এফএনএস: ক্রমবর্ধমান উষ্ণতার কারণে সৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়ে ভবিষ্যতে জীবনপ্রবাহ কঠিনতর হয়ে পড়বে। পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে দৰিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ তুলনামূলক বেশি হুমকির মুখে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের ঋতু চক্র বদলে যাচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব দেশের কৃষি উৎপাদনের ওপরে পড়তে শুর্ব করেছে। কিন’ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করার জন্য যেসব ফসলের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হচ্ছে তা কৃষকের কাছে ভালোমতো পৌঁছাচ্ছে না। অনেক প্রযুক্তি সঠিকভাবে কাজও করছে না।
বিষয়টি স্বীকার করে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। কৃষিমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। খরাপ্রবণ হয়ে উঠছে উত্তরাঞ্চল। এর সাথে বেড়েছে নতুন পোকার সংক্রমণ। এতে ফসল উৎপাদনে খরচ বাড়ছে কৃষকদের। এ অবস’ায় বিজ্ঞানীদের উচ্চফলনশীল খরা, লবনাক্ত সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের উপর গুর্বত্বারোপ করেন ড. আব্দুর রাজ্জাক।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ুর ক্রম পরিবর্তনের সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমন উৎপাদনের ওপর। যার ফলে কৃষকেরাই সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাই পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো ধানের জাত উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ না দিলে কৃষকেরা ধান উৎপাদন থেকে সরে এসে সবজির দিকে মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকে পড়বেন। এতে ধান উৎপাদন কমে গিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
হুমকির মুখে প্রায় ২ কোটি শিশুর ভবিষ্যৎ: এদিকে, সম্প্রতি জাতিসংঘ শিশু তহবিল -ইউনিসেফ’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিধ্বংসী বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য পরিবেশগত বিপর্যয়গুলো বাংলাদেশে ১ কোটি ৯০ লাখের বেশি শিশুর জীবন ও ভবিষ্যতকে হুমকির মুখে ফেলছে। ইউনিসেফের এই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশিরা দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশংসনীয় ক্ষমতা অর্জন করলেও দেশটির নবীনতম নাগরিকদের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপদ এড়াতে জর্বরি ভিত্তিতে আরও সম্পদ ও উদ্ভাবনীমূলক কর্মসূচি প্রয়োজন।
‘ঝড়ের আভাস: বাংলাদেশের শিশুদের ভবিষ্যৎ মেঘাচ্ছন্ন করে দিচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে উলেৱখ করা হয়, বাংলাদেশের সমতল প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, ঘনবসতি ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে দেশটি শক্তিশালী ও অননুমেয় শক্তিগুলোর কাছে বিশেষভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। এই পরিসি’তি আরও জটিল করে তুলছে জলবায়ু পরিবর্তন। দেশটির উত্তরের বন্যা ও খরা-প্রবণ নিম্নাঞ্চল থেকে শুর্ব করে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী ঝড় ও ঝঞ্ঝাবিৰুব্ধ অঞ্চল পর্যন্ত এই হুমকি অনুভূত হয়।
পরিবার, সমপ্রদায়ের নেতৃবৃন্দ এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা উলেৱখ করে ইউনিসেফ বলছে, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও খরার মতো বিরূপ আবহাওয়াজনিত ঘটনার সম্মিলন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া ও নোনাপানির অনুপ্রবেশের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি ঘটনাসমূহ পরিবারগুলোকে আরও বেশি দারিদ্র্য ও স’ানচ্যুতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস’্যসেবা প্রাপ্তির সুযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ শিশুর বসবাস শক্তিশালী নদীপ্রবাহের মধ্যে ও এগুলোকে ঘিরে। নদীগুলো বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং নিয়মিতভাবে এগুলোর তীর ভাঙে। ব্রহ্মপুত্র নদে বন্যায় ২০১৭ সালে ৪৮০টি কমিউনিটি স্বাস’্য ক্লিনিক পৱাবিত হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৫০ হাজার নলকূপ, যেগুলো কমিউনিটিগুলোর নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণের জন্য অপরিহার্য ছিল। উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী আরও ৪৫ লাখ শিশু নিয়মিত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় দ্বারা আক্রান্ত হয়। এদের মধ্যে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুও রয়েছে, যারা বাঁশ ও পৱাস্টিকের দুর্বল কাঠামোয় গড়ে তোলা আশ্রয়স’লগুলোতে বসবাস করে। আরও ৩০ লাখ শিশুর বসবাস দূরবর্তী দ্বীপগুলোতে, যেখানে কৃষিকাজে নিয়োজিত সমপ্রদায়গুলো দীর্ঘকালীন খরাজনিত সমস্যা মোকাবেলা করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুর্বত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ, যা দরিদ্র বাংলাদেশিদের তাদের ঘরবাড়ি ও কমিউনিটি ফেলে অন্যত্র নতুন করে জীবন শুর্ব করার চেষ্টার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনেকে ঢাকা ও অন্য বড় শহরগুলোতে যাচ্ছে, যেখানে শিশুদের বিপজ্জনক শ্রম বা শিশুবিয়ের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। গবেষণার কথা উলেৱখ করে এতে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ৬০ লাখ জলবায়ুজনিত অভিবাসী রয়েছে, যে সংখ্যাটি ২০৫০ সালের মধ্যে বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।
বাস’হারা হবে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ: জাতিসংঘের এক হিসাব মতে, যদি জলবায়ুর উষ্ণতা এই গতিতে বাড়তে থাকে, তাহলে সমুদ্র ও নদীর স্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রায় ১ কোটি মানুষ উদ্বাস’ হয়ে অভ্যন্তরীণভাবে স’ানচ্যুত হবে। উষ্ণতার এ হার যদি অব্যাহত থাকে তবে বাংলাদেশ এর মোট স’লভাগের ১০ শতাংশ ভূমি হারাবে। এটি সীমিত ভূমির ওপর জলাবায়ু পরিবর্তনের এক প্রত্যৰ প্রভাব। এর পরোৰ প্রভাব আরো ব্যাপক। মর্বকরণ, লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ রয়েছে আরও নানা প্রভাব। জমির উর্বরতা হ্রাস পাবে। ফলে, উৎপাদনের ওপর প্রভাব পড়বে। এদিকে রয়েছে অধিক জনসংখ্যার চাপ। সম্পদের সংকট আর জনসংখ্যার আধিক্য মিলে দেখা যাবে এক অপরিহার্য দুর্ভোগ।
অন্যদিকে, বুয়েটের এক গবেষণায়র তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ বঙ্গোপসাগরের সুন্দরবন অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে দশমিক ৫ মিটার। এতে সুন্দরবনের ৪২ শতাংশ এলাকা ডুবে যাবে। উপকূলীয় ১৯ জেলায় দুই হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা ডুবে যাবে এবং প্রায় ২৫ লাখ মানুষ বাস’হারা হয়ে যাবে। গত এক বা দুই দশকের জোয়ারে পানির গতিবিধি দেখলেও বিষয়টি কিছুটা অনুমান করা যায়। এক দশক আগেও যেখানে জোয়ারের পানি প্রবেশ করত না, এখন তেমন অনেক জায়গায়ই জোয়ারের পানি ওঠে। একটু বড় জোয়ার হলে উপকূলীয় অনেক শহরেই জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। নোনা পানির আগ্রাসনে অনেক এলাকায় চাষাবাদ ব্যাহত হয়। এমনকি উপকূলীয় এলাকাগুলোতে চেনা উদ্ভিদ ও মিঠা পানির মাছের প্রজাতিসংখ্যা উলেৱখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। এ অবস’ায় ২০৫০ সাল নাগাদ ২৫ লাখ মানুষের বাস’ভিটা হারিয়ে ফেলার যে আশঙ্কা করা হয়েছে, তা খুবই বাস্তবসম্মত। আর এটি যে ২০৫০ সালে গিয়েই ঘটবে বা ২৫ লাখ মানুষ একসঙ্গে উদ্বাস’ হবে, তেমনটা নয়। ২০৩০ সালে কিংবা তার আগেও অপেৰাকৃত নিচু এলাকার কিছু মানুষ উদ্বাস’ হতে পারে এবং পর্যায়ক্রমে এই সংখ্যা বাড়তে পারে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যত দিন যাচ্ছে বিপদের আশঙ্কা ততই বাড়ছে। এখন থেকে প্রস’তি না নিলে ভবিষ্যতে মারাত্মক পরিসি’তির সম্মুখীন হতে হবে।