তৈয়বুর রহমান : রাজশাহীতে ব্যাপকহারে বাড়ছে পাইল্স রোগ। নগরীর কোন না কোন বাড়িতে পাইলসের রোগী আছেই। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যাভ্যাসের কারণে এ রোগ হয়ে থাকে। তৈলাক্ত ও বেশি বেশি ভাজাপোড়া ও ফাস্টফুড খাদ্যাভ্যাসের কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য হয় তা থেকেই মানুষ পাইল্স রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
পাচন ক্রিয়ার ত্রæটির কারণে পেটে ব্যথা হয়। ফুলে ওঠা পায়ুপথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পায়ুপথ পরিষ্কার করা যায় না। পায়ুপথ অপরিষ্কার থাকার কারণে সেখানে ময়লা জমে থাকে। প্রথমে সেখানে চুলকানি শুরু হয়। পরবর্তীতে পায়ুপথে খতের সৃষ্টি হয়। মাংস বেড়ে যায়। সেটা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা চরম আকার ধারণ করে। ধীরে ধীরে সেখানে প্রচÐ ব্যথা এবং এতে অনেকের রক্ত বের হয়। অনেকের মলদার বের হয়ে শুরু হয় চরম ব্যথা। দীর্ঘদিন এ অবস্থায় থাকতে থাকতে তা পাইল্স-এর চরম পর্যায়ে পরিণত হয়। যন্ত্রণা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে রোগী দৌড়ায় চিকিৎসকের কাছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইল্স একটি মারাত্মক রোগ। যা মানুষের জীবনী শক্তিকে কমিয়ে দেয়। মানুষের মাঝে এ নিয়ে এক ধরনের কুসংস্কার রয়েছে। অনেকেই পাইলসকে যৌন রোগ মনে করে তা প্রকাশ করতে চান না। দীর্ঘদিন গোপনে থাকতে থাকতে তা মারাত্মক আকার ধারণ করে।
পাইল্স রোগ বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। অর্শ্ব, গের্জ, পাইলস, ফিস্টুলা, এনালফিসার, নালীর ঘা, কোষ্টকাঠিন্য, রক্তপড়া, মলদার বের হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। এক ধরনের পাইল্স আছে যাতে রক্ত পড়ে। প্রচÐ ব্যথা অনুভূত হয়।
এ সম্পর্কে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জিক্যাল বিভাগের পাইল্স রোগ বিশেষজ্ঞ রূপসা নূরে লাইলা বলেন, এ রোগ এখন ঘরে ঘরে। দেশে বেড়েই চলেছে পাইল্স রোগীর সংখ্যা।
রাজশাহীতে পাইল্স রোগীর সংখ্যা কত জিজ্ঞেসা করা হলে এ প্রশ্নের উত্তরে ড. রূপসা নূরে লাইলা বলেন, সামনে যত মানুষ দেখছেন তার ৮০ ভাগ মানুষই পাইল্স রোগে আক্রান্ত। অনেকেই এ রোগ গোপন রাখেন। তাই পাইল্স রোগী কত চেনা যায় না, সংখ্যাও জানা যায় না। যখন মরণাপন্ন হয়, মারাত্মক আকার ধারণ করে চিকিৎসকের কাছে ছুটে যান ঠিক তখনই পাইলস রোগীকে চেনা যায়। অবস্থা ভয়ানক হলে শয্যাসায়ী হন, ডাক্তার তখন অপারেশন করার পরামর্শ দেন। তখনই বুঝা যায় এটা পাইল্স রোগী।
বর্তমানে অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছে যে, দেশের হাতুড়ে কবিরাজ, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ডাক্তারখানা, হোমিও ডাক্তার খানায় এখন প্রচুর পাইল্স রোগী। এটা দেখে বুঝা যায় দেশে পাইল্স রোগ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে ভিড় দেখে বুঝা যায় দেশের পাইল্স রোগীর সংখ্যা কিভাবে বাড়ছে।
এ রোগে ভুক্তভোগী রাজিয়া খাতুন বলেন, আমি জীবনে অনেক রোগ ঘেঁটেছি, চিকিৎসার জন্য বিদেশেও গেছি কিন্তু এ রোগ এতো কষ্টদায়ক আগে তা ভাবিনি। এতো যন্ত্রণাদায়ক কখনো কল্পনাও করিনি। এ রোগ আমার জীবনী শক্তিকে শেষ করে দিয়েছে। জীবনী শক্তির এই যে ক্ষয় হয়তো আমি আর কোন দিন পূরণ করতে পারবো না। এ রোগে যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের আমি বলবো সময় থাকতে পাইল্সের চিকিৎসা করান। না হলে অনেক ভুগবেন। তিনি তার অভিজ্ঞতা থেকে এ রোগ সম্পর্কে বর্ণনা দেন।
সাধারণত: খাদ্যাভ্যাসের কারণে এ রোগ হয়ে থাকে। আমরা অনেকেই ফাস্টফুডে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। অতিরিক্ত চর্বি ও তৈলাক্ত খাবার অহরহ খাচ্ছি। এসব খাদ্যাভ্যাসের কারণে কোষ্টকাঠিন্য সৃষ্টি হয়। এতে থেকে পাচনক্রিয়ার ত্রæটির কারণে পায়ুপথে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এতে এরপর হাল্কা ব্যথা শুর হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করার ফলে সেখানে এক ধরনের ঘা হয়। ঘা যখন বড় হয় তখন তা চুলকাতে থাকে। ধীরে ধীরে বড় হয় তখন তার যে যন্ত্রণা শুরু হয় তা সহ্য করা যায় না।
প্রাথমিক অবস্থায় অনেকেই লজ্জার কারণে ডাক্তারের কাছে যায় না। কবিরাজ, গ্রাম্য ডাক্তার এমনকি লাজ-লজ্জা ঢাকতে ছোট-খাটো চিকিৎসা দিয়েই ধামা-চাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করে। গোপন রাখার কারণে ধীরে ধীরে তা চরম আকার ধারণ করে। এ রোগ এমন রোগ যা কারে বলা যডায় না সহ্য করাও যায় না। আবার তা চরম আকার ধারণ করলে তখন সে দিকবিদিক ছুটাছুটি শুরু করে। সে যন্ত্রণা এমন এক পর্যায়ে গিঁয়ে দাঁড়ায় তখন তা থেকে রক্ষা পান না। শেষে যান হাসপাতালে। ততক্ষণে তা মারাত্মক আকার ধারণ করে। এমন এক অবস্থায় দাঁড়ায় যখন কারো কিছু করার থাকে না। এ রোগে আক্রান্ত অনেকের ক্যানসারে রূপান্তরিত হয়। বাধ্য হয়ে কেউ যান ভারত, কেউ যান সিঙ্গাপুর আবার আনেকে ছুটে যান লন্ডন। এমনকি এতে অনেকের মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে।
ইতোমধ্যে হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডাইগোনেস্টিক সেন্টার, হোমিওপ্যাথি ডাক্তার খানা, হাতুড়ে কবিরাজের দাওয়াখানা সর্বত্রই এখন পাইল্স রোগীর প্রচÐ ভিড়। এমনকি রোগীর চাপে হেনস্থা চিকিৎসকরা। অনেক সময় ডাক্তার না পেয়ে রোগীকে হা পিত্তেস হয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। এমনকি ডাক্তারের সাক্ষাৎ না পেয়ে চিকিৎসা না করিয়েই রোগীকে বাড়ি ফিরতে হয়।
ডা. নুরে লাইলা বলেন, ভেজাল খাদ্য, ফাস্টফুুড ও অতিরিক্ত চর্বি জাতীয় এসব খাদ্য পাইল্স রোগের জন্মদাতা। এসব খাদ্যই এ রোগের মূল কারণ বলে মনে করেন তিনি। দেশে এখন ভেজাল খাদ্যে সয়লাব। বাজারে ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যে ভরপুর। নগরীর মোড়ে মোড়ে ফাস্টফুডের খাবার। দেশে ভেজাল খাদ্যে ছেয়ে গেছে। প্রতিদিনই খাদ্যে ভেজাল দেয়ার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠানকে জেল-জরিমানা করেও কিছুতেই কিছুই হচ্ছে না। এসব খাদ্য খেয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়ছে। এস অখাদ্য কুখাদ্য খেয়েই পাইল্স রোগ হচ্ছে। পরীক্ষা করে দেখা থেছে যে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিশুরা যে দুধ খেয়ে বেড়ে উঠছে তাতেও এক ধরনের এন্টিবায়োটিক ধরা পড়েছে যাতে তারাও এ ধরনের রোগে থেকে বাদ যাচ্ছে না।
মানুষের খাদ্যাভ্যাস এমন ভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যাতে এসব ভেজাল খাদ্যই কিনতে বাধ্য হচ্ছে। ভেজালযুক্ত অনেকে নামিদামি ব্র্যান্ডের খাদ্যপণ্য কিনছে বেশি দাম দিয়ে। কিন্তু লাভ কী ? সংবাদ মাধ্যেমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বহু নামিদামি প্রতিষ্ঠানের পণ্য নিম্নমানের।
প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বাজার থেকে ২৭ ধরনের ৪০৬টি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করেছিল। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যে ৩১৩টি পণ্যের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে, তার মধ্যে ৫২টি প্রতিষ্ঠানের পণ্য নিম্নমানের বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।