ঢাকা | জুলাই ১৯, ২০২৪ - ১১:০৮ অপরাহ্ন

সেই ‘স্যালাইন বোলার’ই এখন নায়ক

  • আপডেট: Friday, March 25, 2022 - 1:22 pm

অনলাইন ডেস্ক: জনৈক ক্রিকেটার বলেছিলেন, এই ‘স্যালাইন বোলার’ দিয়ে হবে না! তিনি যে তাসকিন আহমদে ছোট করার জন্য কথাটা বলেছিলেন, তা নয়। কিছুটা হতাশা থেকেই বলা। কারণ তাসকিন তখন জাতীয় দলের মূল স্রোত থেকে ছিটকে পড়েছেন। নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে খুব একটা সিরিয়াসও ছিলেন না। খেলার চেয়ে বেশি ফোকাস ছিলেন ‘শো অফ’ করাতে। ফিটনেসে ঘাটতি থাকায় খেলতে নামলে দ্রুত হাঁপিয়ে উঠতেন।

এক ওভার বল করেই স্যালাইন পানি পান করতে ছুটে যেতেন সাইড লাইনে। ঘন ঘন ইনজুরিতেও পড়তেন তখন। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে বড় রকমের একটি ধাক্কা প্রয়োজন ছিল তার। সেটি পেলেন ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ দলে সুযোগ না পেয়ে। স্কোয়াড ঘোষণার পর আবেগে কেঁদে ফেলেছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন, চোখের জল ফেলেও কিছু হবে না। নিজেকে তৈরি করতে হবে জাতীয় দলের জন্য অপরিহার্য করে। সংবিত ফিরে পাওয়ার পর তাসকিন হয়ে ওঠেন লড়াকু। কভিডকালীন সবাই যখন ঘরবন্দি, তখন একা মাঠে ছিলেন তাসকিন। বিসিবির সদর দরজায় টোকা দিতে লজ্জা হতো তার। বেসরকারি জিম এবং মাঠে পুরো এক বছর ফিটনেস নিয়ে কাজ করেন একান্তে। সেদিন চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন বলেই আজ জাতীয় দলের অপরিহার্য পেসার বলা হচ্ছে তাসকিনকে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ জয়ে রাখতে পারলেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সম্মানিত হলেন ম্যাচ ও সিরিজসেরার পুরস্কারে।

কাকতাল হলেও সত্য, ২০১৭ সালে যে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের পর জাতীয় দল থেকে বাদ পড়েছিলেন সেখানেই যেন পুনর্জন্ম হলো তার। পুনর্জন্ম মানে নিজেকে ফর্মের চূড়ায় প্রতিষ্ঠিত করা। তিনি জানেন, এখানেই শেষ নয়, নতুন শুরু। স্বপ্ন পূরণের পাথেয় এই সাফল্য। একাগ্রতা এবং নিবেদন ঠিক রেখে সাফল্যের সোপান বেয়ে উঠতে হবে চূড়ায়। ভালো খেলে পূরণ করতে হবে প্রতিটি স্বপ্ন। মা-বাবা এবং নিজের স্বপ্ন। এখন আইপিএল থেকে তার ডাক আসে। নিজেকে অপরিহার্য করে গড়ে তুলতে পেরেছেন বলেই জাতীয় দল থেকেও ছাড়া হয় না।

টেস্ট সিরিজের জন্য দেওয়া হয় না আইপিএল খেলার জন্য ছাড়পত্র। এক বছরের পরিশ্রম এবং আরও এক বছরের একাগ্রতা এই জায়গা নিয়ে এসেছে তাসকিনকে। কভিডকালীন ২০২০ সালে ফিটনেস ও স্কিল নিয়ে কাজ করেছেন নীরবে নিভৃতে। ২০২১ সালে বছর জুড়েই জাতীয় দলকে সেবা দিচ্ছেন নিরলস চেষ্টায়। তাসকিনের এখন স্যালাইন পানি লাগে না। টানা স্পেল করার পরও পানি পান করতে সাইড লাইনে যেতে হয় না। বরং টি২০ বিশ্বকাপে বৈশ্বিক ক্রিকেটারদের কাছ থেকে প্রশংসিত হয়েছিলেন লাইন-লেন্থে ব্যাপক উন্নতি দেখিয়ে। কারও কাছে টিপস নিতে যেতে হয়নি, দুবাইর হোটেলে টিপস দিতে তার কাছেই এসেছিলেন কাগিসো রাবাদা।

গত বছর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ খেলে দেশে ফেরার পর তাসকিন এক সাক্ষাৎকারে সমকালের কাছে খুব আক্ষেপ করছিলেন, উপেক্ষার দিনগুলোর কথা স্মরণ করে। কিছু মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, তাসকিন হারিয়ে যাননি। হারাবেন না। জাতীয় দলে খেলবেন আপন শক্তিতে। তিনি আরও জানিয়ে ছিলেন, উপেক্ষার দিনগুলো কোনোদিন ভুলতে পারবেন না। জীবনে যাতে আর উপেক্ষিত হতে না হয় সেজন্য চেষ্টা করে যাবেন নিরলস পরিশ্রম দিয়ে। সেদিন কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করেছিলেন দুঃসময়ে যারা তার পাশে ছিলেন তাদের।

বিসিবির কোচ মাহবুবুল আলম জাকি ও মিজানুর রহমান বাবুলকে কঠিন সময়ে পাশে পেয়েছেন। কভিডকালে নিজের গাড়ির গ্যারেজকে উইকেট বানিয়ে বোলিং করতেন। প্রতিটি স্পেল ভিডিও করে পাঠাতেন এ দুই কোচকে। কোথাও ভুল হলে সেগুলো ঠিক করার পরামর্শ দিতেন তারা। তাসকিনের মুখ থেকেই শোনা কথাগুলো। তার জীবন থেকে আপাতত আঁধার কেটে গেছে। পারফরম্যান্সের আলোয় আলোকিত হচ্ছেন তিনি। তাকে নিয়ে দেশজুড়ে প্রশংসার স্তুতির বান ডাকেছে। ভালো দিক হলো এই বানে ভেসে যাননি তাসকিন। কারণ তিনি আর

স্যালাইন বোলার হতে চান না। উপেক্ষার শিকারও নয়।

সোনালী/জেআর