বিশেষ প্রতিবেদক: প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে যাবার আগেই নিশ্চিত হয়েছিলো, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদশালীদের বিরুদ্ধে চরম কঠোর হবে সরকার। প্রথম ভূকম্পনটা হয় ঢাকার ক্যাসিনোর আড্ডাগুলোতে। রথি-মহারথি অনেকেরই থলের বেড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করে এই অভিযানে।
বিষয়টি নিয়ে যখন সারাদেশেই আলোচনা তুঙ্গে, তখন নিউইয়র্কে দেয়া এক বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও স্পষ্ট করলেন দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিরুদ্ধে তার মনোভাব। এ নিয়ে দিলেন কর্মপরিকল্পনার ইঙ্গিতও।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বলছে, শনিবার বিকালে নিউইয়র্কের ম্যারিয়ট মারকুইজ হোটেলে এক নাগরিক সংবর্ধনায় প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছি। আমি পরিষ্কারভাবে একটা কথা বলতে চাই, কেউ যদি অসৎ পথে অর্থ উপার্জন করে এবং তার অনিয়ম, অসততা ধরা পড়ে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। তারা যে-ই হোক না কেন, এমনকি আমার নিজ দলের লোক হলেও।
এখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলেছেন। তিনি বলেছেন, অসৎ উপায়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তিরা যখন সমাজকে পঙ্গু করে ফেলে, তখন জনগণকে তাদের সন্তানদের নিয়ে সৎ জীবনযাপন করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। যারা সৎ জীবনযাপন করতে চান, তাদের কিছু সীমাবদ্ধতা নিয়ে চলতে হয়। কিন্তু যারা অসাধু উপায়ে অর্জিত অর্থের মাধ্যমে বিলাসবহুল জীবনযাপন করে, তাদের মাধ্যমেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়।
প্রধানমন্ত্রীর এই অনুধাবন নিঃসন্দেহে গুরুত্বের দাবিদার। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে এই অসৎ উপার্জনের নিদারুণ কুপ্রভাব এখন সহজেই দৃশ্যমান। আর সে কারণে সবক্ষেত্রেই অর্থের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি সমাদর পাচ্ছে। অর্থের জোরে অযোগ্যদের আধিপত্য যোগ্যদের কোনঠাসা করে ফেলছে।
তাই প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা আর চলমান অভিযান দুটোই এখন সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষেরা আশা করছেন, দুর্নীতি ও অবৈধ অর্থের দাপট দূর করতে এই উদ্যোগ কার্যকর হবে। তাদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো পরিচয়ই এই উদ্যোগের পথে বাধা হতে পারবে না। সেক্ষেত্রে অতীতে অর্থশক্তি আর নানা ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকা মানুষগুলোও সাহস পেয়ে এগিয়ে আসবে আরও নতুন তথ্যপ্রমাণ নিয়ে, যা চলমান উদ্যোগকে আরও শক্তি যোগাবে।
প্রধানমন্ত্রী উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের কথা উল্লেখ করতেও ভোলেননি। তিনি বলেছেন, সরকার ব্যাপক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এসব প্রকল্পের প্রতিটি টাকা যথাযথভাবে ব্যয় করা হলে বাংলাদেশ আরও উন্নত হতে পারতো।
প্রধানমন্ত্রীর এই ভাবনা প্রকৃতপক্ষে সারা বাংলাদেশের অভিন্ন চিত্র। শুধু ক্যাসিনো কিংবা জুয়ার আসর দিয়েই আঙুল ফুলে কলাগাছওয়ালাদের জন্ম হয়নি। উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অশুভ আঁতাত তৈরি হয়েছে, সেই আঁতাত একেকজন ফ্র্াঙ্কেনস্টাইন তৈরি করেছে। যে দানবের দল টেন্ডারবাজির প্রয়োজনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মেলাতেও কার্পণ্য করে না। তাদের অনেকেই উন্নয়নের নামে কমিশন কেটে, চাকরির নামে বাণিজ্য করে শূন্য থেকে আজ বিপুল অর্থের মালিক বনে গেছে। নিজেদের ভারসাম্য বজায় রাখতে অপরাধীদের নানা অবৈধ ব্যবসার ছত্রছায়া দিয়েছে তারা। সরকারের রাজস্ব ক্ষতি করে নিজেদের পকেট ভরেছে দীর্ঘ সময় ধরে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ও চলমান কঠোর ব্যবস্থা জনগণের মধ্যে আশা জাগিয়েছে, এই চক্রের দাপট হয়তো এতে দূর হবে।
দীর্ঘ সময়ের এই অশুভচক্র অবশ্যই একদিনে দূর করা সম্ভব হবে না। কিন্তু ক্ষমতায় থেকে নিজের দলকেও ছাড় না দিয়ে শুদ্ধি অভিযানের যে প্রচলন শেখ হাসিনা করলেন, তা অব্যাহত রাখা গেলে অবশ্যই বাংলাদেশ থেকে এসব অপচর্চা আর দুর্নীতি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব। এই পথ সহজ নয়, কণ্টকাকীর্ণও বটে। কিন্তু জনগণ আশায় বুক বেঁধেছে। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তারা চায়, এই অভিযানে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়াতে। কারণ, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে এর বিকল্প আর কিছু নেই।