স্টাফ রিপোর্টার: চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুরে নৃশংস কায়দায় যুবক রুবেল হোসেনের (২৮) দুই হাতের কবজি কেটে নেয়ার তিন ঘণ্টা আগে তাকে উদ্ধারে থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি আতিকুল ইসলামের কাছে ২০ বারের বেশি ফোন করেছিলেন স্বজনরা। কিন্তু সেইরাতে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠাননি ওসি। পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় ভোরের দিকে, ঘটনা শেষ হওয়ারও তিন ঘণ্টা পর। রুবেলের স্বজনরা এমন অভিযোগ করে বলছেন, পুলিশ যদি সময়মতো ঘটনাস্থলে যেতো তাহলে রুবেলকে তার দুই হাতের কবজি হারাতে হতো না।
শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দীনের উপস্থিতিতে, তার নির্দেশেই রুবেলের কবজি কেটে নেওয়া হয়। এলাকাবাসী বলছেন, ফয়েজ বাহিনীর একাধিক ক্যাডারের সঙ্গে শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি আতিকুল ইসলামের বেশ আগে থেকেই গভীর সখ্যতা ছিল। এ কারণে বাহিনীর সদস্যরা সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল।
আর ওসি আতিক মাঝে মাঝেই ফয়েজ বাহিনীর আস্তানায় যেমন যাতায়াত করতেন তেমনি বাহিনীর ক্যাডাররাও থানার ভেতরে-বাইরে আতিকের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। রুবেলের কবজি কাটার সঙ্গে জড়িত গ্রেপ্তার হওয়া ফয়েজ বাহিনীর অন্যতম ক্যাডার তারেক আহমেদের (কবজি কর্তন মামলার ২ নম্বর আসামি) সঙ্গে নিয়মিত আড্ডা দিতেন ওসি আতিক। গ্রেপ্তার হওয়া তারেক আহমেদের ফেইসবুক আইডিতে ওসি আতিকের সঙ্গে তার একাধিক ঘনিষ্ঠ ছবি এখনো জ্বলজ্বল করছে।
রুবেলকে উদ্ধারে শিবগঞ্জ থানা পুলিশের অবহেলার বিষয়ে রুবেলের চাচাতো ভাই শিবগঞ্জের নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম বলেন, ১৮ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে পদ্মার বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে রুবেলকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যায় ফয়েজ বাহিনী। সালামের অভিযোগ, রুবেলকে অপহরণের বিষয়টি জানতে পেরে ঘটনার দেড় ঘণ্টা পর আমি শিবগঞ্জ থানার ওসি আতিককে পরবর্তী এক ঘণ্টায় ২০ বারের বেশি ফোন করি। তার কাছে আমার আর্জি ছিল, দ্রæত ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানোর এবং রুবেলকে উদ্ধার করার জন্য। পুলিশ না গেলে সন্ত্রাসীরা রুবেলকে মেরে ফেলবে বলেও আমি ওসির কাছে আশঙ্কার কথা বলেছিলাম। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তাৎক্ষণিকভাবে রুবেলকে উদ্ধারে পুলিশ কোন ভূমিকা রাখেনি। ঘটনা শেষ হওয়ার পর ১৯ সেপ্টেম্বর ভোরের দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে এলাকায় টহল দিয়ে আবার ফিরে যায় থানায়।
আব্দুস সালামসহ রুবেলের অন্য স্বজনরাও অভিযোগে বলেন, রুবেলের হাত কাটা হয়েছে রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে। পুলিশকে জানানো হয়েছিল রাত সাড়ে ১১টার দিকে। পুলিশকে জানানোর তিন ঘণ্টা পর সন্ত্রাসীরা রুবেলের কবজি কর্তন করে। এই তিন ঘণ্টা সময়ের মধ্যে চাইলে পুলিশ রুবেলকে উদ্ধার করতে পারতো। কারণ, শিবগঞ্জ থানা থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব মাত্র আড়াই কিলোমিটার। মোটরসাইকেলে যেতে সময় লাগে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট।
নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান এডু বলেন, শিবগঞ্জ থানা থেকে ঘটনাস্থল উজিরপুর পদ্মার বেড়িবাঁধের ফয়েজের আস্তানার দূরত্ব সর্বোচ্চ আড়াই কিলোমিটার। পাকাসড়ক থাকায় থানা থেকে মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে ১০ মিনিট সময় লাগে। ওসি চাইলে দ্রæত পুলিশ পাঠিয়ে রুবেলকে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে উদ্ধার করতে পারতেন। কেন করেননি সেটাই বড় রহস্য। তিনি পুলিশের এই অবহেলার তদন্ত দাবি করেন। এডু আরও বলেন, আমি এলাকার এমপি ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুলকেও ফোন করে রুবেলকে উদ্ধারে সহযোগিতা চেয়েছিলাম। এমপি নিজেই ফয়েজকে ফোন করে রুবেলকে ছেড়ে দিতে বলেছিলেন। কিন্তু ফয়েজ তাতে কর্ণপাত করেনি।
এমপি ডা. শিমুলও এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন, ঘটনা জানতে পেরে আমি ওই রাতে ফয়েজকে একাধিকবার ফোন করেছিলাম। কিন্তু ফয়েজ আমার কথা শোনেনি। আমি বলেছিলাম, তোমার কাছে রুবেল আছে এটা সবাই জানে। ছেড়ে দাও, তা না হলে তোমার খবর আছে। কিন্তু সে কথা শোনেনি। একজন অপরাধী হিসেবে ফয়েজ ও তার সহযোগিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন এমপি।
এদিকে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উজিরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ফয়েজ উদ্দীনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী বাহিনী আগে থেকেই সীমান্তে গরু লুট, ছিনতাই, হাটে-ঘাটে চাঁদাবাজি ছাড়াও ফেনসিডিল, ইয়াবা পাচার চালিয়ে আসছিল অনেকটা নির্বিঘেœ। ফয়েজ বাহিনীর ক্যাডাররা জালাল উদ্দিন নামের একজন দালালের মাধ্যমে শিবগঞ্জ থানা পুলিশের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে। শিবগঞ্জে বদলির পর ওসি আতিকও ফয়েজ বাহিনীর আস্তানায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। পাশাপাশি স্থানীয় এমপি ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুলের বড় ভাই মিতুও ফয়েজের আস্তানায় গিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দিতেন। ফয়েজ সম্প্রতি তার নিজের এলাকা উজিরপুরে একটি গরুর হাট চালু করলে থানা পুলিশ, এমপির ভাই ও তার সহযোগিদের যাতায়াত আরও বেড়ে যায়। এতে ফয়েজ বাহিনীর ক্যাডাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে।
এলাকাবাসীর অভিযোগে আরও জানা গেছে, গত এপ্রিল মাসে পদ্মার একটি ফেরিঘাট দখলে নিয়ে ফয়েজ বাহিনীর ক্যাডাররা বৈধ ইজারাদারকে তাড়িয়ে দিয়ে চাঁদাবাজি শুরু করে। এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য ফয়েজের ক্যাডাররা ফেরিঘাটে ব্যাপক বোমাবাজি করে। এ সময় ঘাট ইজারাদার আব্দুস সালাম শিবগঞ্জ থানায় পর পর তিনটি অভিযোগ দাখিল করেন ফয়েজ বাহিনীর বিরুদ্ধে। ওসি আতিক ঘটনাস্থলে গিয়েও কাউকে আটক না করেই ফিরে আসেন। এতে বাহিনীর সন্ত্রাসীরা আরও বেপরোয়া হয়ে যায়। পদ্মার সেই ফেরিঘাটটি ঘটনার আগের দিন পর্যন্ত ফয়েজ বাহিনীর দখলে ছিল বলে জানিয়েছেন ইজারাদার সালাম।
এদিকে রুবেলকে উদ্ধারে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার পাশাপাশি ফয়েজ বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ প্রসঙ্গে শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি আতিকুল ইসলাম বলেন, রুবেলকে উদ্ধারে রাতেই এলাকায় পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউকে পায়নি। ফয়েজের আস্তানায় যাতায়াত সম্পর্কে ওসি বলেন, তার সঙ্গে ফয়েজের অনুসারী কারো সম্পর্ক ছিল না। কবজি কর্তন মামলার দুই নম্বর আসামি ফয়েজের ক্যাডার বাহিনীর অন্যতম সদস্য তারেক আহমেদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ছবি থাকার বিষয়ে আতিক বলেন, মানুষের সঙ্গে মানুষের ছবি থাকতেই পারে। এটা দোষের কিছু নয়।
উল্লেখ্য গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে শিবগঞ্জের উজিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়নের রানীহাটি গ্রামের খোদা বখসের ছেলে রুবেলকে তুলে নিয়ে দুই হাতের কবজি কেটে নেয় ফয়েজ বাহিনী। এই ঘটনায় ফয়েজসহ তার ৫ ক্যাডার গ্রেপ্তার হয়েছে। পুলিশ এখনও রুবেলের কাটা কবজি দুটি উদ্ধার করতে পারেনি। রুবেল এখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।