তৈয়বুর রহমান : আবাসন ও কর্মসংস্থান সংকটে নগরীর হরিজন পল্লীর বাসিন্দারা। সরকার ও সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন বিদেশি সংস্থার পক্ষ থেকে আবাসন সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেও দীর্ঘ ১১ বছরেও এ সমস্যার সমাধান হয়নি।
গতকাল রোববার হরিজনদের অবস্থা সম্পর্কে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে উক্ত পল্লীবাসীর পক্ষ থেকে এ অভিযোগ করা হয়।
রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ২০ বিঘা জমির ওপর হেতম খান হরিজন পল্লীটি অবস্থিত। সেখানে ২৫০টি পরিবারের প্রায় তিন হাজার হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে। একই পরিবারে ৫ জন থেকে ২২ জন একই বাড়িতে গাদাগাদি করে অতিকষ্টে বসবাস করে। এ পল্লীর বাসিন্দারা বংশ পরম্পরায় তার পূর্বপুরুষদের বাস্তুভিটার একই অবস্থায় বসবাস করছে। এ সমস্যা এখন এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, একান্নবর্তী পরিবারে অধিকাংশ সময় ঘরে কাপড় টাঙিয়ে রাতে ঘুমাতে যেতে হয়।
এই আবাসন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে রাসিক মেয়রসহ রাজশাহীর সকল স্তরের নেতৃত্বের কাছে ধর্না দিয়েও কাজ হয়নি বলে অভিযোগ করলেন রাজশাহী হরিজন ঐক্য পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি শ্রী হরিলাল। তিনি বলেন, তাদের আবাসন সমস্যা দীর্ঘদিনের। ২০০৮ সালে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবার পর হরিজন পল্লীতে এক বিদেশি সংস্থাকে নিয়ে আসেন হরিজনদের আবাসন সমস্যার কথা তুলে ধরতে। উক্ত বিদেশি সংস্থা আবাসন সংকট সমাধানের আশ্বাসও দেয়। এরপর দীর্ঘ ১১ বছর পার হয়ে গেছে এ সমস্যার সমাধান হয়নি এখনও। এ অবস্থায় বর্ষাকালে বৃষ্টি এবং গ্রীষ্মকালে প্রখর রোদের তাপে টিনের ঘরে বসবাস করে আসছে তারা।
রাজশাহীর হরিজনদের আরেক সমস্যা হচ্ছে কর্মস্থানের সংকট। পেশাগত কারণে তারা অবহেলার স্বীকার হন পদে পদে। অফিস আদালত ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে তাদের গুরুত্ব দেয়া হয় না। এ কারণে দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকলেও কোন অফিসে কাজ দেয়া হয় না তাদের। পেশাগত কারণে তারা সকল সুযোগ ও অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে পদে পদে।
হরিজন পল্লীর শর্মা বলেন, আমরা রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনসহ নগরীর বিভিন্ন অফিস আদালতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করে জীবন ধারণ করে থাকি। আমাদের কাজের স্থায়ীত্ব কম। ঐসব প্রতিষ্ঠানের মালিক ও অফিসারদের কথার ওপর তাদের চাকরি থাকে এবং চলেও যায়। সব সময় অনিশ্চয়তার মাঝে তাদের চাকরি করতে হয়। আমাদের জীবন এতটাই অনিশ্চিত ও অপরিচ্ছন্নতায় ভরা।
ইতোমধ্যে হরিজনদের মাঝে অনেকে শিক্ষিত হয়েছে। এরপর তারা চাকরি-বাকরির ক্ষেত্রে সুযোগ পাচ্ছে না। এ ব্যর্থতার কারণে অনেকেই হতাশা প্রকাশ ভুগছেন। এ হতাশার কারণে তাদের মাঝে শিক্ষাবিমুখতা দেখা দিয়েছে। সেখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও অবস্থা খুবই করুণ। সেখানে ৫জন শিক্ষক থাকলেও ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী আছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ জন।
শ্রী হরিলাল আরও বলেন, হরিজন পল্লীতে আলোচনা ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান করার মাঠ ছিল না রাজশাহী সদর আসনের সংসদ ফজলে হোসেন বাদশা তার নিজস্ব ফান্ড থেকে সে জায়গাটি বাঁধিয়ে দেন। সে স্থানটি বাঁধিয়ে দেয়ার ফলে হরিজন পল্লীর বাসিন্দারা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করতে পারছেন। সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা এর পার্শ্ববর্তী পুকুরটি যেন হরিজন পল্লীবাসী ভালভাবে ব্যবহার করতে পারেন এর জন্য পুকুরটি বাঁধার ব্যবস্থা করেন।
হেতম খান হরিজন পল্লীর আবাসন সমস্যা সমাধানে রাসিকের কোন পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাওয়া হলে রাসিকের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক বলেন, আগামি অর্থ বছরে হেতম খান হরিজন পল্লীতে উন্নত ধরনের ঘরবাড়ি নির্মাণ করে হরিজনদের আবাসন সমস্যার সমাধান করা হবে।
এদিকে, নগরীর আ্ইডি সংলগ আপরেকটি হরিজনপল্লী। সেখানে নিজস্ব জমির ওপর বসবাস করে আসছেন প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার হরিজন রবিদাস ডোম সম্প্রদায়। তাদের পেশা হচ্ছে ডোমের ও মুচির কাজ করা। তাদের কাজেও কিছুটা ভিন্নতা আছে। কিন্তু তাদের সমস্যার কোন ভিন্নতা নেই। তাদের সমস্যাও একই ধরনের। সেখানকার মুচি সম্প্রদায়ের দিলিপ বলেন, এখানে বড় সমস্যা হচ্ছে মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য। মাদক ব্যবসায়ীরা বাইরে থেকে এসে এ পল্লীতে মাদক কেনাবেচা করে। কিছু বললেই পাড়ার হরিজনদের ওপর নির্যাতন করে। প্রতিবাদ করলে নেমে আসে নির্যাতন। এর প্রতিকার চেয়েও কোন প্রতিকার পান না তারা।
দেশের পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠী হচ্ছে হরিজন সম্প্রদায়। তারা সমাজের সব থেকে অবহেলিত। সকল প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে টিকে আছে তারা। সমাজকে এগিয়ে নিতে তাদের একটি গুরুত্বপূণ্য ভূমিকা রয়েছে। তারাও সভ্য সমাজের ¯্রােষ্ঠা। যে শ্রম দিয়ে সভ্য সমাজ সৃষ্টি তাতে তাদের ভূমিকা কোন ভাবে ফেলে দেবার নয়। কিন্তু এরপরও তারা সমাজের সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত। যে চেতনাকে ধারণ করে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। এ মুক্তিযুদ্ধে তাদের ত্যাগও কম ছিল না। সেই চেতনা সুফল থেকে তারা এখন অনেক দূরে।
দেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে। তারা এখন আর পিছিয়ে থাকতে চায় না। তারা এগিয়ে যাবার জন্য,শিক্ষিত হয়ে অন্যান্য সম্প্রদায়ের সমকক্ষ হয়ে বেঁচে থাকার জন্য সবজিপাড়া হরিজনপল্লীতে গড়ে তুলেছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়, তাদের নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে নিতে এ উদ্যোগ। বললেন ঐ পাড়ারই শিক্ষিতা নারী রাধা রানী।