সোনালী ডেস্ক : জনতার বিক্ষোভের মুখে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম নিহত শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের বাড়ি না ঢুকেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। গতকাল বুধবার বিকালে তিনি ফাহাদের জন্মস্থান কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার রায়ডাঙ্গা গ্রামে যান। প্রথমে তিনি ফাহাদের কবর জিয়ারত করেন। এরপর অদূরে তার বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এলাকাবাসীর ক্ষোভের মুখে পড়ে তিনি বাড়ির সামনে থেকে ফিরে আসেন। এ সময় সাংবাদিকদের সামনে পুলিশ বিক্ষুব্ধ জনতাকে লাঠিপেটা করেছে।
এদিকে আবরার ফাহাদ হত্যাকাÐের প্রতিবাদে উত্তাল আন্দোলনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে শেরেবাংলা হলের প্রভোস্টের পদ ছাড়লেন অধ্যাপক জাফর ইকবাল খান। গতকাল বুধবার বুয়েট শহিদ মিনার এলাকায় অবস্থান নিয়ে থাকা আন্দোলনকারীদের সামনে এসে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি একেএম মাসুদ শিক্ষার্থীদের এ কথা জানান। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার জন্য শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের পদত্যাগ দাবি করেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি।
জানা গেছে, গতকাল বিকাল পৌনে ৫টার দিকে বুয়েট ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম ফাহাদের গ্রাম কুষ্টিয়ার রায়ডাঙ্গার ঈদগাহ মাঠে পৌঁছান। সেখানে ফাহাদের দাদা আবদুল গফুর, বাবা বরকত উল্লাহ ও ভাই ফায়াজসহ নিহত ফাহাদের কবর জিয়ারত করেন এবং স্বজনদের সান্ত¡না দেন। এরপর তিনি অদূরে ফাহাদের বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা দেন তার মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য। কিন্তু বাড়ির সামনে গিয়ে তিনি জনতার ক্ষোভের মুখে পড়েন। এক পর্যায়ে পুলিশ বিক্ষুব্ধ জনতাকে লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে। এরপর ভিসি সাইফুল দ্রæত সেখান থেকে কুষ্টিয়া সার্কিট হাউসে চলে আসেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক আবরার হোসেন, পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সদর উদ্দিন খান, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম প্রমুখ।
এদিকে, গ্রামবাসীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় আবরারের ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফায়াজ ছাড়াও তার ফুপাতো ভাইয়ের স্ত্রী ও আরও একজন নারী আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বুয়েট উপাচার্যকে ‘এখন কেন আসছে, এত দেরি করে’ নিহত ফাহাদের ভাই ফায়াজের এমন প্রশ্ন করার সময় পুলিশ তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। আবরারের ছোট ভাই ফায়াজ অভিযোগ করে বলে, আমার গায়ে হাত দিয়েছে। বুকে গুতো মেরেছে। কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান নিজে আমাকে মেরেছে। আমার এক ভাইকে পিটিয়ে মেরেছে, এবার পুলিশ কী আমাকে মারবে? এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত ফাহাদের ভাই ফায়াজকে পেটানোর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, পুলিশ কেন মারবে ফায়াজকে। এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। এ অভিযোগ ভিত্তিহীন। সেখানে মিডিয়ার লোকজন ছিল। তাদের ক্যামেরার ভিডিওগুলো দেখেন। তাহলেই বোঝা যাবে মেরেছে কী মারেনি।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি একেএম মাসুদ শেরে বাংলা হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক জাফর ইকবাল খানের পদ ছাড়ার খবর জানান। তিনি বলেন, উপাচার্যেরও পদত্যাগের দাবির বিষয়ে শিক্ষক সমিতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বুয়েটে আগের বিভিন্ন ঘটনায় ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে আজকের এই অবস্থা হয়েছে। আমরা তাকে এসব ঘটনার জন্য দায়ী করছি। তাকে বুয়েট থেকে পদত্যাগ করতে হবে। আমরা পদত্যাগ দাবি করছি। তিনি যদি পদত্যাগ না করেন, সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে তাকে যেন অপসারণ করা হয়।
এর আগে সকাল ১০টা ধেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত জরুরি সভায় বসে শিক্ষক সমিতি। এদিকে, আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় ব্যর্থতার দায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ পুরো প্রশাসনের অপসারণ চেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাক্তন ছাত্রদের সমিতি। সকালে বুয়েট খেলার মাঠে জরুরি বৈঠক থেকে হত্যাকাÐের সুষ্ঠু বিচারের জন্য সাত দফা দাবি জানায় বুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। বৈঠকের পর সমিতির সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর এক বিবৃতিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, বুয়েট অ্যালামনাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে এই নির্মম হত্যকাÐ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দীর্ঘদিনের নির্লিপ্ততা, অব্যবস্থাপনা ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চ‚ড়ান্ত ব্যর্থতার ফল। অতীতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অপরাধ কার্যক্রমের তদন্ত, বিচার ও শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে উপাচার্যসহ বুয়েট প্রশাসনের ধারাবাহিক অবহেলা ও ব্যর্থতা এই নির্মম হত্যাকাÐে মদদ জুগিয়েছে। সমিতির ৭ দফা দাবি হলো অনতিবিলম্বে আবরার ফাহাদ হত্যার সঙ্গে জড়িত সবাইকে বিশেষ বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় এনে দ্রæত সময়ে বিচার করতে হবে। হত্যাকাÐের সঙ্গে জড়িত সব ছাত্রকে অনতিবিলম্বে বুয়েট থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করতে হবে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গসংগঠনভিত্তিক ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারীদের সব রাজনৈতিক কর্মকাÐ নিষিদ্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ঐতিহ্যের পরিপন্থী যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও প্রভাবমুক্ত রাখবার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। অবিলম্বে উপাচার্যের অপসারণসহ প্রশাসনের আমূল পরিবর্তন করে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের মান অতীতের মতো সমুন্নত রাখতে সুযোগ্য নির্ভীক ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের পদায়ন করতে হবে। র‌্যাগিং এবং অন্যান্য অযুহাতে ছাত্র-ছাত্রী নির্যাতন নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হব। আবরার হত্যাসহ ইতোপূর্বে সংগঠিত অন্যান্য ছাত্র নির্যাতনের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ বিচারকাজ অবিলম্বে সম্পন্ন করতে হবে, উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে, আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় আরও তিন শিক্ষাথীর পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। দশ দিন করে রিমান্ড আবেদনের শুনানি শেষে গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম মো. তোফাজ্জল হোসেন এ রিমান্ডে আদেশ দেন। রিমান্ডে যাওয়া আসামিরা হলেন, মো. মনিরুজ্জামান মনির (২১), আকাশ হোসেন (২১) ও সামছুল আরেফিন রাফাত (২১)।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির পুলিশ পরির্দশক (নিরস্ত্র) মো. ওয়াহিদুজ্জামান এ রিমান্ড আবেদন করেন। এর আগে এই মামলায় ছাত্রলীগের ১০ নেতাকর্মী পাঁচ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।
একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে গত রবিবার গভীর রাতে আবরার ফাহাদকে ডেকে নিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাকে বেধড়ক পিটিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ ১৯ জনকে আসামি করে গত সোমবার সন্ধ্যায় চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। এই মামলায় এখন পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের প্রায় সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।