইন। উত্তর-পূর্ব ভারতের খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যগুলোতে যেমন নাগাল্যান্ড ও মিজোরামে তাদের ধর্ম নয় বরং সংস্কৃতি অনুযায়ী নিজস্ব ব্যক্তিগত আইন আছে। ভারতের গোয়ায় ১৮৬৭ সালের একটি অভিন্ন দেওয়ানি আইন আছে যা সব সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু ক্যাথলিক ও অন্য কিছু সম্প্রদায়ের জন্য আছে ভিন্ন আইন। সেখানে হিন্দুদের জন্য একটি আইন আছে যাতে দুই স্ত্রী রাখার অধিকার সংরক্ষিত আছে।

ব্যক্তিগত আইন ভারতে এমন একটি জিনিস যাতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য উভয় সরকারেরই স্বার্থ আছে। তাই ১৯৭০ সাল থেকেই রাজ্যগুলো নিজেদের আইন করে আসছে। ভারতে ২০০৫ সালে ফেডারেল হিন্দু পারিবারিক আইনে এক যুগান্তকারী সংশোধনী এনে পূর্বপুরুষদের সম্পত্তিতে পুত্রসন্তানের মত কন্যাদেরও সমান অংশ পাবার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু তার বেশ কয়েক বছর আগেই কমপক্ষে পাঁচটি রাজ্য তাদের বিদ্যমান আইনে কিছু পরিবর্তন এনে মেয়েদের এ অধিকার নিশ্চিত করেছিল।

একেক বিষয়ে ব্যক্তিগত আইনও একেক রকম চেহারা নিয়ে থাকে। যেমন ধরা যাক দত্তক গ্রহণের প্রশ্নটি। হিন্দু ঐতিহ্য অনুযায়ী সম্পত্তির উত্তরাধিকারের মত জাগতিক কারণে বা পিতামাতার সৎকারের সময় করণীয় রীতিনীতির মত ধর্মীয় কারণে সন্তান দত্তক নেবার রীতি আছে। অন্যদিকে ইসলামী আইনে দত্তক গ্রহণ স্বীকৃত নয়। কিন্তু ভারতে একটি আইন আছে যার ফলে যে কোন ধর্মের নাগরিকই দত্তক সন্তান নিতে পারেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা এখনো ধন্দে আছেন যে অভিন্ন ব্যক্তিগত আইন প্রণয়ন করতে গেলে নিরপেক্ষ ভিত্তিগুলো কী হওয়া উচিত। ‘আপনি কী নীতি প্রয়োগ করবেন, হিন্দু, মুসলিম না খ্রিস্টান?’ – বলছেন প্রসন্ন কুমার, যিনি ব্যাঙ্গালোরভিত্তিক স্বাধীন আইনি প্রতিষ্ঠান বিধি সেন্টার ফর লিগাল পলিসির একজন ফেলো। তিনি বলেন, ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধিকে কিছু মৌলিক প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। যেমন বিবাহ এবং বিবাহবিচ্ছেদের মানদণ্ড কী হবে? সন্তান দত্তক নেবার প্রক্রিয়া এবং তার পরিণাম কী হবে? বিবাহবিচ্ছেদ হলে সম্পত্তি রাখা বা ভাগ করার ক্ষেত্রে অধিকারগুলো কী হবে? সবশেষ কথা- সম্পত্তির উত্তরাধিকারের নীতিই বা কী হবে?’

আসিম আলি বলছেন, এক্ষেত্রে রাজনীতির প্রশ্নটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ – যার কারণে খুব সহজেই একটা হিতে বিপরীত ঘটে যেতে পারে। অভিন্ন দেওয়ানি আইনের অধীনে যদি ভিন্ন ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে অবাধে বিয়ের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে যে বিজেপি এতদিন ধরে হিন্দু-মুসলিম বিয়ে ঠেকানোর জন্য ধর্মান্তরবিরোধী আইনকে সোৎসাহে সমর্থন দিয়ে আসছিল- তার কী হবে? এতে অবাক হবার কিছুই নেই যে এমনকি সুপ্রিম কোর্টের কথায়ও ইউসিস নিয়ে বিভ্রান্তির আভাসা পাওয়া গেছে।

গত চার দশকে দেয়া বিভিন্ন রায়ে উচ্চতম আদালত সরকারকে জাতীয় সংহতির স্বার্থে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি করতে উৎসাহ দিয়েছে। আবার ২০১৮ সালে আইনি সংস্কার বিষয়ে সরকারকে পরামর্শদানকারী সংস্থা ল কমিশন বলেছে, ইউসিসি করার প্রয়োজন নেই এবং এটা কাম্যও নয়। এটা স্পষ্ট যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কোন ম্যাজিক বুলেট নয়। কুমার বলছেন, ‘একটা আইন অভিন্ন বা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেই যে তা মূল্যবান হবে তা নয়। বরং একটি ভালো আইন হচ্ছে সেটাই যা ন্যায়সঙ্গত, স্পষ্ট এবং সাংবিধানিক।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, জেণ্ডার সমতাবিধানের জন্যও অভিন্ন আইন মেনে চলার দাবির চাইতে বরং ব্যক্তিগত আইনগুলোর সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত। আলি মনে করেন, অনেক বিজেপি-শাসিত রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রবর্তনের চেষ্টা চলছে, যার আসল উদ্দেশ্য হয়তো ওই রাজ্যে এর জনপ্রিয়তা আছে, অথবা এটা করলে আরো বেশি ভোট পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, ‘তাদের আসল লক্ষ্য হচ্ছে রাজনৈতিক মূলধন বাড়ানো এবং বিজেপির নতুন কাঠামোর মধ্যে টিকে থাকা নিশ্চিত করা। কারণ এখানে তাদের হিন্দু ‘ক্রেডেনশিয়াল’ সবসময়ই চকচকে রাখতে হয়।’

অন্য অনেকেই এটা ভেবে অবাক হতে পারেন যে এতদিন ক্ষমতায় থাকার পরও তারা এমনকি রাজ্যগুলোতেও ইউসিসি করতে পারেনি কেন। ভারতে আগামী সাধারণ নির্বাচন আর দু’বছর পরই । বিজেপি কি মনে করছে না যে ইউসিসি করার সময় এসে গেছে। কুমার বলেন, ‘ভারতে এ মুহূর্তে ইউসিসি নিয়ে অনেক কথাবার্তা হচ্ছে। এখনো এ বিতর্ক রাজনৈতিক চেহারা পায়নি। সবার আগে আমাদেরকে বরং প্রস্তাবিত আইনটির একটা খসড়া দেখানো হোক।’