এফএনএস: রংপুর মেডিকেল কলেজের উপকরণ ক্রয়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে রংপুর মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডাক্তার মুহাম্মদ নূর ইসলাম এবং মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার সারোয়াত হোসেন সহ ৬ জনকে আসামী করে দূর্নীতি দমন কমিশন দুদক মামলা দায়ের করেছে। মামলার অন্যন্য আসামীরা হচ্ছে, মালামাল সরবরাহের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল সায়েন্টিফিক এন্ড সার্জিকেল কোম্পানীর স্বত্বাধিকারী জাহের উদ্দিন সরকার, বেঙ্গল সায়েন্টিফিক এন্ড সার্জিকেল কোম্পানীর স্বত্বাধিকারীর পিতা আব্দুস সাত্তার, পুত্র আহসান হাবিব এবং ভগ্নিপতি আসাদুর রহমান। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে- আসামীরা পরস্পরের যোগশাজশে গত বছরের ২১ মার্চ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ব্যপক দুনর্িিতর আশ্রয় নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজের বিভিন্ন উপকরন ক্রয়ের নামে সাড়ে ৪ কোটি টাকা আতœসাৎ করেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি তদন্ত কমিটি রমেকের তৎকালীন টেন্ডার কমিটির বিরুদ্ধে তদন্ত করে এই সাড়ে ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমান পেয়েছে। দূর্নীতি দমন কমিশন দুদক এর প্রেক্ষিতে গত ৩রা অক্টেবর বৃহস্পতিবার দুদুক রংপুর সমন্বিত কার্যালয়ে এ মামলা দায়ের করেন দুদক ঢাকা অফিসের উপ সহকারী পরিচালক ফেরদৌস রহমান। অভিযোগে বলা হয়, আসামীরা পারস্পারিক যোগসাজসের মাধ্যমে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন উপকরন ক্রয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সহ আসামীরা পরস্পরে যোগশাজস করে দরপত্রে উপকরণের মূল্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে নি¤œমানের মালামাল উচ্চ মুল্যে ক্রয় দেখায়। এছাড়া অনেক মালামাল ক্রয় না করেই ভুয়া বিল ভাউচার বানিয়ে বিপুল পরিমান সরকারী অর্থ আতœসাত করেন। এই অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় ৬ জনকে আাসামী করা হয়। দুদক উপ পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্রার্চায বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে স্বাস্থ্য অধিদফতর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সচেতন নাগরিক সমাজের সভাপতি অধ্যাপক একেএম হাবিবুল্লাহর অভিযোগের ভিত্তিতে এ তদন্ত করা হয় বলে রমেক সূত্রে জানা গেছে।
প্রাপ্ত অভিযোগে জানা গেছে, রংপুর মেডিকেল কলেজ রমেক এর ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড আদারস ইন্সট্রুমেন্টসহ প্রায় ৫ কোটি টাকার উপকরণ দরপত্রের মাধ্যমে ক্রয় করা হয়। পারস্পারিক যোগসাজসের মাধ্যমে এই দরপত্রে প্রতিটি পণ্যের মূল্য ৪/৫ গুণ বাড়িয়ে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত বিল উত্তোলন করে। টেন্ডারে অংশ গ্রহনকারী ৩টি কোম্পানীর মধ্যে সর্বনি¤œ দরদাতা হিসেবে বেঙ্গল সায়েন্টিফিক এন্ড সার্জিকেল কোম্পানীকে এই কার্যাদেশ দেয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, অতি গোপনীয়তার সাথে ঐ দরপত্রে কাটাকাটি করে বেঙ্গল সায়েন্টিফিক এন্ড সার্জিকেল কোম্পানীকে সর্বনি¤œ দরদাতা বানানো হয়েছে। সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই টেন্ডারে জেনারেল কোম্পানীর ২ টন ক্ষমতা সম্পন্ন ৩২টি এসি কেনা হয়েছে যার প্রতিটির মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা দরে। অথচ এর প্রতিটির প্রকৃত বাজার মূল্য হচ্ছে ৯০ হাজার টাকা। এছাড়া, ”ইমুন্যাসেসারী এ্যনালাইজার” মেশীন টেন্ডারে ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে এক কোটি টাকা । যার প্রকৃত বাজার মূল্য ২০ লাখ টাকা। ”বায়োকেমিষ্ট্রি এ্যনালাইজার” মেশীন টেন্ডারে ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা । এর প্রকৃত বাজার মূল্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। ’ডায়াথারমি” মেশিন টেন্ডারে ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা । এর প্রকৃত বাজার মূল্য হচ্ছে ১০ লাখ টাকা। ”ভিডিও এ্যনডোসকপি” মেশিন টেন্ডারে ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে এক কোটি ৩৭ লাখ টাকা। যার প্রকৃত বাজার মূল্য মাত্র ৩৫ লাখ টাকা। ”আলট্রাসাউন্ড মেশিন ফর ফিজিওথেরাপির” টেন্ডারে ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ৬৬ হাজার ৫০০ টাকা। যার প্রকৃত বাজার মূল্য ৪ লাখ টাকা। ”শর্ট ওয়েভ মেশিন ফর ফিজিওথেরাপি” এর টেন্ডারে ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ৬১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। যার প্রকৃত বাজার মূল্য ১২ লাখ টাকা। ”বায়োলজিক্যাল মাইক্রোস্কপ” এর টেন্ডারে ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে এক লাখ ৫৫ হাজার টাকা। এর প্রকৃত বাজার মূল্য ৫৫ হাজার টাকা। ”ইলেক্ট্রোরাইট এ্যনালাইজার’ মেশিনের টেন্ডারের ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এর প্রকৃত বাজার মূল্য হচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই টেন্ডারে সীমাহীন জালিয়াতীর মাধ্যমে মোট ৩ কোটি ২৪ লাখ ৮৯ হাজার ৫শ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। আল আরাফাহ ইন্টারন্যাশনালসহ মেডিকেলের যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে রংপুর মেডিকেল কলেজে সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতিগুলোর কোম্পানী ও মডেল নম্বর অনুযায়ী প্রকৃত মূল্য জানা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, রমেক ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড আদারস ইন্সট্রুমেন্ট, কেমিকেল অ্যান্ড রিএজেন্ট (এমএসআর) ও ইন্সট্রুমেন্ট ক্রয়ের লক্ষ্যে একটি দরপত্র কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে সচেতন নাগরিক সমাজের সভাপতি অধ্যাপক এ.কে.এম হাবিবুল্লাহ স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ করেন। এর প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদফতর গত ২৬ মে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এ ব্যাপারে রমেকের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডাক্তার নূর ইসলাম জানান, নিয়ম মেনে টেন্ডারের মাধ্যমে উপকরণ কেনা হয়েছে। টেন্ডার কমিটির পক্ষ থেকে কোনো দুর্নীতি করা হয়নি। অধ্যক্ষ বলেন, টেন্ডারের আগে মূল্য যাচাই কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা বাজার দেখে মূল্য নির্ধারণ করেছে। মূল্য যাচাই কমিটির আহবায়ক ডাক্তার হৃদয় রঞ্জন রায় জানান, রংপুর এবং ঢাকার বাজার যাচাই করে তারা যন্ত্রপাতিগুলোর প্রকৃত সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণ করে টেন্ডার কমিটির কাছে জমা দিয়েছেন। তাঁদের প্রদত্ত ক্রয় মূল্য আর টেন্ডারের ক্রয় মূল্য এক কিনা সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। এসব অনিয়মের মাধ্যমে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবের কারণে টেন্ডার কমিটির কোন কোন সদস্য এই কর্মকান্ডে অংশ নেননি এবং কাগজ-পত্রে স্বাক্ষরও করেননি বলে জানা গেছে। রমেক এর একজন শিক্ষক জানান, এ টেন্ডারে এমন কিছু যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে যা মেডিকেল কলেজে প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ওসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। তাছাড়া, যে ডিপার্টমেন্টের যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে সেই ডিপার্টমেন্টের কোন শিক্ষককে কমিটিতে রাখা হয়নি। আবার, ভিন্ন ডিপার্টমেন্টের একজন শিক্ষককে ৩ টি কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে রাখা হয়েছে। রমেক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড আদারস ইন্সট্রুমেন্ট ক্রয়ের লক্ষ্যে গঠিত সাত সদস্য বিশিষ্ট দরপত্র কমিটির সভাপতি ছিলেন রমেক এর তৎকালীন অধ্যক্ষ নূর ইসলাম । ২০১৮ সালের ৮ই এপ্রিল ঐ টেন্ডার কমিটি গঠন করে দরপত্র আহবান করা হয়। এর পর ৫ই মে টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং ৭ই জুন টেন্ডার খোলা হয়।