ঢাকা | ফেব্রুয়ারী ২৬, ২০২৪ - ৪:৫৪ পূর্বাহ্ন

আ’লীগ নেতা টিপু হত্যা: যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ

  • আপডেট: Saturday, March 26, 2022 - 8:25 pm

অনলাইন ডেস্ক: ক্ষমতার আধিপত্য, টেন্ডার, চাঁদাবাজি নাকি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব খুন করা হয়েছে মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপুকে? এমন নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নাকি পেছনে আরও কোনো কারণ আছে। এসব প্রশ্ন মাথায় রেখেই এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন শাহজাহানপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ঠাকুর দাস মালো।

ঠাকুর দাস বলেন, তদন্তের স্বার্থে আমরা সবকিছুই বিবেচনা করছি। ইতোমধ্যে আমরা বেশি কিছু তথ্য পেয়েছি। সেগুলো যাচাই-বাছাই করছি। তবে সবার আগে শুটার খুনিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। যে ব্যক্তি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে সে পেশাদার শুটার। না হলে এভাবে অতর্কিতে গুলি করে পালিয়ে যাওয়ার সময় ফাঁকা গুলি করে আতঙ্ক তৈরি করতো না। তার এলোপাতাড়ি গুলিতে রিকশার আরোহী সামিয়া আফনান প্রীতি (২২) নিহত হন। চিকিৎসকরা টিপুর শরীরে ১৬টি গুলির চিহ্ন পান। ওই শুটারকে চিহ্নিত করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনার ইন্ধনদাতাদের চেনা যাবে। এর জন্য গোয়েন্দা সংস্থাও কাজ করছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে দলীয় কোন্দল ও মতিঝিল এলাকার ফুটপাতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আরেকটি গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছিল টিপুর। যার সূত্র ধরে এ হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা টিপুর অনুসারীদের। মামলায়ও দলীয় কোন্দলের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন বাদী টিপুর স্ত্রী ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সংরক্ষিত আসন ১, ১১, ১২ ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর ফারহানা ইসলাম ডলি। এছাড়া মোবাইল ফোনে হুমকির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে মামলায়। কিলাররা ছিল প্রশিক্ষিত। আগে থেকেই তারা টিপুকে রেকি করছিল।

এ বিষয়ে নিহত টিপুর সহযোগী বায়জীদ বলেন, টিপু ভাইকে অনেক ক্ষোভ নিয়ে টার্গেট করেই হত্যা করা হয়েছে। কারণ খুনি তিনবার করে এসে তাকে গুলি করে। মৃত্যু নিশ্চিত হবার পরও তাকে বৃষ্টির মতো গুলি করা হয়। খুন করার সময় খুনির আশেপাশেই হয়তো নির্দেশদাতা ছিল। নাহলে পরপর এতোগুলো গুলি করতো না।

কাউকে সন্দেহ করছেন কিনা চানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা ভাইয়ের সাথেই রাজরীতি করেছি। দিনের অনেকটা সময় ভাইয়ের সাথে থাকা হতো। তবে তিনি কখনো কারো ক্ষতি করেননি। আর তিনি নিজের মধ্যেই সবকিছু রাখতে পছন্দ করতেন। পেছনেই আমার বাসা। নিজের কষ্টগুলোও শেয়ার করতেন না।

এদিকে শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গণমাধ্যমকে বলেন, টিপু হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা জড়িত, নাটের গুরু কারা সবকিছুই গণমাধ্যমের মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে নিয়ে আসা হবে। যারাই এ ঘটনায় জড়িত থাকুক, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

তিনি বলেন, কিলিং পলিটিক্যাল কিনা সেই বিষয়ে এখনই মন্তব্য করতে চাই না। আশা করি খুব শিগগির এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে পারব।

শাহজাহানপুরে ইসলামী ব্যাংকের পাশে বাটার শো-রুমের সামনে টিপুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার বিপরীত পাশে ফুটপাতের পাশে বয়স্ক একজন চা দোকানি প্রতিদিন অনেক রাত পর্যন্ত চা বিক্রি করতেন। তিনি বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, আমি প্রতিদিন অনেক রাত পর্যন্ত চা বিক্রি করি। তবে ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার এই এলাকার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকায় ৯টার মধ্যেই দোকান বন্ধ করে চলে যাই। তবে কিছু পরেই হই হুল্লোড় শুনে বের হয়ে দেখি সবার ছোটাছুটি। বিপরীত পাশের রাস্তাটা ফাঁকা ও ট্রেনের সিগনাল থাকায় খুনিরা দ্রুত পালিয়ে যায়। খুনিদের জন্য দিনটা অনেক ভালো ছিল।

এ ঘটনায় পথচারী কলেজছাত্রী সামিয়া আফরিন প্রীতি (২২) গুলিতে নিহত হন। গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ টিপু ও প্রীতির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে। চিকিৎসকরা প্রীতির শরীরে একটি গুলির চিহ্ন পান।

প্রীতির গায়ে গুলি লাগার বিষয়ে তার বন্ধু সুমাইয়া বলেন, ঘটনার সময় আমরা গাড়ির আগেই ছিলাম। গোলাগুলির সময় আমি লাফ দিয়ে নেমে যাই। গুলিটা কখন লেগেছিল জানতে চাইলে সুমাইয়া বলেন, আমি আগেই লাফ দিয়েছিলাম। প্রীতির গায়ে কখন গুলি লেগেছে আমি দেখিনি। আমি খুব অসুস্থ এর বেশি কিছু বলতে পারবো না।

শুক্রবার নিহত টিপুর স্ত্রী ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর ফারহানা ইসলাম ডলি বাদী হয়ে শাহজাহানপুর থানায় মামলা করেন। মামলাতেও দলীয় কোন্দল বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন বাদী টিপুর স্ত্রী। এছাড়া মোবাইল ফোনে হুমকির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে মামলায়।

তবে মামলা করতে রাজি নন নিহত প্রীতির বাবা মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, এটা একটা দুর্ঘটনা। আমার মেয়ে যেভাবে মারা গেছে সেটা হঠাৎ। একজনের জন্য আরেকজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই আমরা মামলা করিনি। আর মামলা করার কোনো পরিকল্পনাও নেই। আমার কেমন কষ্ট হচ্ছে সেটা আমি জানি। অনেক কষ্ট করে মেয়েকে মানুষ করেছি। সে সংসারের হাল ধরবে। বাড়ির কাছে এসেও আমার মেয়ের বাড়ি ফেলা হলো না।

স্থানীয় সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, মতিঝিল এলাকার টেন্ডারবাজি, মার্কেট নিয়ন্ত্রণ ও বাড়ি নির্মাণের চাঁদাবাজির পুরোটাই এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন টিপু। ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগে ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে যুবলীগ দক্ষিণের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, যুবলীগ নেতা খালেদ ও ঠিকাদার জিকে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর সেসবের একক নিয়ন্ত্রণ চলে আসে টিপুর হাতে।

গোয়েন্দারা বলছেন, ঘটনার সময় গাড়িতে অবস্থান করা আরও দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। চালককেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বসহ বেশ কিছু বিষয় উঠে এসেছে। এছাড়াও টিপুর পরিবারের সদস্য এবং তার কাছের লোকজনদের কাছ থেকেও তথ্য নেয়া হচ্ছে। কারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে সে বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানিয়েছেন তারা।

এদিকে গতকাল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, বেশ কিছু মোটিভ পাওয়া গেছে। সে অনুযায়ী কাজ চলছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে শাহজাহানপুর এলাকায় যানজটে আটকে থাকা মাইক্রোবাসে অবস্থানরত মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপুকে গুলি করে পালিয়ে যায় এক দুর্বৃত্ত। এতে জাহিদুল ইসলাম টিপু ও তার গাড়িচালক মনির হোসেন মুন্না (৩০) গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় মাইক্রোবাসের পাশে আটকে থাকা একটি রিকশার আরোহী প্রীতি নামে এক কলেজ শিক্ষার্থীও গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে জাহিদুল ও প্রীতির মৃত্যু হয়। জাহিদুলের গাড়িচালকের হাতে গুলি লাগায় তিনি চিকিৎসা নিয়েছেন।

নিহত জাহিদুল ইসলাম মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তিনি মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যও ছিলেন। আর নিহত রিকশা আরোহী প্রীতি বদরুন্নেসা কলেজের ছাত্রী ছিলো।

এসবি/জেআর