স্টাফ রিপোর্টার : চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দীন আম ব্যবসায়ী রম্নবেল আলীর (২৮) দুই হাত কাটার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার ক্যাডাররা রম্নবেলের দুই হাত কবজি থেকে কেটে ফেলেছেন। বুধবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর গ্রামে বর্বর এই ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল বলেন, রম্নবেলসহ তিন যুবককে উপজেলার উজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দীন আটকে রেখেছেন, এমন খবর তিনি গভীর রাতেই পেয়েছিলেন। রাত ২টার দিকে তিনি চেয়ারম্যান ফয়েজকে ফোন করে তাদের ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফয়েজ তাকে বলেছিলেন, দেখছি। কিন্তু ছাড়া হয়নি।
নির্মম পাশবিকতার শিকার রম্নবেলের বাড়ি শিবগঞ্জের নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়নের রাণীহাটি গ্রামে। তার বাবার নাম খোদাবঙ। রম্নবেল একজন আম ব্যবসায়ী। বুধবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে উজিরপুর গ্রামে চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দীনের ব্যক্তিগত কার্যালয়ের পেছনের ফাঁকা মাঠে রম্নবেল আলীর দুই হাতের কবজি কেটে ফেলা হয়। রম্নবেল বলছেন, তার যখন হাত কাটা হয় তখন চেয়ারম্যান নিজেই উপস্থিত ছিলেন। চেয়ারম্যানের নির্দেশেই কেটে ফেলা হয়েছে তার দুই হাত।
চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দীনকে অবশ্য পুলিশ আটক করেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) টিএম মোজাহিদুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পরে চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দীন নওগাঁ পালিয়ে যাচ্ছিলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরা এলাকায় তাকে পুলিশ আটক করেছে। চেকপোস্ট বসিয়ে পুলিশ একটি অটোরিকশা থেকে তাকে আটক করে। এরপর তাকে শিবগঞ্জ থানায় নিয়ে যাওয়া হয় বলেও জানান এসপি।
এ ঘটনায় চেয়ারম্যান ছাড়াও আরও তিনজনকে আটক করা হয়েছে। এরা হলেন চেয়ারম্যানের ক্যাডার তারেক, জাহাঙ্গীর আলম ও আলাউদ্দিন। গতকাল রাত ৯টা পর্যনত্ম এ নিয়ে থানায় কোনো মামলা হয়নি। তবে রাতেই থানায় মামলা দায়ের হতে পারে বলে জানিয়েছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের এসপি।
গতকাল ভোররাতে হাত হারানো রম্নবেলকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি এখন হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। সেখানেই কথা হয় রম্নবেলের সাথে। তিনি জানিয়েছেন, চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে উজিরপুর গ্রামের হোসেন আলী ও জিয়া নামের দুই ব্যক্তি ছুরি দিয়ে তার হাত কেটে দিয়েছেন। তবে চেয়ারম্যানের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত বিরোধ নেই।
রম্নবেল জানান, তার চাচাতো ভাই আবদুস সালাম নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। শিবগঞ্জ সীমানেত্মর চরপাকা গরম্নর খাটাল নিয়ে উজিরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দীনের সঙ্গে তার বিরোধ রয়েছে। আর চাচাতো ভাই হিসেবে সালামের সঙ্গে রম্নবেলের ওঠাবসা। আর এ কারণেই চেয়ারম্যানের নির্দেশে তার ক্যাডাররা হাত কেটেছে।
তিনি আরও জানান, বুধবার রাত ১০টার দিকে রম্নবেল এবং তার দুই বন্ধু রবিউল ও হাবু চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত কার্যালয়ের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। চেয়ারম্যান তখন তার লোকজন দিয়ে তাদের আটকান। এরপর চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের পাশেই তাদের একটি স্কুলঘরে নিয়ে গিয়ে রাখা হয়। রম্নবেল ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ জানালে চেয়ারম্যান তাকে চুপচাপ বসে থাকতে বলেন। এরপর রাত আড়াইটার দিকে শুধু রম্নবেলকে হাত বেঁধে স্কুলের পেছনে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন চেয়ারম্যান তার হাতে কেটে ফেলার নির্দেশ দেন। এরপর হোসেন আলী ও জিয়া তার দুই হাত কেটে ফেলে। ঘটনার পর চেয়ারম্যান ও তার ক্যাডাররা রম্নবেলকে ফেলে রেখে চলে যায়। পরে চিৎকার শুনে রম্নবেলের বন্ধুরা তাকে উদ্ধার করে। এরপর তারা রম্নবেলকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
হাসপাতালের মেঝেতে রম্নবেলের পাশেই শুয়ে ছিল তার শিশুকন্যা। তাকে দেখিয়ে রম্নবেল বলেন, মেয়েটার দিকে তাকাতে পারছি না। তার ভবিষ্যতের কী হবে! আমার দিন কীভাবে কাটবে! একটা পা না থাকলেও কিছু করে খেতে পারতাম। এখন আমার কী হবে! তারা আমাকে সারাজীবনের জন্য পঙ্গু বানিয়ে দিল। আমি তাদের দৃষ্টানত্মমূলক শাসিত্ম চাই। এ সময় অঝোরে কাঁদতে থাকেন রম্নবেল।
স্থানীয়রা জানান, চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দীন সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোক। তিনি ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত। যখন যে দল ড়্গমতায় আসে তখন সে দলের নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। ২০১৭ সালে তার ইউপির ৯ জন সদস্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন যে, চেয়ারম্যান তাদের গুলি করে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। এলাকার এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের একটি মামলায় এ বছরের মার্চে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছিল। রম্নবেলের হাত কেটে ফেলার বিষয়ে কথা বলতে আটক হওয়ার আগে একাধিকবার ফোন করা হলেও চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দীন ফোন ধরেননি। তাই তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল বলেন, রাতেই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের এক নেতা আমাকে ফোন করে জানান যে তিনজনকে আটকে রাখা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আমি ফয়েজকে ফোন করে বলি, ওদের ছেড়ে দাও। তা না হলে তোমার খবর আছে। সে আমাকে বলে, দেখছি। এরপর আমি ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুকে দেখি, রম্নবেলের দুই হাত নেই। এটা নির্মম। এটা বর্বর। এমন ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না।
শিবগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদনত্ম) আতিকুল ইসলাম জানান, ঘটনার খবর শুনে গতকাল সকালে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে কাটা হাত উদ্ধার করা যায়নি। আহত ব্যক্তির বরাত দিয়ে পরিবারের সদস্যরা তাকে জানিয়েছেন, ধরে নিয়ে যাওয়া থেকে হাত কাটা পর্যনত্ম অনত্মত ১৫ থেকে ২০ জন এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তারা কারা তা জানতে আটক চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মামলা দায়েরের পর আটকদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে।