স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর সর্বাধুনিক শপিংমল ‘থীম ওমর পস্নাজা’। রাজশাহী নিউমার্কেট এলাকায় ১০তলা এ ভবনটির প্রথম থেকে সপ্তম তলা পর্যনত্ম মার্কেট। আর ওপরের তিন তলায় ফ্ল্যাট। এই ভবনের ফ্ল্যাট ও দোকান কিনে আসত্মানা গেঁড়েছেন রাজশাহীর কয়েকজন শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। নিরাপদে তারা এখান থেকেই চালিয়ে যাচ্ছেন মাদকের কারবার।
ভবনটির অন্যতম মালিক রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর ফারম্নক চৌধুরী। তিনি তার নির্বাচনি এলাকা গোদাগাড়ী উপজেলার শীর্ষ হেরোইন ব্যবসায়ীদের কাছে ফ্ল্যাট ও দোকান বিক্রি করেছেন লাখ লাখ টাকায়। সূত্র বলছে, এমপির ভবন বলে এখন এখানে বসেই মাদক কারবার পরিচালনা নিরাপদ বলে মনে করছেন তারা। চলছে তাদের রমরমা ব্যবসাও।
থীম ওমর পস্নাজায় যারা ফ্ল্যাট ও দোকান কিনেছেন তাদের মধ্যে অনত্মত তিনজনকে পাওয়া গেছে যারা গোদাগাড়ীর শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। একজন তো স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাটও কিনেছেন। এরা হলেন- গোদাগাড়ী পৌরসভার গড়ের মাঠ মহলস্নার হযরত আলী, সাগরপাড়া মহলস্নার নাজির হোসেন এবং মাটিকাটা ইউনিয়নের উজানপাড়া গ্রামের সোহেল রানা। হযরত একাই দোকান কিনেছেন তিনটি। আর সোহেল রানা নিজের নামে একটি দোকান ছাড়াও তার স্ত্রী কেয়া আক্তারের নামে কিনেছেন ফ্ল্যাট।
সংশিস্নষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হযরতের তিনটি দোকানই প্রথম তলায়। দোকান নম্বর ২৩, ২৪ ও ২৫। হজরত প্রথমে ২০১১ সালের ৩১ ডিসেম্বর ১৮২ স্কয়ার ফিট আয়তনের ২৪ নম্বর দোকানটি বরাদ্দ নেন। এর মূল্য ২৬ লাখ ২০ হাজার ৮০০ টাকা। এরপর ২০১২ সালের ২৮ মার্চ বরাদ্দ নেন ১৯০ স্কয়ার ফিটের ২৫ নম্বর দোকানটি। এর দাম ছিল ৩১ লাখ ৮৯ হাজার ৮০০ টাকা। পরে ২০১৫ সালের ২০ অক্টোবর ২৩ লাখ ৩২ হাজার ৮০০ টাকায় ১৬২ স্কয়ার ফিটের ২৩ নম্বর দোকানটিও কেনেন তিনি। হেরোইন ব্যবসায় অঢেল সম্পদের মালিক হযরত ২৫ নম্বর দোকানের সাড়ে তিন হাজার টাকা ছাড়া সব টাকাই পরিশোধ করেছেন থীম ওমর পস্নাজা কর্তৃপড়্গকে।
হযরত যেদিন প্রথম একটি দোকান কেনেন সেই একই দিন আরেক শীর্ষ হেরোইন কারবারি নাজির হোসেনও দোকান বরাদ্দ নেন। তার দোকানও নিচতলায়। দোকান নম্বর ২৬। ১৯৮ স্কয়ার ফিট আয়তনের এই দোকানটি নাজির কিনেছেন ৩২ লাখ ৯৪ হাজার টাকায়। তিনিও সব টাকা পরিশোধ করেছেন।
মাদক ব্যবসায়ী সোহেল রানা দোকান কেনেন ২০১২ সালের ২২ মার্চ। মার্কেটের নিচতলায় তার দোকান নম্বর ২১। ১৪১ স্কয়ার ফিটের এই দোকানটি সোহেল কিনেছেন ২৫ লাখ ৩৮ হাজার টাকায়। ভবনের অষ্টমতলায় ২০১৬ সালের ১২ অক্টোবর সোহেল তার স্ত্রী কেয়া আক্তারের নামে ১ হাজার ১৯০ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাটও কিনেছেন। ফ্ল্যাট নম্বর ‘এইচ ২’। ফ্ল্যাটটি কেনা হয়েছে ৪৭ লাখ টাকায়। সব টাকা নগদে পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ এই সোহেল এক সময় বাসের সুপারভাইজার ছিলেন।
গেল বছর দেশের প্রথম শ্রেণির একটি সংবাদপত্রের খবরে বলা হয়েছিল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে ২০১৭ সালের মাঝামাঝিতে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে একটি প্রতিবেদন আসে। ওই প্রতিবেদনে ওমর ফারম্নক চৌধুরীর নামটি ‘মাদকের পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে স্পষ্টভাবেই উলেস্নখ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের একটি তালিকাও দেওয়া হয়। এই তালিকার প্রথম ১০ জনেরই বাড়ি গোদাগাড়ী উপজেলায়। আর এই ১০ জনের মধ্যে এমপি ফারম্নকের থীম ওমর পস্নাজায় দোকান কেনা হযরত, সোহেল এবং নাজিরেরও নাম রয়েছে। এদের মধ্যে তালিকায় হযরত ৪, নাজির ৫ এবং সোহেলের অবস্থান ৮ নম্বরে।
এদের কাছে দোকান ও ফ্ল্যাট বিক্রির বিষয়ে কথা বলতে গতকাল বৃহস্পতিবার এমপি ওমর ফারম্নক চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। মুঠোফোনে ড়্গুদেবার্তা পাঠিয়েও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। তাই তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে থীম ওমর পস্নাজায় আগে চাকরি করতেন এমন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভবনটি রাজশাহীর সবচেয়ে অত্যাধুনিক। এখানকার দোকান ও ফ্ল্যাটের দাম অনেক বেশি। এতো টাকায় দোকান কেনার মতো ব্যবসায়ী রাজশাহীতে খুব কম। তাই চাপ দিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের দোকান কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। আর এমপির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক হবে ভেবে মাদক ব্যবসায়ীরাও দোকান ও ফ্ল্যাট কিনেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শীর্ষ মাদক কারবারি সোহেল রানা টাকার জোরে গোদাগাড়ীর মাটিকাটা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদকের পদটিও বাগিয়ে নিয়েছেন। তার সঙ্গে এমপি ওমর ফারম্নক চৌধুরীর সম্পর্ক সুমধুর। তাই চলাফেরা বেপরোয়া। তার হাতে গোদাগাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রশিদ লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল। ওই সময় পুলিশ বলেছিল, সোহেল একজন বড় মাদক ব্যবসায়ী।
গোদাগাড়ীর লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোহেলের বাবা বাসচালক ছিলেন। পরে সোহেল নিজেও বাসের সুপারভাইজার ছিলেন। তার নিজের কোনো জমি নেই। চাকরিও নেই। এরপরও মাত্র আট-দশ বছরের মধ্যে তিনি প্রচুর টাকার মালিক হয়েছেন। থীম ওমর পস্নাজার দোকান ও ফ্ল্যাট ছাড়াও তার রাজশাহী নিউমার্কেটে আরও চারটা দোকান আছে। নগরীর ছোট বনগ্রাম এলাকায় রয়েছে তিনতলা বাড়ি। গ্রামের বাড়িটিও আলিশান। আছে আরও অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
থীম ওমর পস্নাজায় তিন তিনটি দোকান কেনা মাদক ব্যবসায়ী হযরত এলাকায় জামায়াতের কর্মী হিসেবে পরিচিত। তার কোটিপতি বনে যাওয়ার নেপথ্যের কারবার হেরোইন ও ইয়াবা চোরাচালান। তিনি পাইকারি মাদক ব্যবসায়ী বলে মাদক সম্রাজ্যে পরিচিত নাম। থীম ওমর পস্নাজার তিনটি দোকান ছাড়াও তার রয়েছে অনত্মত ৭০ বিঘা আবাদি জমি। রাজশাহী নিউমার্কেটেও রয়েছে গার্মেন্টের দোকান। হযরতের গ্রামের বাড়িটিও প্রাসাদতুল্য। অথচ আগে তিনি অন্যের জমিতে কাজ করতেন।
নাজিরের বাড়ি ছিল আগে পদ্মা নদীর ওপারে চরাঞ্চলে। সেখান থেকেই জড়িয়ে পড়েন মাদকের কারবারে। পরে পদ্মার এপারে এসে সাগরপাড়ায় বাড়ি করেন। জমে ওঠে তার মাদক ব্যবসা। এখন তিনি বিপুল অর্থবিত্তের মালিক। দোকান কেনেন থীম ওমর পস্নাজাতেও। সম্প্রতি মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার হলে তিনি গোদাগাড়ী ছাড়েন। এখন থাকেন রাজশাহীতে। মাঝে মাঝে থীম ওমর পস্নাজায় যান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গোদাগাড়ীর শীর্ষ এই তিন মাদক কারবারী থীম ওমর পস্নাজায় নিরাপদেই মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। হযরত ও নাজিরের দোকানগুলো ফেব্রিঙের। আর সোহেলের দোকানটি ভাড়া দেয়া। তবে তার ফ্ল্যাটে নিজেই থাকেন। সোহেল এই ফ্ল্যাট থেকেই মাদক কারবার পরিচালনা করেন। আর অন্য দুইজনের মাদক বেচাকেনার নিরাপদ স্থান দোকান।
এ বিষয়ে কথা বলতে গতকাল মাদক কারবারী নাজির হোসেন ও হযরত আলীর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে বন্ধ পাওয়া গেছে। বন্ধ পাওয়া যায় সোহেল রানার মুঠোফোনও। তার স্ত্রী কেয়া আক্তারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সপ্তাহখানেক আগে তার স্বামী চীন গেছেন। মাদক ব্যবসার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কেয়া বলেন, আমি এসব কিছু জানি না।
থীম ওমর পস্নাজা নগরীর বোয়ালিয়া থানা এলাকায়। সেখানে মাদক ব্যবসার বিষয়ে জানতে চাইলে এই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিবারন চন্দ্র বর্মণ বলেন, আমি এই থানায় এসেছি দুই মাস হলো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাটির বিষয়ে আমি অবগত নই। থানার নথিপত্র ঘেঁটে দেখতে হবে। যদি শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা এখানে আসত্মানা গেঁড়েই থাকে তবে তাদের বিষয়ে নজরদারি রাখা হবে।