সোনালী ডেস্ক: রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও পাবনায় পদ্মা-মহানন্দার পানি আরও কমে গিয়ে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বন্যা দুর্গত এলাকার কোথাও কোথাও ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। ফলে দুর্গতরা শুকনা খাবার, খাবার পানি ও গো-খাদ্যের সক্সকটে পড়েছে। বন্যার পানি কমতে শুরু করায় পদ্মা ও মহানন্দা তীরবর্তী এলাকায় দেখা দিয়েছে ভাঙন আতক্সক। নদীপাড়ের মানুষ তাদের বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশক্সকায় দিনাতিপাত করছেন।
চারঘাট প্রতিনিধি জানান, গত ছয় দিনে যে হারে পদ্মার পানি বৃদ্ধি পেয়েছিল তাতে নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ আতঙ্কে ছিল। শুক্রবার থেকে পদ্মার পানি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে এমন তথ্য জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শনিবার দুপুরে টাঙ্গন এলাকায় নদী ভাঙন দেখা গেছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে সরজমিনে গেলে দেখা যায়, নদী ভাঙন তেমন শুরু হয়নি। টাঙ্গন গ্রামের সমচান আলীর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, মধ্যপাড়া মসজিদটি প্রায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। পদ্মার পানি নামার সাথে সাথে প্রতিবছর যেভাবে নদী ভাঙন দেখা দেয়, এ বছর তার চেয়ে বেশি ভাঙন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একই এলাকার আরিফুল ইসলাম মাখনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, হয়তো নদী ভাঙন অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে। কারণ পদ্মার পানি নামার সাথে সাথে নদী ভাঙন শুরু হয়। মাখন আরও বলেন, এর আগে যে ভাঙন দেখা দিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড সেখানে জিও ব্যাগ ফেলে আপাতত প্রতিরোধ করেছে। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ শাহিদুল আলম বলেন, এরই মধ্যে টাঙ্গন ও রাওথা এলাকায় কিছু জিও ব্যাগ ফেলে আপাতত ভাঙন প্রতিরোধ করা হচ্ছে। নদীভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করলে তা প্রতিরোধের জন্য আমরা সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছি। তিনি আরও বলেন, এ পর্যন্ত পদ্মার পানি ৫ সে.মি. হ্রাস পেয়েছে। তবে দু একদিনের মধ্যে পানি আরও কমতে পারে বলে আশা করা যাচ্ছে।
বাঘা প্রতিনিধি জানান, শনিবার থেকে বাঘায় পদ্মার পানি পানি কমতে শুরু করেছে। বন্যার ফলে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে চকরাজাপুর ইউনিয়নের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, ঘর-বাড়িসহ কয়েক হাজার আবাদি-অনাবাদি জমি ও গাছ-পালা। ভিটে-মাটি হারিয়ে পথে বসেছে প্রায় দুই শতাধিক পরিবার। পানিবন্দি হয়ে মানবেতার জীবনযাপন করছে চকরাজাপুর ইউনিয়নের ১৫টি চরের প্রায় ২০ হাজার মানুষ। এলাকায় গো-খাদ্যের সক্সকট দেখা দিয়েছে। চকরাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আজিজুল আযম বলেন, চকরাজাপুর ইউনিয়নের পদ্মানদীর মধ্যে থাকা ১৫টি চর রয়েছে। এ চরের ১ হাজার ৮ শ পরিবার গত ২ সপ্তাহ থেকে পানিবন্দি রয়েছে। ইতোমধ্যে বাঘা বাঁধের একাংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিন রেজা বলেন, নদীতে হঠাৎ পানি বেড়ে যাওয়ায় এই তিনটি ইউনিয়নের মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। প্রতিনিয়ত তাদের খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। শনিবার শতাধিক পরিবারকে বন্ধু চুলা প্রদান করা হয়। শনিবার চকরাজাপুর, পাকুড়িয়া, গড়গড়ি ইউনিয়নে চর অঞ্চলে বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের পিএস ও উপ-সচিব গোলাম মওলা।
গোদাগাড়ী প্রতিনিধি জানান, গোদাগাড়ীতে পদ্মা ও মহানন্দায় নদীতে পানি কমেছে। রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিস সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা ও মহানন্দা নদীতে ৬ সেন্টিমিটার পানি কমেছে। শনিবার সকাল থেকে পদ্মানদীর পানি বিপদসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী (অ. দা.) সৈয়দ সাহিদুল আলম বলেন, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ভারি বর্ষণ না হলে পানি আস্তে আস্তে নেমে যাবে। উপজেলার চরআষাঢ়িয়াদহ ইউনিয়নের চর নওশেরা, হুমন্তনগর, নতুনপাড়া, আমতলা, খাসমহল, বারিনগর, চরবয়ারমারী, চরবাসুদেবপুর ইউনিয়নের হাতনাবাদ, গোগ্রাম ইউনিয়নের নিমতলা, আলীপুর, দেওপাড়া ইউনিয়নের খরচাকা, মোল্লাপাড়া গ্রাম, ফরাদপুর, হরিশংকর, প্রেমতলী, পৌর এলাকার কলেজপাড়া, গাঙ্গোবাড়ী, মাদারপুর এলাকা বন্যায় কবলিত হয়েছে। সঠিক ক্ষতির পরিমাণ জানা না গেলেও ৭০ হেক্টর জমির টমেটো, ৬০ হেক্টর মাসকলাই ও ২০ হেক্টর জমির শাক-সবজির জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ফসল নষ্ট হয়েছে। নদী ভাঙনের ৭৬টি বাড়ি-ঘর সম্পূর্ণ পদ্মায় বিলীন হওয়ায় এসব মানুষ রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। ভাঙনের মুখে দিয়াড় মানিকচক বোয়ালমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফ্লাট সেন্টারসহ ৩টি গ্রামের ২ শতাধিক বাড়ি-ঘর থেকে আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়েছে লোকজন। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল বাসির বলেন, বন্যা কবলিত এলাকার ইউপি চেয়ারম্যানদের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করতে বলা হয়েছে। সে তালিকা হাতেই পেলেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যুরো জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা ও মহানন্দা নদীতে পানি হ্রাস অব্যাহত থাকায় জেলার বন্যা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে শুরু করেছে। তবে বন্যা কবলিত এলাকার পানি খুব ধীরে ধীরে নামছে। এদিকে বন্যা কবলিত এলাকায় ত্রাণ অপ্রতুল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহিদুল আলম জানান, পদ্মায় গত ২৪ ঘণ্টায় .৫ সেন্টিমিটার পানি কমে বিপদসীমার .৩৮ সেন্টিমিটার (বিপদসীমা ২২.৫০ সেমি) এবং মহানন্দায় গত ২৪ ঘন্টায় .৪ সেন্টিমিটার পানি কমে বিপদসীমার .২৬ সেন্টিমিটার (বিপদসীমা ২১ সেমি) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, দুটি নদীর পানি ধীরে নামায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতিও হচ্ছে ধীরে ধীরে। এ পর্যন্ত সদর, গোমস্তাপুর ও শিবগঞ্জ উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত পানিবন্দি মানুষের মধ্যে খাদ্য, শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং গো-খাদ্যের অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আলমগীর হোসেন জানান, পদ্মায় পানি কমতে শুরু করেছে। সদর উপজেলার বন্যা কবলিত ৮টি ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে এ পর্যন্ত ৪৯ মে. টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, এ উপজেলার পাঁকা, উজিরপুর, দুর্লভপুর ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত ৭৬ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি জানান, লালপুরে পদ্মায় বন্যার পানি কমছে। ক্ষতির আশংকা বাড়ছে। উপজেলার চরাঞ্চলের বন্যাকবলিত ৪টি ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ১২ শ হেক্টর জমির আখ, সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশংকা ও গো-খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে । কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার লালপুর, ঈশ্বরদী, বিলমাড়ীয়া ও দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের চরজাজিরা, বাকনাই, নওসারা সুলতানপুর, দিয়াড়শঙ্করপুর, চাকলা বিনোদপুর, আরাজি রসুলপুর, বন্দোবস্ত গোবিন্দপুর ও লালপুর চরের শীতকালীন আগাম সবজি ও মাষকলাইয়ের ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়াও গবাদিপশুর খাদ্য নিয়ে বিপাকে পড়েছে বন্যাকবলিত মানুষ।
শনিবার পদ্মানদীর চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, বন্যার পানি কিছুটা কমতে থাকলেও ফসলের মাঠজুড়ে পানি থই থই করছে। সবজি ক্ষেতের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। পেঁপে গাছের গোড়ায় পানি জমায় গাছ মরে নুয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও আখ গাছের মাথা দেখা গেলেও কলা, পেয়ারা, বরই খেত পানিতে পরিপূর্ণ। এছাড়াও লালপুরের দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের রামপাড়া ও রাধাকান্তপুর গ্রাম নতুন করে বন্যাকবলিত হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসার রফিকুল ইসলাম বলেন, ১ হাজার ৪০ হেক্টর জমির আখ সহ প্রায় সাড়ে ১২শ হেক্টর জমির সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। আখ খেতে পানি ডুকলেও পানি নেমে গেলে তা স্বাভাবিক হয়ে যাবে তবে পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা যাবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার উম্মুল বানীন দ্যুতি বলেন, আমি পদ্মার পানিতে ডুবে যাওয়া চরাঞ্চল পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে শুকনা খাবার ও চাল বিতরণ করা হয়েছে।

পাবনা প্রতিনিধি জানান, বর্তমানে পদ্মার পানি কমে বিপদসীমার ৩ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ঈশ্বরদীর পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় পানি প্রবাহ কমেছে ৫ সেন্টিমিটার। তবে ইতোমধ্যে, পদ্মা নদীবেষ্টিত পাবনার সুজানগর উপজেলার গুপিনপুর এলাকায় এলজিইডির সড়ক, স্থানীয় গোরস্থান ও ঈদগাহ মাঠ নদী ভাঙনের কবল থেকে রক্ষার জন্য আড়াই হাজার জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ। পাবনা সদরের ভাড়ারা, হেমায়েতপুর, দোগাছি ইউনিয়ন ও পাবনা সুজানগর উপজেলার ভায়না, সাতবাড়িয়া, নাজিরগঞ্জ, মানিকহাট, সাগরকান্দি ইউনিয়ন পদ্মার ভাঙনে হুমকির মুখে রয়েছে। এছাড়া ঈশ্বরদী, সুজানগর ও পাবনা সদর সদরের ভাড়ারা উপজেলায় ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। এছাড়াও ত্রাণ হিসেবে ২০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম বলেন, গত দুই দিনে পদ্মার পানি বিপদ সীমার ৮ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বর্তমানে পানি কমে বিপদসীমার ৩ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আশা করছি আগামী ২৪ ঘণ্টায় পানি বিপদসীমার নিচে নেমে আসবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড এখন ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আজহার আলী বলেন, পানি বৃদ্ধির কারণে পাবনা অঞ্চলের কৃষিতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭ কোটি টাকা। ১ হাজার ৭ শ ৩০ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। আমরা সকল কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি পানি নামার সাথে সাথে কৃষক যাতে আবার ফসল রোপণ করতে পারে সেই বিষয়ে তাদের সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করতে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। সরকারিভাবে তাদের জন্য কোন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হলে অবশ্যই তাদের নিকট খুব দ্রæত পৌঁছে দেয়া হবে।