তানোর প্রতিনিধি: রাজশাহীর তানোর পৌরসভার মেয়রের বিরুদ্ধে ৪ বছরের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির খতিয়ান তুলে ধরে দুর্নীতিদমন কমিশনে অভিযোগ পাঠিয়েছেন ৬ কাউন্সিল। এর অনুলিপি পাঠানো হয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ছাড়াও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে। এছাড়াও অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে, পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম, হিসাবরক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুস সবুর ও কার্য সহকারী মাহাবুব আলমকে।
অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করেছেন পৌরসভার সংরক্ষতি আসনের নারী কাউন্সিলর মোমেনা আহমেদ, পলি বেগম ও জুলেখা বেগম, ১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাছির উদ্দিন, ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মশিউর রহমান এবং ৭নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর উজ্জল হোসেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, অলিখিত রেজুলেশন খাতায় প্রতি মাসে কাউন্সিলরদের স্বাক্ষর নেয়া হয়। পরে ওই স্বাক্ষর দিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদন করে প্রকল্পের টাকা ও রাজস্ব তহবিলের অর্থ তছরুপ করেন মেয়র। এছাড়াও সরকারি বরাদ্দের অর্থ ইচ্ছে মত বিভিন্ন প্রকল্পের নামে উত্তোলন করে আত্মসাত করছেন। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে, পৌর এলাকার কালীগঞ্জ হাট থেকে তালন্দহাট পর্যন্ত রাস্তার পাশে গাছে চুন ও রং করার নামে ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ও বিভিন্ন ওয়ার্ডে রিং পাইপ সরবরাহের নামে ১১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। কোন কাজ ছাড়াই ২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩ অর্থ বছরে রাজস্ব ও সরকারি বরাদ্দ এডিপি ফান্ডের ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার মেয়র তছরুপ করেন। চার বছর ধরে পৌরসভার নিজস্ব রোলার গোপনে ঠিকাদারদের কাছে ভাড়া দিয়ে প্রায় ২০ লাখ টাকা পৌরসভার অ্যাকাউন্টে জমা না করে মেয়র আত্মসাত করেন।
অন্যদিকে গোল্লাপাড়া হাটের মাছপট্টির টিনশেডের মাত্র কয়েকটি টিন পরিবর্তন করে ১১ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। উপজেলার মাসিন্দা এলাকার তামান্না কোল্ড স্টোর নির্মাণের সময় তানোর-রাজশাহী সড়কের কালিগঞ্জ মোড়ের ভাঙা রাস্তার গর্তে স্টোর কর্তৃপক্ষ ৪ ট্রলি ইটের ভাংড়ি দিয়ে রাস্তাটি সংস্কার করেন। অথচ ওই রাস্তা সংস্কার দেখিয়ে তানোর পৌরমেয়র এডিপি ও টিআর প্রকল্পে বরাদ্দ দেখিয়ে ১০ লাখ টাকা আত্মসাত করেছেন। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ওয়ার্ডে সাবমারসেবল পাম্প স্থাপনে প্রকৃত খরচ হয় ২৫ হাজার টাকা। কিন্তু প্রত্যেক পাম্প স্থাপনে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা ব্যয় দেখিয়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকা তছরুপ করেন মেয়র। অপর দিকে জলবায়ু পরিবর্তন প্রকল্পের নামে ১২ কোটি টাকার মধ্যে গোপনে ৭ কোটি টাকার কাজ টেন্ডার দিয়ে অর্থ লোপাট চলছে। এসব কাজ কর্মে মেয়র কোন কাউন্সিলরদের সঙ্গে কোন পরামর্শ ও সমন্বয় মিটিং করেন না। মেয়র তার ইচ্ছেমত পৌরসভার কাজকর্মের নামে পৌরসভার অর্থ আত্মসাত করেন।
এনিয়ে তানোর পৌরসভার সংরক্ষিত নারী আসনের কাউন্সিলর মোমেনা আহম্মেদ বলেন, প্রায় প্রতিটি প্রকল্পেই মেয়র নামমাত্র প্রকল্প দেখিয়ে পৌরসভার অর্থ আত্মসাত করেছেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তন প্রকল্পে সরকারিভাবে তানোর পৌরসভায় ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ আসে। এরমধ্যে ৭ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প দেখিয়ে একটি পত্রিকায় ও ইন্টারনেটে টেন্ডার দিয়ে মোটা অঙ্কের উৎকোচ নিয়ে তার নিজস্ব এক ঠিকাদারকে নামমাত্র কাজ করে জলবায়ু পরিবর্তন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাত করছেন। এসব অর্থ তছরুপে তানোর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (দায়িত্বপ্রাপ্ত পৌরসচিব) জাহাঙ্গীর আলম, হিসাবরক্ষক ও কার্য সহকারী পরস্পর যোগসাজসে গত ৪ বছরে প্রায় ৫ কোটি টাকা আত্মসাত করেছেন।
এ নিয়ে যোগাযোগ করা হলে তানোর পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম এসব বিষয়ে কোন তথ্য দেয়া যাবে না বলে জানিয়ে মেয়রের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। এ ব্যাপারে মোবাইলফোনে যোগাযোগ করা হলে তানোর পৌরমেয়র মিজানুর রহমান মিজান বলেন, যদি কেউ অভিযোগ করে তাহলে তার তদন্ত হবে জানিয়ে তিনি সাংবাদিকদের এড়িয়ে গিয়ে মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাসরিন বানু বলেন, অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন রাজশাহী অফিসের উপ পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমি ঢাকায় আছি। আগামি রোববার অফিসে গিয়ে খবর নিব। অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।