স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের এমপি ওমর ফারম্নক চৌধুরীর মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ভবনের নিরাপত্তা কর্মীরা একজন সাংবাদিককে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করেছেন। গতকাল সোমবার সকালে রাজশাহীর নিউমার্কেট এলাকায় ‘থিম ওমর পস্নাজা’ নামের ওই বহুতল বাণিজ্যিক ভবনের সামনে এই ঘটনা ঘটে।
ভবনটি চারজনের অংশ্বীদারিত্বের ভিত্তিতে নির্মিত। এদের একজন ওমর ফারম্নক চৌধুরী। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিও। আর যে সাংবাদিকের ওপর হামলা চালানো হয়েছে তার নাম রফিকুল ইসলাম। তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকার রাজশাহী অফিসের নিজস্ব প্রতিবেদক।
গতকাল কালের কণ্ঠ পত্রিকার পেছনের পাতায় ‘এমপি ফারম্নক চৌধুরীর বাবা রাজাকার ছিলেন, রাজশাহীর অর্ধশত মুক্তিযোদ্ধার বিবৃতি’ শীর্ষক একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। আর এ দিনই তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটলো। এমপি ওমর ফারম্নক চৌধুরীর পড়্গ থেকে সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম বিভিন্ন সময় হুমকি পেয়েছিলেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
এদিকে, হামলার ঘটনায় রফিকুল ইসলাম নগরীর বোয়ালিয়া থানায় একটি মামলা করেছেন। এতে পাঁচজনের নাম উলেস্নখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাত আরও চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। হামলার পর পাঁচজনকে পুলিশ আটক করেছিল। মামলার পর তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এদের কাছ থেকে সাংবাদিক রফিকুলের একটি মুঠোফোন এবং মোটরসাইকেলের হেলমেট উদ্ধার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার পাঁচজন হলেন, থিম ওমর পস্নাজার নিরাপত্তা কর্মী আবদুল হাকিম (৪৫), নাহিদ হাসান (২০), সনি (২০), জামাল হোসেন ওরফে মুন্না (২৫) এবং সাঈদ আলী (৩৪)। নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, এরা এমপি ওমর ফারম্নক চৌধুরীর ‘লাঠিয়াল বাহিনী’ হিসেবে কাজ করেন। থিম ওমর পস্নাজার সামনে কোনো রিকশা দাঁড়ালেও তারা লাঠি নিয়ে গিয়ে পেটাতে থাকেন। অথচ ভবনটির সৌন্দর্য্যবর্ধন করতে গিয়ে সড়কের পাশে এক বিন্দুও জায়গা রাখা হয়নি। দখল করা হয়েছে ফুটপাতের সবটুকুই।
মামলার এজাহারে উলেস্নখ করা হয়েছে, গতকাল সকালে সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম থিম ওমর পস্নাজার প্রধান ফটকের পশ্চিম পাশে ফুটপাতে নিজের মোটরসাইকেলটি রেখে রাসত্মার বিপরীতে গিয়ে দাঁড়ান। এ সময় ভবনটির নিরাপত্তা কর্মীরা রফিকুলকে মোটরসাইকেলের কাছে ডাকেন। তিনি গেলে নিরাপত্তাকর্মীরা গাড়িটি সরিয়ে নিতে বলেন। রফিকুল তখন জানতে চান, ফুটপাতে গাড়ি রাখলে সমস্যা কী? এ সময় নিরাপত্তাকর্মীরা তার হেলমেট নিয়ে ভবনের ভেতরে চলে যাচ্ছিলেন।
সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম তখন নিজের পরিচয় দিয়ে এর প্রতিবাদ করেন। আর তখনই শুরম্ন হয় আক্রমণ। নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের কাছে থাকা লাঠি দিয়ে সাংবাদিক রফিকুল ইসলামকে বেধড়ক পেটাতে থাকেন। আঘাত করা হয় মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে। এ সময় নিরাপত্তাকর্মীরা রফিকুলকে ভবনের নিচতলার গ্যারেজের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
তখন আশপাশের লোকজন তাকে রড়্গায় এগিয়ে যান। নিরাপত্তাকর্মীরা তখন তাদেরকেও পেটাতে শুরম্ন করেন। এতে ভয়ে লোকজন পালিয়ে গেলে আবার রফিকুলকে পেটানো শুরম্ন হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ এবং অন্য সাংবাদিকরা গিয়ে রফিকুলকে উদ্ধার করেন। এ সময় রাজশাহীর সাংবাদিকরা থিম ওমর পস্নাজার প্রধান ফটকের সিঁড়িতে বসে এ ঘটনার তাড়্গণিক প্রতিবাদ জানান।
এ সময় পুলিশ থিম ওমর পস্নাজা থেকে ওই পাঁচ নিরাপত্তা কর্মীকে আটক করে নিয়ে যায়। আর সাংবাদিকরা আহত রফিকুল ইসলামকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে দুপুরে রফিকুল ইসলাম থানায় গিয়ে মামলা করেন। এ সময় তার সঙ্গে রাজশাহীর সাংবাদিক নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম বলেন, পরিচয় দেয়ার পর কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই পেটাতে শুরম্ন করা হয়। যেভাবে পেটানো হয়েছে সেটা শুধু ভবনের সামনে মোটরসাইকেল রাখার জন্য হওয়ার কথা নয়। এর পেছনে অন্য কারণ থাকতে পারে বলে মনে করছি। আমি এর বিচার চাই।
ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে জড়িতদের কঠোর শাসিত্ম দাবি করেছে রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নও (আরইউজে)। এই হামলা পরিকল্পিত উলেস্নখ করে গতকাল দুপুরে সংগঠনটির পড়্গ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই দাবি জানানো হয়েছে। তা না হলে কঠোর আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে আরইউজে।
আরইউজের সভাপতি কাজী শাহেদ, সহ-সভাপতি শরীফ সুমন, সাধারণ সম্পাদক তানজিমুল হক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রকি, কোষাধ্যড়্গ সরকার দুলাল মাহবুব, কার্যনির্বাহী সদস্য মিজানুর রহমান টুকু এবং সামাদ খান ওই বিবৃতিতে উলেস্নখ করেছেন, ফুটপাতে মোটরসাইকেল রাখায় ভবনের নিরাপত্তা প্রহরীরা পরিকল্পিতভাবে একজন সাংবাদিকের ওপর হামলা চালাবে এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আরইউজে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ভবনটির অন্যতম মালিক এমপি ওমর ফারম্নক চৌধুরী। সম্প্রতি সাংবাদিক রফিকুল ইসলামসহ রাজশাহীর কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক এই এমপির বিতর্কিত বিভিন্ন কর্মকা-ের সংবাদ বিভিন্ন প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশ ও প্রচার করে। সোমবারও কালের কণ্ঠে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। আর এই দিনই এমপির ভবনের নিরাপত্তা কর্মীরা সাংবাদিক রফিকুলের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালালো। এর পেছনে ফুটপাতে শুধু মোটরসাইকেল রাখা, নাকি অন্য কোনো কারণ জড়িত- তা খুঁজে বের করা প্রশাসনের দায়িত্ব।
এ ঘটনার প্রতিবাদে আগামীকাল বুধবার সকাল ১০টায় রাজশাহী মহানগরীর আলুপট্টি মোড়ে আরইউজে’র উদ্যোগে প্রতিবাদ মানববন্ধন ও বিড়্গোভ সমাবেশেরও আয়োজন করা হয়েছে। এ সমাবেশে রাজশাহীতে কর্মরত সকল সাংবাদিকদের অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে আরইউজে। এদিকে সাংবাদিক রফিকুলের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সহ-সভাপতি মামুন-অর-রশিদ, কার্যনির্বাহী সদস্য আনু মোসত্মফা এবং জাবীদ অপু।
বাংলাদেশ ক্যাবল টিভি দর্শক ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এরফানুল হক নাহিদ ও মহাসচিব শাহাদাৎ হোসেন মুন্না স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলা হয়েছে, সাংবাদিক রফিকুল ইসলামকে হত্যার উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসীরা তার মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত করে। প্রকাশ্য দিনের বেলায় এ ধরণের হামলা স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর বড় ধরণের আঘাত। বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টানত্মমূলক শাসিত্ম দাবি দাবি করা হয়।
তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটির (আরসিআরইউ) সাংবাদিকরাও। আরসিআরইউ সভাপতি বাবর মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান নূর এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনের পড়্গে এ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। বিবৃতিতে তারা বলেন, সাংবাদিকরা একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের কথা বলেন। সৃজনশীল দেশ ও জাতি গঠনের উদ্দেশ্যে কাজ করেন। মহান এই পেশার ধারক ও বাহকদেরকে লাঞ্চিত করা যেন একটি ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। এর অন্যতম কারণ দোষীদেরদের বিচারের সম্মুখীন করতে না পারা। সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে সাংবাদিক রফিকুল ইসলামের ওপর বর্বরোচিত এ হামলা উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এ ঘটনার পেছনে কে বা কারা আছে তা তদনত্ম সাপেড়্গে দোষীদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাসিত্ম প্রদান করা হোক। যাতে করে দুষ্কৃতিকারীরা ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের উপর হামলার দুঃসাহস করতে না পারে।
এদিকে, রাজশাহী সাংবাদিক কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান মো: লিয়কিত আলী ও মহাসচিব হাসান মিল্‌স্নাত সহ সমিতির পরিচালনা পর্ষদের সকল সদস্যবৃন্দ এক যুক্ত বিবৃতিতে দৈনিক কালের কণ্ঠের রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক রফিকুল ইসলামের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বিবৃতিতে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদনেত্মর মাধ্যমে দোষীদের কঠোর শাসিত্মর দাবি জানানো হয়েছে।
আরো নিন্দা জানিয়েছেন রাজশাহী মেট্রোপলিটন প্রেসক্‌স্নাবের সভ্‌্‌পতি আজিজুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল ইসলাম বাবু, প্রেসক্লাবের সভাপতি আলমগীর কবির তোতা, সাধারণ সম্পাদক জামিল আহম্মেদ, বাঘা প্রেসক্লাব সভাপতি আব্দুল লতিফ মিয়া, সাধারণ সম্পাদক নুরম্নজ্জামান, রাবিসাসের সভাপতি সুজন আলী ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি বাবর মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান নূর।
এছাড়া নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষ আহত রফিকুলের ছবি পোস্ট করে এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। একজন ফেসবুকে ব্যবহারকারী থিম ওমর পস্নাজার ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, থিম ওমর পস্নাজার মার্কেটটি ফুটপাত দখল করে তৈরি করা হয়েছে। ফুটপাত বা রাসত্মার পাশে কেউ গাড়ি রাখলে থিম ওমর পস্নাজার সিকিউরিটি গার্ডরা দাঁড়াতে দেয় না। প্রায় সময় গার্ডরা রিঙা চালকদের মারধর করে। কেউ কিছু বললে সিকিউরিটি গার্ডরা বলে, থিম ওমর পস্নাজা এমপির। এই রাসত্মা ও ফুটপাত এমপির কেনা। কেউ কিছু বলতে পারবে না। আজ তাদের নিকট সাংবাদিক লাঞ্চিত হলেন। কাল আমি হবো, পরের দিনে আপনি। মানুষের চেয়ে কী তার ক্ষমতা বেশি?
এ বিষয়ে কথা বলতে গতকাল দুপুরে এমপি ওমর ফারম্নক চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি ধরেননি। তবে ‘থিম ওমর পস্নাজা কর্তৃপড়্গ’ এর নামে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম ও নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যে একটি ‘অনাকাঙ্খিত’ ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে থিম রিয়েল এস্টেট কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ওমর ফারম্নক চৌধুরী সাংবাদিক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে সমবেদনা এবং দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরম্নদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উলেস্নখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে নগরীর বোয়ালিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিবারন চন্দ্র বর্মন জানান, থিম ওমর পস্নাজার ব্যবস্থাপক তাকে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন যে, হামলায় জড়িত পাঁচ নিরাপত্তাকর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তবে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আর এ হামলার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তদনত্ম করে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।