কাজী নাজমুল ইসলাম: রাজশাহীতে চলমান বন্যায় এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৬ হাজার বাড়ি। এতে দুর্ভোগে পড়েন এই বাড়িগুলোর ২৬ হাজার মানুষ। এছাড়া প্রায় আড়াই হাজার বিঘা জমির বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে, যা টাকার অংকে প্রায় ৭ কোটি । পানি এখন কমতে শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উজান থেকে নেমে আসা পানিতে গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাত থেকে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এই পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে ২০ দিন অর্থাৎ ৩ অক্টোবর পর্যন্ত। এই ২০ দিনে পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার কাছাকাছি পৌছে গেলেও রাজশাহীতে বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। রাজশাহীতে পদ্মার পানির বিপদসীমা ১৮ দশমিক ৫০ মিটার। গত ৩ অক্টোবর রাজশাহীর বড়কুঠি পয়েন্টে পানির উচ্চতা পাওয়া গেছে ১৮ দশমিক ১৯ মিটার। সে অনুযায়ী পানি বিপদসীমার মাত্র ৩১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এটাই চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পদ্মার পানির সর্বোচ্চ উচ্চতা। এরপর থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। গতকাল বুধবার সন্ধায় বড়কুঠি পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ৬৪ মিটার।
হঠাৎ করে উজানের ঢলে পদ্মায় এই পানি বৃদ্ধির ফলে মহানগরীর পদ্মাপাড়ের বিভিন্ন এলাকা এবং গোদাগাড়ী উপজেলার চরআষাড়িয়াদহ, পবার চর মাঝারদিয়াড়, চরখিদিরপুর, মধ্যচর, খোলাবোনা, পুরাতন কসবা, বেলুয়ার চর, চর খানপুর, নবগংঙ্গা, সোনাইকান্দি, হাড়–পুর, বেরপাড়া ও চারঘাট বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পানি উঠে যায়। নীচু এলাকার বাড়িঘরসহ খেতের ফসলের মধ্যে মাসকালাই, আমন, আগাম শীতের সবজিসহ অন্যান্য ফসল প্লাবিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চরাঞ্চলের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি উঠে যাওয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন উপজেলার পানিবন্দী পরিবারগুলোর কাছে জরুরিভাবে ত্রাণসামগ্রী পৌছানো শুরু করে প্রশাসন। এছাড়াও জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা দূর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, পদ্মায় পানি বৃদ্ধির ফলে নগরীসহ ৩ উপজেলার ৫ হাজার ৯৪১ টি বাড়ি সম্পূর্ণ এবং ২৪৫ টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই বাড়িগুলোর মোট জনসংখ্যা ২৫ হাজার ৯৪২জন। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলোর মধ্যে নগরীর ১৫শ’, বাঘার ৪ হাজার, পবার ৩৬৫ ও গোদাগাড়ীর ৭৬ টি। নগরীসহ ৩ উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে শুকনা খাবার ও চাল বিতরণ করা হয়েছে। প্রত্যেকের মধ্যে বিতরণকৃত সামগ্রীর মধ্যে ছিল চাল, ডাল, চিড়া, চিনি, বিস্কুট, মোমবাতি ও দিয়াশলায়। দূর্গত পরিবারগুলোকে ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। এছাড়া গোদাগাড়ীতে ১৫২ বান্ডিল ঢেউটিন ও ঘর নির্মাণে ৪ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, জিআর নগদ টাকা পবায় ২ লাখ, গোদাগাড়ীতে ২ লাখ ৫৫ হাজার ও বাঘায় ৩ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়। পানি কমলে ক্ষতিগ্রস্তদের পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসনের আওতায় নেয়া হবে।
এদিকে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সামছুল হক জানান, এই বন্যায় ও জলাবদ্ধতায় রাজশাহীর গোদাগাড়ী, পবা, বাঘা, চারঘাট ও তানোর উপজেলায় বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে ২১৩ হেক্টরের মাসকলাই, ১১০ হেক্টরের সবজি ও ১০ হেক্টরের রোপা আমন। টাকার অংকে ক্ষতির পরিমাণ ৬ কোটি ৮৫ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। বন্যার এই ক্ষতির বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিলে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের রবি মৌসুমের শুরুতে পুনর্বাসন করা যেতে পারে বলে জানান তিনি।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র জানায়, গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাত থেকে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে থাকে। গত ৩ অক্টোবর পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে রাজশাহীর বড়কুঠি পয়েন্টে পানির উচ্চতা গিয়ে দাড়ায় ১৮ দশমিক ১৯ মিটারে। সে অনুযায়ী পানি বিপদসীমার মাত্র ৩১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এরপর থেকে পানি কমতে শুরু করে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা ৬ টায় রাজশাহীর বড়কুঠি পয়েন্টে পানির উচ্চতা পাওয়া গেছে ১৭ দশমিক ৬৪ মিটার। পূর্ববর্তী ২৪ ঘন্টায় পানি কমেছে ১৫ সেন্টিমিটার। রাজশাহীতে পদ্মার পানির বিপদসীমা ১৮ দশমিক ৫০ মিটার।