তৈয়বুর রহমান: দেশে ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে উঠেছে শত শত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। সরকারী হাসপাতালের অধিকাংশ ডাক্তার সেখানে সময় দিচ্ছেন। এর ফলে সরকারি হাসপাতালে সাধারণ মানুষ সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেন না। বেসরকারি হাসপাতাল,ক্লিনিকগুলো রোগীতে উপচে উঠছে। সুযোগ-সুবিধা বেমি হওয়ায় অতিরিক্ত খরচেও সেখানে ভিড় বাড়ছে। চিকিৎসায় বাণিজ্যিকীকরণের ফলে সম্পদশালীরা সুবিধা পেলেও প্রকৃত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নি¤œবিত্তের মানুষ।
মানুষের মৌলিক অধিকারের একটি চিকিৎসা। সকল শ্রেণির মানুষের জন্য মানসম্পন্ন চিকিৎসা ব্যবস্থা রাখার দায়িত্ব সরকারের। চিকিৎসা ব্যবসা নয় চিকিৎসা সেবা। কিন্তু এক শ্রেণির চিকিৎসক ব্যক্তিগত অর্থ উপার্জনকে বেশি প্রাধান্য দেয়ায় সমস্যায় পড়েছে নি¤œ ও মধ্যবিত্তের মানুষ।
চিকিৎসার মান উন্নয়নে সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। দেশে তৈরি হচ্ছে নিত্য-নতুন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। লক্ষ্য চিকিৎসা সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া। এসব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিত্য নতুন ডাক্তার তৈরি হচ্ছেন। কিন্তু এর কোন সুফল পাচ্ছে না নি¤œবিত্তের সাধারণ মানুষ। অর্থের অভাবে অভিজ্ঞ ডাক্তারদের নাগাল পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। এসব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে যারাই দক্ষতা অর্জন করছেন তাদের অধিকাংশই ছুটছেন টাকার পিছনে। এর ফলে অসহায় হয়ে পড়ছেন সাধারণ গরিব রোগীরা।
আধুনিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে দেশ অনেক এগিয়েছে। গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক হয়েছে। সেখানে গ্রামের মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা পেলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য আসতে হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু ডাক্তারগণ বাইরে চিকিৎসা করায় সেখানে এসেও সেই রোগীরা উপযুক্ত চিকিৎসা পান না।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) মত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর তৈরি হয় শতশত ডাক্তার। অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে তাদের কদরও বাড়ে। অসংখ্য ক্লিনিক ও বেসরকারি হাসপাতালে তাদের ডাকও পড়ে। অর্থ উপার্জনের ধান্দায় তারা বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকে কাজ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সরকারি হাসপাতালের চাকরিকে বাইপাস করে সেখানে সময় দেন। সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারের অভাবে রোগী মারা গেলেও তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। অথচ প্রতি দিন তারা বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে উপরি আয়ের আশায় সময় দিচ্ছেন দিনের পর দিন।
রাজশাহী নগরী অসংখ্য ডায়গনস্টিক সেন্টার,বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ছেয়ে গেছে। নগরীতে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন। ঐসব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ডাক্তাররা অপারেশন করে প্রতি দিন হাজার হাজার টাকাও কামাচ্ছেন। অথচ রামেক হাসপাতালের রোগীদের খোঁজ রাখেন না তারা।
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডাক্তারের চাকরি আছে ঠিকই কিন্তু সেখানে তাদের উপস্থিতি খুবই কম। তারা দিনে একবার সামান্য রাউন্ড দিয়ে ডিউটি শেষ করেন। অনেকে নিয়মিত আসেন না। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকগুলোতে খুঁজলে তাদের ঠিকই পাওয়া যাবে।
অবস্থা এমন এক নির্মম পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে,অনেক গরিব মানুষকে চিকিৎসার অভাবে লাশ হয়ে ফিরতে হয়। নগরীর এক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের মনে হয় হাসপাতাল বাদ দিয়ে গ্রামের সেই মান্ধাতা আমলের হাতুড়ে ডাক্তারের কাছেই যেতে হবে। কারণ তাদের মানবিকতা ছিল। এমন এক সময় ছিল যখন গ্রামের গরিব মানুষ হাতুড়ে চিকিৎসকের কাছেই চিকিৎসা করাতেন। এখন সমস্যা হয়েছে বড়বড় হাসপাতাল ও ডাক্তার হওয়াতে। এখনকার উন্নত চিকিৎসা ও চিকিৎসক দিয়ে কি হবে যদি প্রকৃত চিকিৎসা না পায় মানুষ। যে দেশে চিকিৎসাকে সেবা হিসেবে গ্রহণ করা হয় সে দেশে চিকিৎসকের অর্থের কাছে আত্মসমর্পণ মেনে নেয়া যায় না। তাই প্রকৃতি চিকিৎসা পেতে হলে সেই মান্ধাতা আমলের ডাাক্তারদের মত মানবিকতা থাকতে হবে। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসার নামে মানবিকতা বিসর্জন এটা একটা অপরাধ।
আগে গ্রামে গ্রামে কলেরা, বসন্ত, ম্যালেরিয়া জ্বর, কালাজ্বর মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়তো। গ্রামের ডাক্তাররা রোগীদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করে মানুষকে বাঁচাতেন। তাদের কাছে টাকা নয় মানবিকতাই ছিল বড়।
হাসপাতালের এক অসহায় রোগী বলেন,এটাও ঠিক যে সরকারি হাসপাতালে যতটুকু চিকিৎসা থাক না কেন নি¤œবিত্তের মানুষের একমাত্র ভরসা সরকারি হাসপাতালগুলো। সাধারণ মানুষ অর্থের অভাবে যন্ত্রণা ভোগ করে সরকারি হাসপাতালে যান। কারণ তাদের টাকার জোরে নেই তাই বাধ্য হয়ে সেখানে যান। বড় বড় ডাক্তার না পাওয়া গেলেও ইন্টার্নি ডাক্তারতো পাওয়া যায়? এ টাই গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের সান্ত¦না।
এ সম্পর্কে রাজশাহী স্বাধীনতা চিকিৎসা পরিষদের সভাপতি প্রফেসর ডা: চিন্ময়কান্তি দাস ডাক্তারদের হাসপাতালের বাইরে চিকিৎসার কথা স্বীকার করে বলেন, এর চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে জনবল সংকট। হাসপাতালের বেডের থেকে রোগীর সংখ্যা আনেক বেশি। হাসপাতালের সিটের তিনগুণ রোগীর চাপ। এখানে নার্স,কর্মচারি সংখ্যা খুবই কম। এছাড়াও ডাক্তারের সমস্যা রয়েছে।
রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা: কাজী মিজানুর রহমান বলেন, দেশের আনাচে কানাচে হাসপাতাল হওয়া এটা দেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে একটি অগ্রগতি। এ চিকিৎসার বিকাশ ঘটলেও বড় বড় হাসপাতালের চিকিৎসকরা অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত। এতে সাধারণ মানুষ প্রকৃত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কী না প্রশ্ন করা হলে তিনি এর সঠিক উত্তর না দিয়ে বলেন, সিভিল সার্জনের বিষয় এটা নয়।