এফএনএস: প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলেই রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। এছাড়া, রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের একটি বিশেষ ইউনিট হচ্ছে বলেও জানান তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নিজ দফতরে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে একথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এর আগে, মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার, কানাডার রাষ্ট্রদূত বেনোয়েট প্রেফনটেন, জাতিসংঘের প্রতিনিধি ও কয়েকটি এনজিওর প্রতিনিধিরা মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর কবে হবে- এ প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান খাঁন বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে আছেন, তিনি এসে যেভাবে নির্দেশনা দেবেন, সেভাবে কাজ হবে। তবে, এটা নির্ভর করে এখানে যারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও এনজিওর প্রতিনিধি রয়েছেন, তাদের ওপর।
প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের একটি বিশেষ ইউনিট হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র এখন আমার হাতে, এটা নিয়ে দ্রæত কাজ করছি। তারা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকবে। এছাড়া, বিজিবি ও র‌্যাবের সদস্য সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে, যেন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অটুট থাকে।
রোহিঙ্গারা ইদানীং মারামারি-হানাহানিতে লিপ্ত হচ্ছে। এসব যেন করতে না পারে, সেজন্য আমরা সবকিছুই করবো। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রোহিঙ্গাদের জন্য ক্যাম্প করতে জায়গা চেয়েছেন, এ বিষয়ে সরকার কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তুরস্কে অনেক জায়গা আছে। তারা সেখানে নিয়ে গেলে আমরা সবসময় ওয়েলকাম করবো। সৌদিসহ সব দেশেই জায়গা রয়েছে।
তারা যদি নিয়ে যায়, আমরা এপ্রিশিয়েট করবো। সন্ত্রাসীদের আনাগোনা বন্ধে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিদেশে যাওয়ার আগে নির্দেশনা দিয়ে গেছেন, দ্রæত ক্যাম্পগুলোতে কাঁটাতারের বেড়া দিতে। মাত্র নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, পর্যায়ক্রমে সব ক্যাম্পেই কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত দুই বছর ধরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এজন্য তাদের নিরাপত্তার দিতে ক্যাম্পের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শিগগিরই এর কাজ শুরু হবে।
স¤প্রতি দেখা যাচ্ছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায়ই সন্ত্রাসী কর্মকাÐ হচ্ছে। তারা বিভিন্ন মাদকদ্রব্য পাচার ও খুন করছে। তারা আওয়ামী লীগের এক নেতাকেও হত্যা করেছে। এজন্য রোহিঙ্গাদের নজরদারিতে রাখতে ক্যাম্পে কাঁটাতারের বেড়াসহ বিভিন্ন পয়েন্টে ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ে আমাদের নতুন কোনো চিন্তা-ভাবনা আছে কি-না, তা জানতে চেয়েছেন।
আমরা জানিয়েছি, রোহিঙ্গারা কতদিন থাকবে নিজেরাও জানি না। যেকোনো সময় এ সমস্যার সমাধান হবে। আমরা রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছি, তারাও কাজ করছে। জাতিসংঘ থেকে বারবার মিয়ানমারকে চাপ দেওয়া হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে। কিন্তু, রোহিঙ্গারা যেতে চাচ্ছে না। জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পাওয়ায় তারা যাচ্ছে না। ফলে, নানা প্রতিক‚ল অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে।
একই সঙ্গে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চারপাশে কাঁটাতার দিয়ে বেড়া দিয়েছি কি-না, এ বিষয়ে তাদের জানিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, প্রাথমিক অবস্থায় তিনটি বড় ক্যাম্পে কাঁটাতার দিয়ে বেড়া বা প্রাচীর নির্মাণ করার। সেটা জেলখানার মতো হবে কি-না, এ বিষয়ে তারা জানতে চেয়েছেন। আমরা বলেছি, এটা জেলখানা হবে না। পৃথিবীর অনেক দেশেই শরণার্থীদের জন্য এমন ব্যবস্থা রয়েছে।
তুরস্কের শরণার্থীদেরও এভাবেই রাখা হচ্ছে। সেজন্যই আমরা এমন ব্যবস্থা করছি, যেন তারা ছড়িয়ে গিয়ে বাংলাদেশের মূল নাগরিকদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার চেষ্টা না করতে পারে। তারা এক স্থানে থাকলে সহজে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবে। এ ব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের থাকা ও তাদের নিয়ে কাজে কোনো সমস্যা হবে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান খাঁন বলেন, এখন তারা যেভাবে থাকছে ও বিভিন্ন এনজিও-সংস্থাগুলো যেভাবে কাজ করছে, তখনও সেভাবে কাজ করতে পারবে। আমরা সেই নীতি মেনেই কাজ করবো।
মন্ত্রী বলেন, যেসব এনজিও রোহিঙ্গাদের সেবা দিতে আসবে, আমরা তাদের ভিসা দিচ্ছি। কিন্তু, ইদানিং দেখছি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের আনাগোনা বেড়েছে। তারা পুলিশসহ রাজনৈতিক নেতা হত্যা করেছে। প্রায়ই দেখি, তাদের ক্যাম্পে মারামারি হৈ চৈ-সহ নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা হচ্ছে।
এজন্য আমরা ক্যাম্পের বিভিন্নস্থানে ওয়াচ টাওয়ার, সিসিটিভি স্থাপনসহ বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করবো, যেন তাদের সহজে নজরদারিতে রাখা যায়। আমরা রাষ্ট্রদূতদের এটাও জানিয়েছি, রোহিঙ্গারা এখনও তাদের মূল ভ‚খÐে যাতায়াত করে ইয়াবা নিয়ে আসছে। কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো- এটা যেন না হয়। পাশাপাশি, তারা মানবপাচারকারীদের হাতে যেন না পড়ে। স¤প্রতি লক্ষ্য করা গেছে, নৌকায় করে তারা বিভিন্ন দেশের উদ্দেশে রওনা দিচ্ছে। এ কাজটি যেন না করতে পারে, সেজন্যই তাদের কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যে নিয়ে আসতে চাচ্ছি। তার মানে এই নয় যে, তারা জেলখানায় আবদ্ধ থাকবে। রাষ্ট্রদূতদের জানিয়েছি, আপনারা সেখানে যাবেন, কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন। এতে কোনো সমস্যা হবে না। মিয়ানমার প্রায়ই বলে, তাদের ওখান থেকে পালিয়ে আসা সন্ত্রাসীরা আমাদের ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়।
এ কাঁটাতারের বেড়া সে জন্যই দেওয়া হচ্ছে, যেন যে কেউ চাইলেই যখন-তখন প্রবেশ করতে না পারে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সবাই আন্তরিক জানিয়ে কামাল বলেন, কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতরা সবাই স্বীকার করেছেন, রোহিঙ্গাদের একসঙ্গে ফিরে যেতে হবে। তারা রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার কথা বলেছেন। আমরা বলেছি, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন, রোহিঙ্গা শিশুদের মিয়ানমারের ভাষায় ও সে দেশের কারিকুলামে শিক্ষা দিতে। আমরা এনজিওদের বলেছি, তাদের নিজ দেশের ভাষা শিক্ষা দিতে।
সেটা চলমান রয়েছে। মোবাইল ফোন-ইন্টারনেট ব্যবহার সীমিতকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ নিয়ে একটি সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কারণ, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর সবসময় নজরে রাখছে। তারা যেন রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে না পারে, এজন্যই এ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এতে আপনাদের (স্বেচ্ছাসেবক) কার্যক্রমে কোনো অসুবিধা হবে না। রোহিঙ্গাদের সমাবেশ সম্পর্কে রাষ্ট্রদূতরা জানতে চেয়েছেন জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা সমাবেশের মাধ্যমে বেঁচে থাকার আকুতি সারা বিশ্বের কাছে জানিয়েছে। আমরা মনে করি, তারা যথার্থভাবেই জানিয়েছে। আমরা এ বিষয়টিকে নেতিবাচক ভাবে দেখছি না। কারণ, তারা বেঁচে থাকার জন্য, অধিকার আদায়ের জন্য এটা করতেই পারে।