ঢাকা | এপ্রিল ১৯, ২০২৪ - ৬:২৯ অপরাহ্ন

শীষের ধানেই বের হচ্ছে গাছ

  • আপডেট: Thursday, May 12, 2022 - 8:34 pm

 

স্টাফ রিপোর্টার: মাঠের পর মাঠ পাকা ধান। বেশিরভাগ গাছই পাকা ধান নিয়ে শুয়ে। ঝোড়ো বাতাসে শুয়ে গেছে পাকা ধানের গাছ। শ্রমিকের সংকটে এই ধান ঘরে তুলতে পারছেন না চাষি। এরমধ্যেই বৃষ্টি হয়েছে। এই বৃষ্টির কারণে শীষের ধান অঙ্কুরিত হতে শুরু করেছে। এতে দিশেহারা চাষিরা। এবার বোরো ধান নিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে চাষিরা এমন সংকটের মুখে পড়েছেন।

চাষিরা এবার ভয়াবহ ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন। ইতোমধ্যে যাঁরা ধান কেটেছেন তাঁরা গত বছরের তুলনায় ফলন অনেক কম পেয়েছেন। তবে কৃষি বিভাগ এখনও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা করছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, রাজশাহীতে এ বছর ৬৫ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৮৭ হাজার ৭৭৯ মেট্রিক টন। এ পর্যন্ত ৩০ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে।

রোববার বিকালে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফুলবাড়ি, ঈশ্বরীপুর, হাতিবান্ধা, কাঁকনহাট এবং তানোর উপজেলার সরনজই ও কালীগঞ্জ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বেশিরভাগ জমির ধান শুয়ে পড়েছে। কোন কোন জমিতে ধানের শীষ থেকে বের হচ্ছে নতুন গাছ। গোদাগাড়ীর হাতিবান্ধা এলাকায় এক দাগে পৌনে তিন বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন কৃষক সুরমান আলী। রোববার বিকালে শ্রমিকেরা তাঁর জমির ধান কাটছিলেন।

সুরমান বললেন, ‘এই জমিতে গতবার বোরো মৌসুমে বিঘাপ্রতি ২০ মণ ধান পেয়েছি। এবার বাতাসে ধান পড়ে গেছে। এতে শীষ থেকে ধান ঝরে পড়েছে। আবার বৃষ্টির পানি পড়ার কারণে ধানে গাছ বের হতে শুরু করেছে। এবার বিঘাপ্রতি ১৫ মণ ফলন হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। পানিতে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এবার খড়ও হলো না। এত রাগ লাগছে যে মনে হচ্ছে ধান কাটবই না। তাও ফসল তো ফেলে দিতে পারি না। তাই কাটছি।’

ফুলবাড়ি মাঠে ছেলে বিপ্লব হোসেনকে নিয়ে নিজের দেড় বিঘা জমির কাটা ধান উল্টিয়ে দিচ্ছিলেন কৃষক সাইফুল আলম। পাড়নের ধান তুলে তিনি দেখালেন শীষের ধানেই নতুন গাছ গজাতে শুরু করেছে। অঙ্কুরিত ধান নষ্ট হয়ে যাবে। মাড়াইয়ের সময় এগুলো পাতান হয়ে উড়ে যাবে। সাইফুল জানালেন, দুই কিলোমিটার দূরে ঈশ্বরীপুর এলাকায় তাঁর আরও আড়াই বিঘা জমি আছে। সে জমিরও ধানের একই অবস্থা। ফলন খুব খারাপ হবে।

কৃষক সাইফুল আলম বলেন, গ্রামের সব শ্রমিক শহরে চলে যাচ্ছে কাজে। গ্রামে ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। মাঠের পর মাঠ পাকা ধানের গাছ শুয়ে আছে। শুয়ে পড়া ধান শ্রমিকেরা কাটতেও চাচ্ছে না। তাই কৃষক ধান ঘরে তুলতে পারছে না। শ্রমিক না পেয়ে ছেলেকে নিয়েই তিনি ধান কেটেছেন। চার বিঘা ধানের সব কাজ তাঁদেরই করতে হবে। ধান কাটার এই সময়টা শহরের উন্নয়ন কাজ বন্ধ রাখলে গ্রামে শ্রমিক সংকট হতো না।

ধামিলা গ্রামের ধান কাটার শ্রমিক চন্দন বিশ্বাস জানালেন, গত বোরো মৌসুমে বিঘাপ্রতি ২০ থেকে ২২ মণ ফলন হয়েছে। এবার ঈদের আগে থেকেই তিনি ধান কাটছেন। কোন কৃষকের জমিতে তিনি বিঘায় ১৫ থেকে ১৬ মণের বেশি ফলন দেখেননি। এত কম ফলনের ধান কেটেও লাভ হচ্ছে না। ধান শুয়ে পড়ায় এবং অঙ্কুরিত হওয়ার কারণে ফলন কম বলে তিনি জানান।

রোববার সন্ধ্যায় গণকের ডাইং এলাকায় ধান মাড়াইয়ের পর শ্রমিকদের সঙ্গেই ওজন করে দেখলেন বর্গা চাষি বিপুল সরকার। বর্গা নেওয়া দুই বিঘা জমিতে তাঁর ধান হলো ৩২ মণ। এরমধ্যে বিঘাপ্রতি পাঁচমণ করে ১০ মণ জমির মালিকের জন্য আলাদা করে রাখলেন বিপুল। শ্রমিকদের দিতে হলো আরও আট মণ। বাকি ১৪ মণ ধান থাকল বিপুলের।

বিপুল বললেন, ‘দুই বিঘা জমিতে আমার নিজের ধান থাকল ১৪ মণ। এই ভেজা ধান বড়জোর এক হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করা যাবে। তাহলে হাতে আসে ১৪ হাজার টাকা। আর দুই বিঘা জমির আবাদেই খরচ হয়েছে ১৪ হাজার টাকা। এতদিনের খাটাখাটুনি সবই লস।’

বিপুল জানান, আবহাওয়া ভাল থাকলে বিঘাপ্রতি ৩ হাজার করে খড় পাওয়া যেত। এক হাজার খড়ের দামই সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ায় এবার ধানের খড় করা যায়নি। খড় হলে লোকসানটা কোনরকমে পুষিয়ে নেওয়া যেত। মাঠের দিকে দেখিয়ে বিপুল বলেন, ‘আমি তো কোনরকমে ধান ঘরে তুললাম। ওই দেখেন, মাঠের পর মাঠ ধান পড়ে আছে। কাটা-মাড়াইয়ের শ্রমিকের অভাবে কৃষক ধান ঘরে তুলতে পারছে না।’

জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোজদার হোসেন বলেন, ‘কিছু কিছু এলাকায় এ ধরনের সমস্যা আছে। তবে সব জায়গায় না। আর ক্ষতিপূরণের আশায় কৃষক সব সময় ক্ষতির কথা বেশি করে বলে। আসলে ক্ষতি অতো বেশি না। আমরা এখনও আশাবাদী যে ফলন বিপর্যয় হবে না। যে লক্ষ্যমাত্রা আছে তা অর্জন হবে।’