ঢাকা | জুলাই ১৭, ২০২৪ - ১:১৮ পূর্বাহ্ন

আন্তর্জাতিক সুখ দিবস আজ: তবু বাঁচার প্রেরণা, সুখের সন্ধান

  • আপডেট: Sunday, March 20, 2022 - 11:19 am

অনলাইন ডেস্ক: ‘চারিদিকে/ দেখে আজি পূর্ণপ্রাণে মুগ্ধ অনিমিখে/ এই স্তব্ধ নীলাম্বর স্থির শান্ত জল,/ মনে হল সুখ অতি সহজ সরল।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘সুখ’ কবিতার শেষ চার পঙক্তিতে সুখকে এভাবেই বর্ণনা করেছেন। সুখ কি সত্যিই এত সহজ-সরল?

২১ জুলাই, ২০১৮ সাল। হানিফ পরিবহনের একটি বাসে উঠলেন সাইদুর রহমান পায়েল। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন তিনি। সঙ্গে আছেন তার আরও দুই বন্ধু। চট্টগ্রাম থেকে তারা রওনা দিয়েছেন ঢাকায়। দুই বন্ধু ঢাকায় ফিরলেও পায়েলের মিলল লাশ। হানিফ পরিবহন বাসের চালক, সহযোগী ও সুপারভাইজার তাকে মেরে ফেলে দিয়েছে মুন্সীগঞ্জ উপজেলার ভাটেরচর সেতুর নিচে। ২২ জুলাই ছেলের লাশ দেখে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন তার মা কোহিনূর বেগম।

‘ভেবেছিলাম আমিও মরে যাবো। চলে যাবো ছেলের কাছে। পায়েলকে ছাড়া কীভাবে বাঁচব আমি। উচ্চ ডায়াবেটিস ও প্রেশারের রোগী আমি। তাই জ্ঞান হারাচ্ছিলাম বারবার। প্রতিবারই মনে হতো, মরে যাবো এখনই। কিন্তু বেঁচে আছি দিব্যি। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে এখন ভালো আছি। সুখে আছি।’ বলছিলেন কোহিনূর বেগম। তিনি যখন এসব বলছিলেন তখন পাশেই ছিলেন গোলাম মাওলা। তিনি পায়েলের বাবা। কোহিনূরের কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি বললেন, ‘পায়েলের তিন খুনির ফাঁসির আদেশ হওয়ায় শোকটা ভুলে উঠে দাঁড়িয়েছি আমরা। নতুন করে বাঁচার প্রেরণা খুঁজেছি বেঁচে থাকা দুই সন্তানের মাঝে। জীবন মনে হয় এমনই। শোকে মানুষ কাতর হয়। আবার শোকের দেয়াল ধরেই মানুষ উঠে দাঁড়ায়। নতুন কিছু নিয়ে খোঁজে সুখ।’

হালিশহর ‘জে’ ব্লকের কাঁচাবাজার থেকে ১০০ গজ সামনে গেলেই ‘আই’ ব্লকের ১১ নম্বর লেন। এই লেনেরই শেষ বাসাতে থাকে পায়েলের পরিবার। চারতলা এই বাসায় ডাইনিং রুমের পাশের কক্ষটাতে থাকতেন পায়েল। ঢাকা থেকে বাসায় এলে যাতে পড়াশোনার কোনো ক্ষতি না হয়, সে জন্য একটি রিডিং টেবিলও ছিল এই রুমে। কিন্তু গতকাল সেখানে গিয়ে দেখা যায়নি সেই পড়ার টেবিল। দেখা মেলেনি তার কোনো পোশাকের। নতুন পর্দা লেগেছে সেই ঘরে। বিছানায়ও লেগেছে নতুন চাদর।

সুখের খোঁজে এভাবেই জীবন পাল্টায় মানুষ। হয়তো এ কারণে শত দুঃখ-কষ্টের মাঝেও বাড়ছে সুখী মানুষের সংখ্যা। করোনা মহামারিতে ৬০ লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারালেও কিছু সুখের খবর দিয়েছে ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট। জাতিসংঘের এই বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২১ সালে সুখ বেড়েছে বাংলাদেশের মানুষের মনে। আজ ২০ মার্চ ‘আন্তর্জাতিক সুখ দিবস’ সামনে রেখে শুক্রবার দশমবারের মতো এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক-এসডিএসএন। তাতে বাংলাদেশের সাত ধাপ উন্নতি হয়েছে বলে দেখিয়েছে এই সংস্থা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘এত দুঃখ-কষ্টের মাঝেও মানুষ সুখ খোঁজে। হতাশার মাঝেও খোঁজে আলো। তাই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করছে মানুষ।’

তিনি বলেন, ‘আগে একটি পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন একজন, এখন একই পরিবারে উপার্জন করে একাধিক হাত। এ জন্য মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ বেড়েছে। বেড়েছে জীবনযাত্রার মানও। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করা গেলে বাংলাদেশের অবস্থা আরও ভালো হবে। বাড়বে সুখী মানুষের সংখ্যাও।’

সত্যি সত্যি শোককে শক্তি ও সংখ্যাকে সম্পদে রূপান্তর করছে মানুষ। তাই শত বাধার পরও এগিয়ে যাচ্ছে কেউ কেউ। শোকের পরও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এমন উদাহরণ আছে হাতের কাছেই। ইস্পাতশিল্পের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান জিপিএইচ গ্রুপ মাস কয়েক আগেই করোনায় হারিয়েছে তাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় ভাই আবদুর রউফকে। জিপিএইচ গ্রুপের পরিচালক ছিলেন তিনি। অথচ বড় ভাই আবদুর রউফকে সঙ্গে নিয়েই অপর পাঁচ ভাই জাহাঙ্গীর আলম, আলমগীর কবির, আলমাস শিমুল, আশরাফুজ্জামান ও আবদুল আহাদ শুরু করেছিলেন এ ব্যবসা। ছয় ভাই মিলেই গড়ে তুলেছেন ইস্পাতশিল্পের সবচেয়ে আধুনিক এক কারখানা। ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস কোয়ান্টাম বা ইএএফ কোয়ান্টাম প্রযুক্তির এ কারখানা বাংলাদেশে আছে কেবল তাদেরই। জিপিএইচ ইস্পাতই প্রথম একই ছাদের নিচে ইএএফ কোয়ান্টাম প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়েছে। দেশে বেসরকারি খাতে কোনো একক প্রকল্পে এটিই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। ছয় ভাই মিলে গড়ে তোলা আধুনিক এ কারখানাটি উৎপাদনে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই মারা গেছেন আবদুর রউফ। ভাই হারানোর শোকে অনেক দিনই কাতর ছিলেন অপর পাঁচ ভাই। কিন্তু জীবনের প্রয়োজনে ফের স্বাভাবিক হয়েছেন তারা। গত ৩১ ডিসেম্বর রাতে এ পরিবার মেতেছিল উৎসবেও। মেজো ভাই আলমগীর কবিরের মেয়ে রাইসা কবিবের বিয়ে হয় এই দিন। বিয়েকে ঘিরে ঢাকার বসুন্ধরা কনভেনশন হলে বসে হাজারো মানুষের মিলনমেলা। রাইসাকে দোয়া করতে সেদিন একমঞ্চে উঠেছিলেন সব ভাই।

শুধু মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত নয়; জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে শ্রমজীবী মানুষও। পাহাড়তলী ঝাউতলা রেললাইনের পাশের বস্তিতে দেখা হয় রহিমা বেগমের সঙ্গে। মেয়ের মাথায় উকুন বাছছিলেন তিনি। মা-মেয়ের এমন সুন্দর মুহূর্ত দেখতে পেয়েছে সমকাল। রহিমা বেগমকে তার আয়ের মাধ্যম কী জিজ্ঞাসা করা হলে বলেন, ‘আমি পরের ঘরে কাজ করে সংসার চালাই। চার সন্তান তাদের বাবাকে হারিয়েছে এই করোনায়। চারদিকে অন্ধকার দেখছিলাম তখন। কিন্তু এখন আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি। দুই মেয়েকে স্কুলে দিয়েছি। আমার এক ছেলে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজও করছে। আমরা বেশ সুখেই আছি।’

সুখে থাকার কথা বললেন জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুলও। তিনি বললেন, ‘জীবন এমনই। ঝড়ের পরও যারা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, জীবন তাদের জন্যই। দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে আমাদের সংসার। আমাদের পরিবারেও ঝড় আসে। কিন্তু আমরা ঝড়ের পর আসা সুখের জন্য তাকিয়ে থাকি। ঝড় থেমে যায়। এগিয়ে যায় জীবন। এগিয়ে থাকে সুখ।’

আজ ২০ মার্চ বিশ্ব সুখ দিবস। বিশ্ব সুখ দিবস ঘিরে জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক-এসডিএসএন যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে বাংলাদেশের উন্নতি হয়েছে সাত ধাপ। ২০১২ সাল থেকে মোট দেশজ উৎপাদন, সামাজিক সুরক্ষা, কাঙ্ক্ষিত গড় আয়ু, সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা, মানবিকতা, দুর্নীতির ধারণা এবং সার্বিক দুর্দশা- এই সাত মানদণ্ডের ভিত্তিতে বিচার করে একটি দেশের মানুষ কতটা সুখে আছে, তা বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। সূচকে একটি দেশের অবস্থান চিহ্নিত করতে ব্যবহার করা হয়েছে গ্যালপ ওয়ার্ল্ড পোল থেকে পাওয়া তথ্য। তাদের ১০ ভিত্তিক স্কেলে এবারের সূচকে বাংলাদেশের সুখের পয়েন্ট ৫ দশমিক ১৫৫। বিশ্বের ১৪৬টি দেশের মধ্যে এটির অবস্থান ৯৪তম। আগের বছর ১০৪টি দেশের মধ্যে ৫ দশমিক শূন্য ২৫ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশ ছিল ১৪৯টি দেশের মধ্যে ১০১তম অবস্থানে।

সোনালী/জেআর