এফএনএস: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে (২১) পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গতকাল সোমবার ভোরে শেরেবাংলা হল থেকে উদ্ধার করা হয় ফাহাদের লাশ। আবরার ফাহাদ ইলেকট্রিক্যাল এবং ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র ছিলেন। তিনি শেরেবাংলা হলেই থাকতেন। আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ মোট নয় জনকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, আটকদের সবাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।
গতকাল সোমবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তিন দফায় তাদের আটক করা হয়। আটকদের মধ্যে ছয়জনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন- বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, সহ-সভাপতি মুস্তাকিম ফুয়াদ, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার ও ছাত্রলীগকর্মী বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র তানভীরুল আবেদীন ইথান ও জিসান। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম-কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, বুয়েট শিক্ষার্থী ফাহাদ হত্যার ঘটনায় মোট ছয়জনকে শনাক্ত করা হয়েছে।
তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এদিকে সন্ধ্যায় বুয়েট ক্যাম্পাসে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় বলেন, বুয়েট শিক্ষার্থী ফাহাদ হত্যার ঘটনায় মোট নয়জনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সিসিটিভির ফুটেজ দেখে জড়িত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় ফাহাদের বাবা বাদী হয়ে থানায় মামলা করবেন বলেও জানান তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, প্রাথমিক তদন্তে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছি। আমরা যতগুলো সিসিটিভির ফুটেজ আছে, সব সংগ্রহ করেছি। ফুটেজগুলো অত্যন্ত স্বচ্ছ। কৃষ্ণপদ রায় আরো বলেন, এ হত্যায় যারা জড়িত, তাদের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কে কোন দলের, এসব বিবেচনায় আসবে না।
এদিকে, আবরার ফাহাদকে হলের কক্ষে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ছাত্রলীগ। হত্যার ঘটনায় যারা জড়িত তাদেরকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হবে বলে জানিয়েছেন ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়। গতকাল সোমবার দুপুরে এ কথা বলেন নাহিয়ান।
পরে ছাত্রলীগ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে বুয়েটের ঘটনা তদন্তে দুই সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি ইয়াজ আল রিয়াদ ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক আসিফ তালুকদার। তদন্ত কমিটির সদস্যদের আগামি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় দপ্তর সেলে জমা দিতে বলা হয়েছে। ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, ছাত্রলীগ কখনো কোনো হত্যাকাÐের রাজনীতিতে বিশ্বাস ও সমর্থন করে না।
যারা এ ঘটনায় জড়িত তাদের অবশ্যই বহিষ্কার করা হবে। এবং প্রশাসন যাতে সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করতে পারে সে সহযোগিতা করা হবে। নাহিয়ান নিহত আবরার ফাহাদের পরিবার ও সহপাঠীদের প্রতি সমবেদনা জানান। এদিকে, তদন্ত কমিটির সদস্য আসিফ তালুকদার বলেন, আমরা ঘটনার তদন্ত করছি। ছাত্রলীগের অনেকের বিরুদ্ধে জড়িত থাকার বিষয়ে জানতে পেরেছি। যথা সময়ের মধ্যেই আমরা আমাদের প্রতিবেদন জমা দেব।
এদিকে শক্ত লাঠি দিয়ে আঘাতের ফলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিন মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ। গতকাল সোমবার বিকেলে ৪টার দিকে এ কথা জানান তিনি। ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি আবরারের মাথা, পায়ে ও হাতে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। শক্ত লাঠি দ্বারা আঘাতের ফলে তাঁর মৃত্যু হয়। এক কথায় তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনামতে, গত রোববার রাতে শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরার ফাহাদকে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে এনে জেরা করেন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা। তাঁরা শিবির সন্দেহে আবরার ফাহাদকে বেধড়ক পেটান। ওই সময় বুয়েট ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক উপসম্পাদক ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র অমিত সাহা, উপদপ্তর সম্পাদক ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র মুজতবা রাফিদ, সমাজসেবাবিষয়ক উপসম্পাদক ও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র ইফতি মোশারফ ওরফে সকালসহ তৃতীয় বর্ষের আরো কয়েকজন শিক্ষার্থী ছিলেন। পরে ওই কক্ষে দ্বিতীয় দফা আবরারকে পেটানো হয়।
ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক ও নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একই বর্ষের মেফতাহুল ইসলাম জিয়নসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। রাত ৩টার দিকে আবরারকে মৃত ঘোষণা করেন বুয়েটের চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মো. মাশুক এলাহী। মারধরের সময় ওই কক্ষে উপস্থিত ছিলেন বুয়েট ছাত্রলীগের সহসম্পাদক আশিকুল ইসলাম বিটু। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আবরারকে শিবির সন্দেহে রাত ৮টার দিকে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে আনা হয়। সেখানে আমরা তাঁর মোবাইল ফোনে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার চেক করি।
ফেসবুকে বিতর্কিত কিছু পেজে তাঁর লাইক দেওয়ার প্রমাণ পাই। সে কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগও করেছে। শিবির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাই। আবরারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন বুয়েট ছাত্রলীগের উপদপ্তর সম্পাদক ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুজতবা রাফিদ, উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল ও উপ-আইন সম্পাদক অমিত সাহা। প্রমাণ পাওয়ার পর চতুর্থ বর্ষের ভাইদের খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে বুয়েট ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার সেখানে আসেন। একপর্যায়ে আমি রুম থেকে বের হয়ে আসি।
এরপর হয়তো ওরা মারধর করে থাকতে পারে। পরে রাত ৩টার দিকে শুনি আবরার মারা গেছে। বুয়েটের শেরেবাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল বলেন, আমরা সিসিটিভির ফুটেজ দেখছি। ঘটনায় কারা জড়িত, তা শনাক্ত করা হচ্ছে। হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থী সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৫ ব্যাচের হাসিবুর রহমান বলেন, সে খুবই ভদ্র ছেলে। পড়ালেখা ছাড়া কিছুই বুঝত না।
আবরার ফাহাদের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গায়। তবে কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই রোডে তাঁর বাবা-মা ও ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ থাকেন। আবরারের বাবার নাম বরকত উল্লাহ। আবরার ফাহাদের মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েছে স্বজনরা। মা ছালেহা খাতুন মানতেই পারছেন না তাঁর ছেলে আর নেই। ছেলের কথা মনে করে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি। আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ শোকে পাথর হয়েছিলেন। বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তাঁর ভাই আর নেই। গত রোববার রাতে ছেলে আবরার ফাহাদকে ফোন দিয়েছিলেন তাঁর মা ছালেহা। আবরার ধরেননি। এর কিছুক্ষণ পরই শোনেন ছেলে অসুস্থ, তাঁর কিছুক্ষণ পরে শোনেন ছেলে আর নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, স্কুলজীবন থেকেই আবরার মেধাবী।
কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আবরারের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ বলেন, কাল রাতে ভাইয়ার মোবাইল ফোনে কয়েক বার ফোন দেওয়া হয়। ফোন না ধরায় টেনশন হচ্ছিল। সকালে ভাইয়ার রুমমেট হয়তো ফোন করে বলে যে ফাহাদ অসুস্থ, ঢাকায় কেউ থাকলে আসতে বলেন। একটু পরে ফোন করে বলে যে ফাহাদ আর নেই। তারপর ঢাকায় আমার আত্মীয়রা গিয়ে ব্যাপারটি নিশ্চিত করেছে। ভাইয়া সব সময় পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। সেভাবে কারো সঙ্গেই মিশতেন না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। রাজনৈতিক কোনো কিছুর মধ্যে ছিলেন না। জামায়াত বা শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। ইসলামি উগ্রবাদী কারো সঙ্গেও তিনি ছিলেন না।
অনেক ছেলেই তো ছিল, তাঁকে রুম থেকে নিয়ে গেল, পেটানো হলো সেটা কেউ দেখতে পেল না? বলছিলেন আবরার ফাইয়াজ। এদিকে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল সোমবার দুপুরে ঢাবির ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) রাজু ভাস্কর্যের সামনে প্রথমে মানববন্ধন করা হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকশ শিক্ষার্থী। মিছিলটি বুয়েট ক্যাম্পাসে গিয়ে শেষ হয়। মিছিল থেকে আবরার ফাহাদ হত্যায় কারা জড়িত, তা খুঁজে বের করে দ্রæত আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
হত্যার জন্য বুয়েট ছাত্রলীগকে দায়ী করে শিক্ষার্থীরা বলেন, ভিন্নমত পোষণ করায় কাউকে হত্যা করা কোনোভাবে মানা যায় না।
আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ-মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। গতকাল সোমবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সমাবেশ করেন তারা। এতে বক্তব্য রাখেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) হাফিজুর রহমান, বুয়েট ছাত্রদলের সভাপতি শাফিউল মুসাব্বির শাফি প্রমুখ। বক্তরা বলেন, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার হত্যায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত বিচার করতে হবে। এসময় সব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু পুরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তারা।
এদিকে, গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় দেখা যায় আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় শেরে বাংলা হলে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। আইন-শৃঙ্খলার রক্ষকারী বাহিনীর পাশপাশি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাও (ডিবি, সিআইডি, পিবিআই) আলামত সংগ্রহ করছিলেন। এছাড়া হলের অভ্যন্তরে হত্যাকাÐ সংঘটিত হলেও ক্যাম্পাসে আসেননি উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। শিক্ষার্থীরা হল প্রভোস্ট অধ্যাপক জাফর ইকবাল খানকে এ নিয়ে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন। সিসিটিভির ফুটেজ না দেখা পর্যন্ত তারা অবস্থান করার ঘোষণা দেন।