কাজী নাজমুল ইসলাম : পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে দেখিয়ে তামান্না বলে, মাঝামাঝি ওইখানে মধ্যচরে আমাদের বাড়ি ও স্কুল ছিল। এখন আর কিছুই নেই। সব ভেঙে গেছে। এখন খালার বাড়িতে থাকি। আবার কোথায় বাড়ি হবে। কোন স্কুলে পড়বো তার কোন ঠিকঠিকানা নেই। চোখেমুখে হতাশা নিয়ে কথাগুলো বলে থামে সে।
তামান্নার বয়স ৮ বছর। সে পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের পদ্মার মধ্যচরের চর খিদিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। তাদের বাড়িও ছিল স্কুলের পাশেই। তার বাবার নাম মনিরম্নল ও মায়ের নাম রেখা। চরে পানি বৃদ্ধি পেয়ে ভাঙন শুরম্ন হওয়ায় তারা বাড়িঘর ভেঙে নিয়ে পাড়ে সাতবাড়িয়ায় খালার বাসায় উঠেছে ১ সপ্তাহ আগে। এখন ওই চরে কোন বাড়িও নেই, নেই স্কুলও। সব ডুবে গেছে।
মধ্যচরের সাহেব আলীর ছেলে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র অন’রাও নদীর চর ডুবে যাওয়ায় বাড়িঘর হারিয়ে বাবা-মার সাথে পাড়ে আশ্রয় নিয়েছে আত্মীয়ের বাসায়। তারা জানে না কোথায় তাদের বাড়ি হবে। পড়বেইবা কোন স্কুলে। কিংবা আদৌ আর লেখাপড়া হবে কিনা। অন’র মা লালবানু বলেন, এখন অন্যের বাড়িতে আছি। আগে বাড়ির চিনত্মা, তার পরে না লেখাপড়া। একই রকম কথা বলেন তামান্নার মা রেখা বেগমও। বাড়িঘরের সাথে ভেঙে গেছে তাদের সনত্মানদের ভবিষ্যৎ স্বপ্নও।
হরিয়ান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মফিদুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, তার ইউনিয়নের খিদিরপুর মধ্যচরে প্রায় ৫ বছর আগে পদ্মার ভাঙনে বাড়িহারা ৩ শ পরিবারকে আশ্রয় দেন তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার। সেখানে গড়ে উঠে স্কুলও। গতবছর থেকে এগুলো ভাঙতে শুরম্ন করেছে। গতবছর প্রায় ১শটি বাড়ি ভেঙেছে। এবার স্কুলসহ বাকী বাড়িগুলো ভাঙছে।
পবা উপজেলা শিড়্গা কর্মকর্তা মকলেসুর রহমান জানান, মধ্যচরের চর খিদিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১০৫ জন শিড়্গার্থী ছিল। পানি উঠে ভাঙন শুরম্ন হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার থেকে স্কুলটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং আসবাবপত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ওই স্কুলের ৬ জন শিড়্গককে মাসকাটাদিঘি স্কুলে সমন্বয় করা হয়েছে। শিড়্গার্থীরা নগরীর বিভিন্ন স’ানে অভিভাবকদের সাথে আশ্রয় নিয়েছে। পানি নেমে গেলে সিদ্ধানত্ম নেয়া হবে।
সংশিস্নষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ দিন যাবৎ পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফারাক্কা বাঁধের ১০৯টি গেট খুলে দেয়ায় পদ্মায় হু হু করে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বড় ধরনের বন্যার আশংকা করা হচ্ছে। এতে পদ্মাপাড়ের বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা পস্নাবিত হয়েছে এবং বাড়ছে পানিবন্দী পরিবারের সংখ্যা। গতকাল পর্যনত্ম জেলার ৩ উপজেলার ১৪ শ বানভাসি পরিবারের মাঝে শুকনা ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বিভিন্ন উপজেলার পদ্মাপাড়ের নিম্নাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা পস্নাবিত হচ্ছে। বিশেষ করে পদ্মা নদীর উভয় পাড়ে গোদাগাড়ী উপজেলার চরআষাড়িয়াদহ, পবার চর মাঝারদিয়াড়, চরখিদিরপুর, মধ্যচর, খোলাবোনা, পুরাতন কসবা, বেলুয়ার চর, চর খানপুর এবং বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পানি আরও বেড়েছে। নীচু এলাকার বাড়িঘরসহ খেতের ফসলের মধ্যে মাসকালাই, আমন, আগাম শীতের সবজিসহ অন্যান্য ফসল পস্নাবিত হয়েছে। তিন উপজেলার বিভিন্ন চরের শিড়্গা প্রতিষ্ঠানে পানি উঠে যাওয়ায় শিড়্গা প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন উপজেলার পানিবন্দী পরিবারগুলোর কাছে জরম্নরিভাবে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো শুরম্ন করেছে জেলা প্রশাসন।
এদিকে, গতকাল মঙ্গলবার পবায় বন্যা পরিসি’তি নিয়ে এক সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস’াপনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুনসুর রহমান। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেনের পরিচালনায় বন্যা পরিসি’তি ও ত্রাণ সামগ্রী বিষয়ে তথ্য উপস’াপন করেন উপজেলা প্রকল্প বাসসত্মবায়ন কর্মকর্তা ও কমিটির সদস্য সচিব প্রকৌশলী আবু বাশির। উপজেলা থেকে বন্যা পরিসি’তি নিয়ে জেলা প্রশাসনের সাথে ভিডিও কনফারেন্সে সরাসরি বক্তব্য রাখেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা, হরিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বজলে রেজবি আল হাসান মুঞ্জিল, হরিয়ান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মফিদুল ইসলাম বাচ্চু। এছাড়াও উপজেলা চেয়ারম্যান ও নির্বাহী কর্মকর্তাও উপজেলার বন্যা পরিসি’তি, ভূক্তভোগি পরিবারের সংখ্যা, ত্রাণ বিতরণ, ত্রাণ মজুদ ও চাহিদার বিষয় তুলে ধরেন।
পবার চেয়ারম্যনরা জানান, উপজেলার দুটি ইউনিয়ন হরিপুর ও হরিয়ান ইউনিয়নের চরমাঝারদিয়াড়, চরনবীনগর, চরতারানগর, মধ্যচরের ৫৯৭টি পরিবার সম্পূর্ণ ড়্গতিগ্রসত্ম হয়েছে। এরমধ্যে ৩৯১ পরিবারকে ত্রাণ সামগ্রী দেয়া হয়েছে। এছাড়াও বরাদ্দকৃত প্রায় ১১ টন চাল দু’এক দিনের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, গতকাল পর্যনত্ম পদ্মাপাড়ের গোদাগাড়ীর ৫শ’, পবার ৪শ’ ও বাঘা উপজেলার ৫শ’ বানভাসি পরিবারের মাঝে শুকনা ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। প্রত্যেকের মধ্যে বিতরণকৃত সামগ্রীর মধ্যে ছিল চাল, ডাল, চিড়া, চিনি, বিস্কুট, মোমবাতি ও দিয়াশলায়। এই ১৪ শ পরিবারকে শীঘ্রই ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হবে। পানি কমলে ড়্গতিগ্রসত্মদের পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসনের আওতায় নেয়া হবে।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র জানায়, গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাত থেকে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় রাজশাহীর বড়কুঠি পয়েন্টে পানির উচ্চতা পাওয়া গেছে ১৮ দশমিক ১০ মিটার। গত সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় পানির উচ্চতা ছিল ১৮ দশমিক ১ মিটার। রাজশাহীতে পদ্মার পানির বিপদসীমা ১৮ দশমিক ৫০ মিটার। সে অনুযায়ী পানি এখন বিপদসীমার মাত্র ৪০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফারাক্কার ১০৯টি গেট খুলে দেয়ায় পদ্মা বিপদসীমা অতিক্রম করে বন্যার আশংকা করছেন সংশিস্নষ্টরা।