ঢাকা | ফেব্রুয়ারী ২২, ২০২৪ - ১:৪৬ অপরাহ্ন

চরিত্র বদলাচ্ছে আবহাওয়া, শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায় ‘অস্বাভাবিক আচরণ’

  • আপডেট: Wednesday, March 23, 2022 - 11:42 am

অনলাইন ডেস্ক: ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ হারাতে বসেছে তার স্বাভাবিক আচরণ। শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষার দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে বাকি তিন কাল। প্রতিনিয়ত চরিত্র বদলাচ্ছে আবহাওয়া। শীতকালে পড়ছে গরম। গরমকাল হয়ে উঠছে অতিরিক্ত গরম। বৃষ্টির সময়ে দেখা দিচ্ছে অস্বাভাবিক বৃষ্টি, অথবা অনাবৃষ্টি। শরৎ, হেমন্ত কিংবা বসন্ত প্রকৃতিতে কখন যায়-আসে সেটা বোঝা এখন দায়। গত কয়েক বছর ধরে শীত ও গরম তাল মেলাতে পারেনি মাসের হিসাবের সঙ্গে।

আবহাওয়াবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতে অস্বাভাবিক বৃষ্টি, বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃ্ষ্টি হচ্ছে। তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে হচ্ছে বেশি। বিভিন্ন সময়ে তাপমাত্রাও মানছে না দীর্ঘদিনের প্রথা। বঙ্গোপাগরে অসময়ে দেখা দিচ্ছে ঘূর্ণিঝড়।

শুধু তাই নয়, আবহাওয়া সংক্রান্ত বিষয়গুলো যেভাবে পরিবর্তন হচ্ছে, সেই পরিবর্তনের ধরনও পরিবর্তন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবীতেই জলবায়ু ও আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন এসেছে।

আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, তাপমাত্রা, শৈত্যপ্রবাহ, তাপপ্রবাহের চরিত্রে পরিবর্তন এসেছে। প্রতি বছরই মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে তাপপ্রবাহ হয়। কিন্তু দেখা গেছে, এখন এর স্থায়িত্ব দীর্ঘ হচ্ছে। এবার বসন্তে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তাই আমরা বলতে পারি আবহাওয়া সংক্রান্ত বিষয়ের অস্বাভাবিক চরিত্র বিরাজ করছে। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই বিরাজ করছে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া।

তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবেও আমাদের এখানে আবহাওয়া ও জলবায়ু সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য আমূল পরিবর্তন হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে মৌসুমি বায়ু বিস্তার লাভ করতে বিলম্ব হচ্ছে, আবার যেতেও হচ্ছে বিলম্ব। সিজনের প্যাটার্ন পরিবর্তন হচ্ছে, পরিবর্তন হচ্ছে ডিউরেশনও। ঋতুর আগমন ও বিদায়ের সময়ের মধ্যে হেরফের পরিলক্ষিত হচ্ছে।

এই আবহাওয়াবিদ আরও বলেন, এবার শীতে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ছাড়া সারাদেশে তীব্র শীত অনুভূত ছিল না। শৈত্যপ্রবাহের সময়টাও ছিল কম। আগে টানা ১৫-২০ দিন শৈত্যপ্রবাহ থাকতো। এখন ২/৩/৫ দিনের বেশি শৈত্যপ্রবাহ পাওয়া যায় না। বিস্তৃত এলাকাজুড়ে শীত, এমনও ছিল না।

‘বৈশ্বিক উষ্ণায়নই এজন্য দায়ী। আবার মানুষ্য সৃষ্ট কারণে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হচ্ছে। আবহাওয়া সংক্রান্ত বিষয়গুলো যেভাবে পরিবর্তন হচ্ছে, সেই পরিবর্তনের ধরনও পরিবর্তন হচ্ছে।’

আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ১৮৯১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত যদি আমরা বিবেচনা করি, এর আগে মার্চ মাসে আরও পাঁচটি সাইক্লোন বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয়েছিল। মার্চ মাসে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়ার হার খুবই কম। একেবারে হয় না, তা নয়। এবার মার্চে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির আশঙ্কা ছিল। শেষ মুহূর্তে এটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়নি। মার্চের পাঁচটি ঘূর্ণিঝড়ের কয়েকটি বঙ্গোপসাগরেই দুর্বল হয়ে গেছে। উপকূল অতিক্রম করতে পারেনি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে সারাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৫৩ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এ মাসে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম ছিল।

জানুয়ারি মাসে সারাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ দশমিক ২ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ মাসে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।

ডিসেম্বর মাসে সারাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৫০১ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ডিসেম্বরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ০ দশমিক ২ ডিগ্রি এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।

গত বছরের অক্টোবর মাসে সার্বিকভাবে বাংলাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ওই মাসে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১ দশমিক ৪ এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল।

সেপ্টেম্বর মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। সেপ্টেম্বরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।

গত বছরের জুলাই মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ দশমিক ১ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। ওই মাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে এক দশমিক ৪ ডিগ্রি এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে বেশি ছিল বলেও জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সাস্টেইনিবিলিটির আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক পিএইচডি গবেষক মোস্তফা কামাল (পলাশ) জাগো নিউজকে বলেন, বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়ার ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বব্যাপী মৌসুমি আবহাওয়া বিরূপ আচরণ করা শুরু করেছে। ২০২১ সালের শুরু থেকে সারা বিশ্বে আবহাওয়া বিরূপ আচরণ করছে। চলতি বছরের শীত মৌসুমে ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে শীতকালীন যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে তা ফেব্রুয়ারি মাসের গড় বৃষ্টিপাত অপেক্ষা ৪০০ শতাংশ বেশি।

তিনি বলেন, আজ থেকে ৫০ বছর আগে বছরের কোনো এক নির্দিষ্ট মাসে বায়ুমণ্ডলে যে পরিমাণ জলীয়বাষ্প উপস্থিত থাকতো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা অপেক্ষা বেশি পরিমাণ জলীয়বাষ্প উপস্থিত থাকছে। অতিবৃষ্টি আকারে তা ভূপৃষ্ঠে পতিত হয়ে পানিচক্র পূর্ণ করছে।

‘গত ১০০ বছরের ইতিহাসে মাত্র দুবার মার্চ মাসে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে। এবার মার্চে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। গভীর নিম্নচাপের পর শেষ মুহূর্তে সেটি আর ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়নি। একইভাবে বঙ্গোপসাগরও ২০২১ সালের এপ্রিল মাস থেকে খুবই অস্বাভাবিক আচরণ করছে। যেমন একটি নিম্নচাপ আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপের কাছে সৃষ্টি হয়ে তা ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে আরব সাগরে গিয়ে আবারও ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে প্রথমে ভারত ও পাকিস্তানের উপকূলে আঘাত করে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ওমানের রাজধানী মাস্কটের পাশ দিয়ে স্থলভাগে আঘাত করে ব্যাপক বন্যা ও ক্ষয়-ক্ষতি করেছে। আরব সাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় আগে শুধু ওমানের পূর্ব উপকূলেই আঘাত করতো। এ বছরই প্রথম ওমানের উত্তর উপকূলে আঘাত হানে।’

মোস্তফা কামাল আরও বলেন, ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ ভারতের উড়িষ্যা উপকূলে আঘাত হানার পরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে ব্যাপক বৃষ্টিপাত ঘটায়, যার কারণে মুন্সিগঞ্জ জেলার আলুচাষিরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

‘২০২১ সালে বাংলাদেশে বন্যার স্বাভাবিক সময়ে স্বাভাবিক বন্যা না হলেও বর্ষার শেষে হঠাৎ করে বন্যা নেমে আসে তিস্তা নদীর দুই তীরে।’

তিনি আরও বলেন, বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বেড়েছে। এ কারণে বায়ুমণ্ডলে বেশি পরিমাণ জলীয়বাষ্প ধরে রাখছে যা অতিবৃষ্টি আকারে পতিত হয়ে ব্যাপক বন্যা ঘটাচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়ার কারণে বায়ুপ্রবাহের মান ও দিকের (বিশেষ করে জেট স্ট্রিম অনেক আঁকাবাঁকাভাবে চলছে ও অনেক স্থানে দীর্ঘ সময় ধরে স্থির হয়ে থাকছে) ব্যাপক পরিবর্তন হচ্ছে। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া (অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, অসময়ে বৃষ্টি, অসময়ে ঘূর্ণিঝড়) দেখা যাচ্ছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. তৌহিদা রশীদ বলেন, এবার বর্ষার আগের সময়টা বেশি শুষ্ক থাকবে। বঙ্গোপসাগর থেকে যে আর্দ্রতা আসার কথা সেটা অনেক কম আসায় শুষ্কতার মাত্রা বেশি থাকতে পারে। এবার এপ্রিলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশিও থাকতে পারে।

তিনি বলেন, আগামী দিনগুলোতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হতে পারে। এটা ভালো দিক না, ওদিকটা সাধারণত বৃষ্টিপ্রবণ। এবছর গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে বলেই মনে হচ্ছে। এ সবই জলবায়ু পরিবর্তনের ফল।

‘আমরা দেখেছি বৈশ্বিক বায়ু প্রবাহের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। এখন আবহাওয়াবিদদের কাজ হবে সেটা মনিটরিংয়ে রাখা। আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে কৃষিক্ষেত্রে, স্বাস্থ্যে।’

তৌহিদা রশীদ আরও বলেন, এবার পশ্চিমা লঘুচাপের (ওয়েস্টার্ন ডিস্টার্বেন্স) প্রভাব অনেকটা সময় ধরে ছিল। এর প্রভাবে শীতের মধ্যেও বেশ বৃষ্টি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতা পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও দেখা যাচ্ছে। সব জায়গায় চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া। যেখানে তাপমাত্রা বাড়ছে, সেখানে বাড়ছেও বেশি, আবার যেখানে কমছে, সেখানেও কমছেও বেশি।

সোনালী/জেআর