ঢাকা | ফেব্রুয়ারী ২২, ২০২৪ - ১২:৫৩ অপরাহ্ন

দেশে ৬৫ শতাংশের বেশি তরুণী যৌন হয়রানির শিকার: সমীক্ষা

  • আপডেট: Saturday, March 5, 2022 - 7:45 pm

 

অনলাইন ডেস্ক: দেশে ৬৫ শতাংশের বেশি তরুণী যৌন হয়রানির শিকার হন বলে এক সমীক্ষার বরাতে জানিয়েছে আঁচল ফাউন্ডেশন নামে একটি সংস্থা। একইসঙ্গে তারা বলছে, প্রায় ৪৫ শতাংশ তরুণী গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

‘তরুণীদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং মানসিক স্বাস্থ্যে এর প্রভাব’ শীর্ষক শনিবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমীক্ষার ফল তুলে ধরে আঁচল ফাউন্ডেশন।

তারা জানিয়েছে, জরিপে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী ১০১৪ জন শিক্ষিত তরুণী যৌন হয়রানি, বৈষম্য, লাঞ্ছনা, সমাজ ও পরিবারে প্রতিবন্ধকতা, নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি বিষয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এদের মধ্যে অবিবাহিত ৮৮.১৭ শতাংশ ও বিবাহিত ১০.৯৫ শতাংশ এবং বাকিরা আর সংসার করছেন না।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে মোট তরুণীদের মধ্যে ৬৫.৫৮ শতাংশই যৌন হয়রানির শিকার হয়। এর মধ্যে ৩৫.৪৯ শতাংশ তরুণী জানিয়েছেন তারা বিকৃত যৌন ইচ্ছার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতের মাধ্যমে নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। ২৯.৬২ শতাংশ তরুণীকে আপত্তিকর স্পর্শের ভুক্তভোগী হতে হয়েছে। আর বিভিন্ন জায়গায় ইভটিজিংয়ের শিকার হয়েছেন ২২.২৬ শতাংশ।

এছাড়া ৪৫.২৭ শতাংশ তরুণী যৌন হয়রানির শিকার হন গণপরিবহনে। সেই সঙ্গে বাস বা বাসস্ট্যান্ডে যৌন হয়রানির মতো অভিজ্ঞতার সন্মুখিন হন ৮৪.১০ শতাংশ তরুণী। এছাড়া রেল বা রেল স্টেশনে ৪.৫৮ শতাংশ এবং রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে ১.৫৩ শতাংশ তরুণী যৌন হয়রানির শিকার হন।

কুদৃষ্টি, অনুসরণ এবং আপত্তিকর স্পর্শের শিকার…

জরিপের তথ্য অনুযায়ী জানানো হয়েছে, যৌন হয়রানির মধ্যে আপত্তিকর স্পর্শের শিকার হয় ৬৪.৯২ শতাংশ তরুণী এবং কুদৃষ্টি ও অনুসরণের শিকার হয়েছেন ২০.০৪ শতাংশ তরুণী।

এছাড়া একাকী চলার সময়ে তরুণীরা সবচেয়ে বেশি এ ধরনের নিপীড়নের শিকার হন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি, যা ৭৫.৬০ শতাংশ। তবে ২১.৫৭ শতাংশ মা, বোন, বান্ধবী বা অন্য নারী সঙ্গী থাকা অবস্থায় এবং ২.৮৩ শতাংশ বাবা, স্বামী, ভাই বা অন্য পুরুষ সঙ্গী থাকা অবস্থায় নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

আত্মীয়-স্বজনের দ্বারা শৈশবে যৌন নিগ্রহের শিকার…

গবেষণা তথ্য অনুযায়ী সংস্থাটি জানিয়েছে, শৈশবে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন ৩৮.৮৬ শতাংশ তরুণী। এদের মধ্যে আত্মীয়-স্বজনের দ্বারা ৩৫.২৮ শতাংশ যৌন নিগ্রহমূলক আচরণের শিকার হন। শৈশবে অপরিচিত ব্যক্তিবর্গের দ্বারা ভুক্তভুগী হন ২৮.১৭ শতাংশ। এছাড়াও ১৬.৫০ শতাংশ প্রতিবেশীদের কাছ থেকে এহেন হীন আচরণের শিকার হন। শৈশবের এরূপ ঘটনা ২৮.৪৩ শতাংশের মনে সবার প্রতি অবিশ্বাসের জন্ম দেয় এবং ২৮.১৭ শতাংশের ভেতর পুরুষবিদ্বেষী মনোভাবের সৃষ্টি হয়। এছাড়া ১৫.৭৪ শতাংশ একা থাকতে ভয় পান। সমীক্ষা মতে, ১.৭৮ শতাংশ নারী উল্লেখিত সব ধরনের ট্রমার ভেতর দিয়ে গেছেন বলে জানা যায়।

অনলাইনে ছবি নিয়ে বিড়ম্বনা….

সমীক্ষায় অংশ নেওয়া তরুণীরা বলছেন, ৪৩.৮৯ শতাংশ তরুণী অনলাইনে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে অবান্তর ও কুরুচিপূর্ণ মেসেজ পাঠিয়ে এবং মন্তব্য করে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা হয়েছে ৬১.১২ শতাংশকে।

সামাজিক যোগযোগমাধ্যমের আইডি হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছেন ১০.৩৪ শতাংশ। ৯.৮৯ শতাংশ ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল ছবি নিয়ে দুর্ভোগ পোহান বলে জানিয়েছেন। এছাড়া অযাচিত আইডি স্টকিংয়ের শিকার হন ৫.১৭ শতাংশ।

মতামত প্রকাশেও বাধার সম্মুখিন…

সমীক্ষা অনুযায়ী জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে তরুণীরা মতামতের ক্ষেত্রে তার পরিবারে গুরুত্ব পায় কিনা, সেই প্রশ্নের নেতিবাচক উত্তর দেন অংশগ্রহণকারীদের ২২.২৯ শতাংশ। শুধুমাত্র নারী হওয়ার দরুণ মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে বাঁধার সম্মুখীন হতে হয় ৪৬.২৫ শতাংশকে।

তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব…

পারিবারিক টানাপড়েন তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সর্বাধিক প্রভাব ফেলে, যা ৩১.৮৫ শতাংশ বলে সমীক্ষার ফলাফলে জানানো হয়েছে। আর্থিক অস্বচ্ছলতা অংশগ্রহণকারীদের ২৪.৪৬ শতাংশের মনে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। বেকারত্বের কারণে ১৪.৭৯ শতাংশ মানসিকভাবে বিপর্যস্ততার শিকার হন। ১৪.৪০ শতাংশ সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্নতার মাধ্যমে ও ২.৩৭ শতাংশ তরুণী যৌন নিপীড়নের কারণে মানসিকভাবে প্রভাবিত হন।

পারিবারিক টানাপড়েনের কারণ…

পারিবারিক অস্বচ্ছলতা ৩০.৭২ শতাংশ তরুণীদের মনে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে। এছাড়া পারিবারিক কলহ ২৭.৩২ শতাংশের মনে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। সেই সাথে পরিবার থেকে অযাচিত চাপের কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ততার শিকার হয়েছেন ২৩.৯২ শতাংশ নারী।

অসম্মতি সত্ত্বেও বিয়ের চাপ…

জরিপে অংশগ্রহণকারী তরুণীদের মধ্য থেকে ২৩.৭৭ শতাংশ তরুণী নিজেদের অসম্মতি থাকা সত্ত্বেও পরিবার থেকে বিয়ের চাপের সম্মুখীন হন। যারা এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন তাদের মধ্যে ১০৯ জনের পরিবার পরবর্তী সময়ে বিয়ে না হওয়ার ভয় থেকে এমন চাপের সৃষ্টি করেন বলে জানা যায়। কমবয়সী মেয়েদের ভালো বর হয় এরূপ ধারণার কারণে ৮৬ জনের ওপর পারিবারিকভাবে বিয়ের চাপ আসে। করোনা মহামারির কারণে শিক্ষাবর্ষ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ৮৫ জনকে বিয়ের চাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে।

তরুণী শারীরিক অবয়ব নিয়ে মন্তব্যের শিকার….

পরিসংখ্যানের তথ্য ও উপাত্ত অনুযায়ী, ৬৯.৯২ শতাংশ তরুণী শারীরিক অবয়ব নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৭.২৪ শতাংশ তরুণী জানিয়েছেন, তাদের শরীরের আকৃতি ,গঠন এবং অবয়ব নিয়ে নিজেদের আত্মীয়রাই কথায় ও ইঙ্গিতে হেয় প্রতিপন্ন করেছেন। বন্ধুবান্ধবের কাছে বডি শেমিংয়ের শিকার হয়েছেন ২২ শতাংশ। পরিবার থেকে এ ধরনের মন্তব্য শুনেছেন বলে জানিয়েছেন ১৪.২৫ শতাংশ। পথচারীর মাধ্যমে শারীরিক অবয়ব নিয়ে নেতিবাচক কথা শুনতে হয়েছে ১১.৮৫ শতাংশ তরুণীর।

এদের মধ্যে ওজনের কারণে নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হতে হয় বলে ৩৯.৪৯ শতাংশ তরুণী মনে করেন। গায়ের রঙের কারণেও ৩৬.৯৫ শতাংশ তরুণী এ ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। এছাড়াও উচ্চতা, মুখাবয়বের গঠন ও দাগ, কণ্ঠস্বর প্রভৃতি বিষয় নিয়ে তরুণীরা বিরূপ মন্তব্য শুনে থাকেন বলে জানিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘দেশে বেশ কয়েক বছরের ট্রেন্ড যৌন হয়রানি। পাবলিক প্লেসে ইভেন বাড়িতেও বা ডিফারেন্স সিসুয়েশনে হচ্ছে। এই যৌন হয়রানি প্রতিরোধে যদি স্ট্রিক্ট এন্টি সেক্সুয়াল প্রিভেনশিয়াল কমিটি বা ডিফরেন্ট একাডেমিক ইনস্টিটিউশন এবং এন্টি সেক্সুয়াল হ্যরেজমেন্ট কমিটি সব জায়গায় বাধ্যতামূলক ভাবে করতে হবে। ৯৯৯ বা নারী সহায়তায় যেগুলো আছে সেগুলোকে সব একাডেমিক ইনষ্টিটিউটগুলো থেকে অ্যাওয়ারনেস করা এবং মোটিভেট করা তারা যাতে এই নাম্বারগুলোতে কল করেন।’

তিনি বলেন, ‘পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ব্যপারে সরকারের একটা স্ট্রিক্ট রুলস থাকা উচিত। এমনকি তাকে জরিমানার নিয়ম থাকা উচিত। এছাড়া পাবলিকপ্লেস গুলো ক্যামেরার আওতায় আনা উচিত। যাতে কে কি করছে তার এভিডেন্স থাকে। পরে তার এগেন্যেস্টে কম্পেলেইন করলে সে যে জব করে তাহলে সেখানে তার পানিশমেন্টের ব্যবস্থা করা আর যদি না করে তাহলে তাহলে অর্থিক অথবা জেলে এর পানিশমেন্ট করতে হবে।’

যৌন হয়রানির বিষয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে দায়ী দেখছেন এই সমাজবিজ্ঞানী। ভিক্টিম ব্লেইম, পোশাককে দোষারোপসহ নানা চাপের কারণে মেয়েদের মানসিক সমস্যা তৈরি হয়। ফলে এই ভয়ে তারা কাউকে বলে না, দীর্ঘকাল চেপে রাখে। এর ফলে তাদের নানান রকম মানসিক সমস্যা হয়। তারা ভীতু হয়ে যায়।

সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক কাবেরী গায়েন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কাজী সাইফুদ্দিন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কো-অর্ডিনেটর শাহানা হুদা রঞ্জনা এবং আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ উপস্থিত ছিলেন।