সোনালী ডেস্ক: রাজশাহীতে পদ্মা এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা-মহানন্দা ও পুনর্ভবায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নি¤œ ও চরাঞ্চল তলিয়ে গেছে। এসব এলাকায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি জীবনযাপন করছেন। পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে পদ্মার ভাঙনে ৫ শতাধিক বাড়ি-ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
গোদাগাড়ী প্রতিনিধি জানান, ফারাক্কার সবগুলো গেট খুলে দেয়ায় পদ্মায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। শুকনো মৌসুমে পদ্মায় পানি না থাকলেও গোদাগাড়ী উপজেলার চারটি ইউনিয়ন এখন ডুবতে বসেছে উজান থেকে ধেয়ে আসা পানিতে। স্কুলসহ দুই শতাধিক ঘরবাড়ি ভাঙনের মুখে পড়েছে। বিভিন্ন চর ও নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশক্সকা দেখা দিয়েছে। ৪টি ইউনিয়নের ১২টি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি জীবনযাপন করছেন।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পদ্মায় পানি বাড়ছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর পদ্মানদীতে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছিল ১৭ দশমিক ৩৮ মিটার, ২৩ সেপ্টেম্বর ছিল ১৭ দশমিক ৫১ মিটার, ২৪ সেপ্টেম্বর ছিল ১৭ দশমিক ৬১ মিটার, ২৫ সেপ্টেম্বর ছিল ১৭ দশমিক ৬৬ মিটার, ২৬ সেপ্টেম্বর ছিল ১৭ দশমিক ৭৫ মিটার, ২৭ সেপ্টেম্বর ছিল ১৭ দশমিক ৭৯ মিটার, ২৮ সেপ্টেম্বর ছিল ১৭ দশমিক ৮৩ মিটার, ২৯ সেপ্টেম্বর ছিল ১৭ দশমিক ৮৭ মিটার ও ২৯ সেপ্টেম্বর ছিল ১৮ দশমিক শূন্য ১ মিটার, ১ অক্টোবর ১৮ দশমিক শূন্য ৪ মিটার ও বুধবার ১৮ দশমিক ১৪ মিটার। তথ্য মতে, ১৯৯৮ সালে রাজশাহীতে পদ্মার পানি বিপদসীমা (১৮.৫০) অতিক্রম করেছিল। এর মধ্যে ২০০৪-২০১২ সাল পর্যন্ত টানা ৮ বছর পদ্মার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। ২০০৩ সালে পদ্মার পানি বিপদসীমা (১৮.৫০) অতিক্রম করেছিল। সোমবার হঠাৎ করে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলা চরআষারিয়াদহ ইউনিয়নের চর নওশেরা, হুমন্তনগর, নতুনপাড়া, আমতলা খাসমহল, বারিনগর, চরবয়ারমারী, চরবাসুদেবপুর ইউনিয়নের হাতনাবাদ, গোগ্রাম ইউনিয়নের নিমতলা, আলীপুর, দেওপাড়া ইউনিয়নের খরচাকা, মোল্লাপাড়া গ্রাম বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামে বাড়ি-ঘরে বন্যার পানি ঢুকে যাওয়ায় লোকজন জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি-ঘর ছাড়ছে। বন্যার্ত মানুষ উঁচু জায়গায় স্কুল ও রাস্তার পাশে আশ্রয় নিচ্ছে। চর আষারিয়াদহ ইউনিয়ন পরিষদেও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্ বলেন, বন্যার পানিতে এ ইউনিয়নের বেশ কিছু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। তবে পদ্মানদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে গোটা ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হবে। বন্যায় সঠিক ক্ষতির পরিমাণ জানা না গেলেও ৭০ হেক্টর জমির টমেটো, ৬০ হেক্টর জমির মাসকলাই ও ২০ হেক্টর শাক-সবজির জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ফসল নষ্ট হয়েছে। নদী ভাঙনে ৭৬টি বাড়ি-ঘর সম্পূর্ণ পদ্মায় বিলীন হওয়ায় এসব মানুষ রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। ভাঙনের মুখে দিয়াড় মানিকচক বোয়ালমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফ্ল্যাট সেন্টারসহ ৩টি গ্রামের ২ শতাধিক পরিবার বাড়ি-ঘর থেকে আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছে । এদিকে একটানা বৃষ্টির পানিতে গোদাগাড়ী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিমুল আকতার বলেন, বন্যার্তদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। বন্যাকবলিত এলাকার লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্র যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহিদুল আলম বলেন, বুধবার গত ২৪ ঘণ্টায় ১০ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। বিপদসীমা অতিক্রম করলেও এখনই আশঙ্কার কিছু নেই। কারণ রাজশাহীতে পদ্মার বিপদসীমা ১৮ দশমিক ৫০ মিটার। আর শহর রক্ষা বাঁধের উচ্চতা ১৯ দশমিক ৬৭ মিটার। তাই পদ্মার পানি বাড়লেও বাঁধ নিয়ে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
বাঘা প্রতিনিধি জানান, বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর, পাকুড়িয়া, গড়গড়ি ইউনিয়নে পদ্মার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের সবকটি গেট খুলে দেয়ার পর থেকে পদ্মানদীর পানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে পদ্মানদীর তীরবর্তী এলাকার আতারপাড়া, লক্ষীনগর, চৌমাদিয়া, চকরাজাপুর, পলাশী ফতেপুর, জোতনাশি, ক্ষীনগর, পূর্ব চকরাজাপুর, পশ্চিম চরকালিদাসখালী, দিয়ার কাদিপুর, চৌমাদিয়া, আলাইপুর, পানি কামড়া, পাকুড়িয়া, কালিদাসখালী, সড়কঘাট, মুর্শিদপুর, খায়ের হাট, সরেরহাট, খানপুর, সুলতানপুর সহ নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের আতঙ্ক রাতে ঘুম হারাম হয়ে পড়েছে।
বন্যার ফলে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে চকরাজাপুর ইউনিয়নের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট বাজার, ঘর-বাড়িসহ কয়েক হাজার আবাদি-অনাবাদি জমি ও গাছ-পালা। ভিটে-মাটি হারিয়ে পথে বসেছে প্রায় ২ শতাধিক পরিবার। পানিবন্দি হয়ে মানবেতার জীবনযাপন করছে চকরাজাপুর ইউনিয়নের ১৫টি চরের প্রায় ২০ হাজার মানুষ। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ভূমিতে থাকা বসতবাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা এলাকার বাসিন্দারা অন্যত্র চলে গেছে। সেই সাথে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এসব এলাকার শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা। চকরাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আজিজুল আযম বলেন, নদী ভাঙনের বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। এছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেড় শতাধিক পরিবারকে কিছু ত্রাণ ও মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ তহবিল থেকে ৭ শতাধিক পরিবারকে ২০ কেজি করে চালসহ অন্যান্য সামগ্রী ও বৃহস্পতিবার আবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১ হাজার পরিবারের মাঝে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়। শিক্ষাথীরা স্কুলে যেতে না পারায় কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
জানা গেছে, বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের পদ্মানদীর মধ্যে থাকা ১৫টি চর রয়েছে। এ চরের ১ হাজার ৮ শ পরিবার গত ২ সপ্তাহ থেকে পানিবন্দি রয়েছে। ক্রমাগত পদ্মায় পানিবৃদ্ধির কারণে গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চরের মানুষ। স্কুলে যাতায়াতের কোন ব্যবস্থা না থাকায় উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিন রেজা বলেন, নদীভাঙন ও বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি বুঝে শিক্ষা অফিসার সিদ্ধান্ত নিবে। অনেক দূর্দশার মধ্যে চরের মানুষ বসাবস করছে। তাদের জন্য ত্রাণ দেয়া হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সার্বক্ষণিক প্রস্তত রয়েছি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যুরো জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জে বন্যার পানি বৃদ্ধির ফলে ৩টি উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের ১৩ হাজার ৯ শ ৩ পরিবারের ৫৮ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত পদ্মা, মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে গোমস্তাপুুরের বোয়ালিয়া ইউনিয়নের কাশিয়াবাড়ি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড চাঁপাইনবাবগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহেদুল আলম জানান, পদ্মানদীর বিপদসীমা হচ্ছে ২২ দশমিক ৫০ সে.মি., মহানন্দা ২১ মিটার ও পুনর্ভবা ২১ দশমিক ৮২ সে.মি.। বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত মহানন্দায় ৩ সে.মি. পানিবৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার মাত্র ১২ সে.মি. নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মার পানি অপরিবর্র্তিত থাকায় এখনো বিপদসীমার ২৭ সে.মি. নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে, পুনর্ভবা নদীর পানি বিপদসীমার ৪৪ সেমি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে গোমস্তাপুুরের বোয়ালিয়া ইউনিয়নের কাশিয়াবাড়ি ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তিনি আরো বলেন, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আগামি ২/১ দিনের মধ্যে পানি কমার সম্ভাবনা রয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা হাসানুজ্জামান ফৌজদার জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর, আলাতুলি, চরবাগডাঙা, দেবীনগর, শাহজাহানপুর, চরঅনুপনগর, সুন্দরপুর ও গোবরাতলা ইউনিয়নের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় ৫ হাজার ৫ শ ৬৫ পরিবারের ২৪ হাজার ৬ শ ২০ জন ক্ষতিগ্রস্ত, শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা, উজিরপুর, দুর্লভপুর, মনাকষা, ঘোড়াপাখিয়া ও ছত্রাজিতপুর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় ৮ হাজার ১ শ পরিবারের ৩২ হাজার ৪ শ জন এবং গোমস্তাপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় গোমস্তাপুর, পার্বতীপুর, আলিনগর ও বোয়ালিয়া ইউনিয়নের ২ শ ৩৮ পরিবারের ৯ শ ৮০ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে ১ শ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সদর উপজেলার আলাতুলি ও পাঁকা ইউনিয়ন। এছাড়া ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ পাওয়া গেছে।
এদিকে শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পাঁকা, দুর্লভপুর, মনাকষা ও ছত্রাজিতপুর ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করেন জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) এ কে এম তাজকির-উজ-জামান।
লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি জানান, নাটোরের লালপুর উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের বন্যাকবলিত এলাকায় ১ হাজার ৬ শ পরিবারের মাঝে ১৮ টন চাল বিতরণ করা হয়। বৃহস্পতিবার নাটোর জেলা ও লালপুর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে লালপুর, ঈশ্বরদী, বিলমাড়ীয়া, দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নে পদ্মার চরাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামের ১ হাজার ৬ শ পরিবারের মাঝে ১৮ টন চাল বিতরণ করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মুল বানীন দ্যুতি।